৬১। এবং স্মরণ কর তোমরা বলেছিলে, ‘হে মুসা! আমরা [সর্বদা] একই প্রকার খাদ্য সহ্য করতে পারছি না। সুতরাং তোমার প্রভুর নিকট আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, তিনি যেনো আমাদের জন্য ভূমি জাত দ্রব্য উৎপন্ন করেন- শাক-সব্জি এবং শশা, রসুন, ডাল এবং পিয়াঁজ।’ সে [মুসা] বলল, ‘তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুর পরিবর্তে নিকৃষ্টতর বস্তু চাও? তবে তোমরা যে কোন নগরে যাও। তোমরা যা চাও তা সেখানে পাবে। ৭৪। লাঞ্ছনা ও দুর্দশা তাদের [চারিদিক থেকে] ঘিরে ধরলো ৭৫, তারা নিজেদের উপরে আল্লাহ্র ক্রোধকে আকর্ষণ করেছিলো। এর কারণ তারা আল্লাহ্র আয়াতকে অস্বীকার করতো এবং আল্লাহ্র নবীদের অন্যায়ভাবে হত্যা করতো। অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের জন্য তাদের এই পরিণতি হয়েছিলো।
৭৪। ‘মিশরা’ কথাটির আরবী শব্দরূপ দাঁড়ায় ‘যে কোন শহর’। কথাটির শব্দরূপই সব নয়, এর গূঢ় অর্থ হবে মিশরের যে কোনও শহর। কারন ‘তানউইন’ আরবী শব্দটির দ্বারা যা প্রকাশ করা হয়েছে তার অর্থ ‘মিশরের’ কোনও স্থানের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ যে কোন দেশ যা মিশরের মতই উর্বর। এই আয়াতে ইহুদীদের ভৎর্সনা করা হয়েছে। ইহুদীরা একই খাবার প্রতিদিন খাওয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো। কারণ মিশরে তারা যখন কৃতদাস বন্ধনে আবদ্ধ ছিল, ফেরাউনদের খাবারের প্রাচুর্য ও প্রকারভেদ তাদের প্রলুব্ধ করতো। দাসত্বের বন্ধন, অত্যাচার অপেক্ষা তাদের কাছে খাবারের বিভিন্নতা ও প্রাচুর্য হয়ে উঠলো বেশী লোভনীয়। এ ব্যাপারে হযরত মুসা (আঃ) এর ভৎর্সনা ছিল দু’ভাবে, (১) বিভিন্ন ধরণের সুস্বাদু খাবার যে কোনও শহরেই পাওয়া যায়, কিন্তু তার পরিবর্তে কি স্বাধীনতা বিক্রি করা যায়? সুস্বাদু খাবার অপেক্ষা কি স্বাধীনতা বহু মূল্যবান নয়? (২) সামনেই ইহুদীদের জন্য রয়েছে আল্লাহ্র অঙ্গীকারাবদ্ধ সমৃদ্ধির দেশ, আর পিছনে রয়েছে দাসত্বের দেশ (মিশর)। কোনটা মঙ্গলজনক? তারা কি ভালর প্রতিদানে মন্দকে বেছে নেবে?
৭৫। এখান থেকে এই আয়াতের অর্থ সার্বজনীন। আল্লাহ্ ইহুদীদের দাসত্ব মুক্ত করে আল্লাহ্র মনোনীত স্থানে তাদের বাসস্থান স্থির করলেন। কিন্তু ইহুদীরা আল্লাহ্র এই বিধি-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। ফলে তাদের উপর আল্লাহ্র গজব নাজেল হলো। তাদের লাঞ্ছনা গঞ্জনা জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হলো। এটা আমরা ইহুদীদের ইতিহাস পড়লেই দেখতে পাই। প্রথমতঃ তারা ‘আসেরিয়ান’দের দ্বারা পরাজিত ও বন্দী হয়ে তাদের দেশে নীত হয়। পরে পারস্য সম্রাট তাদের আসেরিয়ানদের থেকে মুক্ত করে তাদের দাসে পরিণত করেন এবং এর পরে তারা আবার গ্রীক, রোমান ও আরবদের অধীনে চলে যায়। এর ফলে ইহুদী জাতি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই থেকে নিজেদের স্বাধীন আবাসস্থল থেকে বঞ্চিত হয় এবং সেই থেকে তারা পৃথিবীব্যাপী ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজেদের কোনও মাতৃভূমি নাই। এ লাঞ্ছনা এ জন্য হলো যে তারা আল্লাহ্র বিধি বিধানের প্রতি কুফরী করেছিলো এবং নবীদের হত্যা করেছিলো। তারা আল্লাহ্র আনুগত্য প্রকাশ করতো না এবং আনুগত্যের সীমা লঙ্ঘন করতো।
নবী-হত্যা শুরু হয় আবেল হত্যার মধ্য দিয়ে, যে ছিল ইহুদীদের পূর্বপুরুষ। এরপর ইয়াকুব নবীর জ্যোষ্ঠ পুত্ররা ইউসুফ নবীকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়। ইউসুফ নবীকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁরা তাকে কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করে। যদিও আল্লাহ্র অপার করুণায় তাঁর মৃত্যু ঘটে নাই, তিনি অপরিচিত বণিকদের দ্বারা উদ্ধারপ্রাপ্ত হন এবং মিশরে আনীত হন, কিন্তু তাঁর ভাইরা ভাতৃ হত্যার পাপে অভিযুক্ত। কারণ আল্লাহ্ কর্মকে বিচার করেন তার নিয়ত দ্বারা। ইউসুফ নবীর ভাইদের সংকল্প ছিল তাঁকে হত্যা করার। তিনি নিহত হন নাই সেটা আল্লাহ্র অসীম করুণা ও দয়া। কিন্তু এতে তাঁর ভাইদের মানসিক অবস্থা বা নিয়তের কোন তারতম্য ঘটে নাই। সুতরাং ভাতৃ হত্যার নিয়তের দরুন তাদের উপরে ভাতৃহত্যার পাপই বর্তায়। পরবর্তীতে তারা ঈসা নবীকে হত্যা করে। যদিও তারা সত্যিকারের ঈসা নবীকে হত্যা করতে পারে নাই। তাঁরই সদৃশ একজনকে হত্যা করে। সুতরাং নবী হত্যার নিয়ত বা সংকল্পের দরুণ হত্যার পাপের দায়ভার তাদের উপর বর্তায়। শেষে আমরা দেখি তারা হযরত মুহম্মদ (সাঃ) কেও হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কুরআনের এই আয়াতের অর্থ যদিও ইহুদীদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে, কিন্তু এর নৈতিক আবেদন সার্বজনীন। এর নৈতিক উপদেশ হচ্ছে, যদি কেউ ব্যক্তিগত বা জাতিগতভাবে উদ্ধত ও অহংকারী হয় এবং নৈতিক মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক মুক্তি ও স্বাধীনতার চেয়ে পৃথিবীর চাকচিক্যময় জীবন ও ভোগ বিলাস অধিক পছন্দ করে, আল্লাহ্র আইন ভঙ্গ করে অর্থাৎ আল্লাহ্ প্রদত্ত নৈতিক নিয়মাবলী (যথা সত্যি কথা বলা, চুরি না করা, আমানতের খেয়ানত না করা, ব্যভিচার না করা ইত্যাদি) ভঙ্গ করে, আল্লাহ্র নিয়ামত প্রত্যাখান করে [যেমন করেছিলো ইহুদীরা] তবে তাদের জন্য সে যে ব্যক্তিই বা জাতিই হোক, রয়েছে দুঃখজনক লাঞ্ছনা এই পৃথিবীতে এবং পরকালে।
আয়াতঃ 002.062
নিঃসন্দেহে যারা মুসলমান হয়েছে এবং যারা ইহুদী, নাসারা ও সাবেঈন, (তাদের মধ্য থেকে) যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে তার সওয়াব তাদের পালনকর্তার কাছে। আর তাদের কোনই ভয়-ভীতি নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।
Verily! Those who believe and those who are Jews and Christians, and Sabians, whoever believes in Allâh and the Last Day and do righteous good deeds shall have their reward with their Lord, on them shall be no fear, nor shall they grieve .
