রুকু – ২২
১৭৭। পূর্ব ও পশ্চিমে মুখ ফিরানোতে কোন পূণ্য নাই; কিন্তু পূণ্য আছে ১৭৭ বিশ্বাস স্থাপন করলে – আল্লাহ্তে, ১৭৮, শেষ বিচারের দিনে, ফেরেশ্তাগণে, কিতাবে এবং নবীগণে। আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসা [প্রকাশ করতে] আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ, পর্যটক, সাহায্যপ্রার্থীকে এবং দাসমুক্তির জন্য সম্পদ ব্যয় করলে ১৭৯, সালাতে দৃঢ় থাকলে, যাকাত প্রদান করলে এবং প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূর্ণ করলে ১৮০ এবং [দৈহিক বা মানসিক] ব্যথা বেদনা [দুঃখ-ক্লেশে] এবং সংগ্রামে সংকটে এবং নিদারুন আতঙ্কের সকল সময়ব্যাপী ধৈর্য্য ধারণ করলে, এরাই তারা যারা সত্যপরায়ণ এবং আল্লাহ্ ভীরু ১৮১।
১৭৭। ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে মুখ ফিরানোতে কোন পূণ্য নাই।’ এ কথাটির অর্থ পশ্চিমা বিশ্ব পূর্বদিকে নামাজ পড়ে কারণ তাদের কাবা পূর্বদিকে আবার কাবার পূর্বদিকে যারা অবস্থিত তারা পশ্চিমদিকে নামাজ পড়ে। শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক নামাজ পড়ার মধ্যে ধর্ম নাই। এই আয়াতটিকে [২:১৭৭] পূর্বের আয়াতের সম্প্রসারণ বলা চলে। কারণ এখানে আল্লাহ্ বিশেষ গুরুত্বের সাথে সাবধান করে দিচ্ছেন আনুষ্ঠানিকতাকে যারা ধর্ম বলে বিবেচনা করে তাদের। শুধুমাত্র নামাজ, রোযা, পানাহার, চলাফেরা, পোষাক-পরিচ্ছদ এগুলো ধর্ম নয়। এগুলো কতগুলো নিয়ম যা শরীর ও মনের জন্য ভাল যা মানলে ধর্মের অন্তরে প্রবেশ করতে সুবিধা হয়। আল্লাহ্ এখানে পরিষ্কার ভাষায় আল্লাহ্ প্রেমিকদের মানদন্ড বর্ণনা করেছেন। এ মানদণ্ডে কিন্তু পোষাক-পরিচ্ছদ, (নারী বা পুরুষ) খাদ্য, চলাফেরা, আচার আচরণ কিছুই উল্লেখ করা হয় নাই।
(১) যাদের বিশ্বাসে আছে আন্তরিকতা। অর্থাৎ যারা সুখে-স্বাচ্ছন্দে, বিপদে-আপদে, ভাল-মন্দে, দুঃখে-কষ্টে জীবনে সর্বাবস্থায় শুধু এক আল্লাহ্র উপরে নির্ভরশীল, এক আল্লাহ্তে আস্থাশীল এক আল্লাহ্তে বিশ্বাসী। তিনিই একমাত্র ইহকালের ও পরকালের মালিক এই বিশ্বাস অন্তরে রাখা।
(২) এই বিশ্বাসকে কর্মে পরিণত করতে হবে। আল্লাহ্র কাছে আল্লাহ্ ভীরুরূপে উপস্থাপন করার উপায় হচ্ছে আল্লাহ্কে খুশী করার জন্য জনহিতকর কাজে দান করা। এ দান শুধু মাত্র টাকা পয়সা দান নয়। আল্লাহ্ যাকে যা নেয়ামত দান করেছেন সেই নেয়ামত জনহিতার্থে ব্যবহার করার নামই হচ্ছে দান।
(৩) সালাত কায়েম করলে
(৪) প্রকৃত এবং ভাল নাগরিক হতে হলে প্রত্যেককে যাকাত দিতে হবে।
(৫) মুসলমানের প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সামাজিক বাধ্যবাধকতা (Social Obligation) আছে এবং তা তাকে পালন করতে হবে। প্রতিশ্রুতি পালনই হচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
(৬) আমাদের প্রত্যেককে বিপদে দুঃখে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে এবং সর্বশক্তিমান দয়াময়ের করুণা প্রত্যাশা করে দৃঢ়তার সাথে বিপদকে অতিক্রম করতে হবে।
এই ছয়টি মানদন্ড (Criteria) যার চরিত্রে দেখা যাবে তিনিই মুসলমান; তিনিই বিশ্বাসী। শুধুমাত্র পোষাক-পরিচ্ছদ (টুপি, দাড়ি, বোরখা ইত্যাদি) বা খাদ্য দ্রব্য, বাছ বিচার, পূর্ব বা পশ্চিমে মুখ ফিরানো [অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে নামাজ আদায় করার মধ্যে কোনও ধর্ম নাই] ধর্ম আছে উপরের ছয়টি মানদণ্ডে। যদিও মনে হয় এগুলি প্রত্যেকটি পৃথক পৃথক গুণাবলী কিন্তু তা নয় এরা এক সূতোয় গাঁথা। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে একটি আর একটির সম্পূরক।
যে বিশ্বাস, যে আনুগত্য আত্মার অন্তস্থল থেকে উৎসারিত নয় তা স্রষ্টার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
১৭৮। (১) ‘বিশ্বাস’ বা ঈমান কোনও মুখের কথা নয়। শুধুমাত্র মৌখিকভাবে আল্লাহ্র প্রতি যে বিশ্বাস স্থাপন করা হয়, তা কোনও বিশ্বাসই নয়। বিশ্বাস হল অন্তরের এক বিশেষ অবস্থা [State of mind] এটা শুধুমাত্র মুখের কথা নয়। বিশ্বাস হল সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র উপর নির্ভরশীলতা, সর্বাবস্থায় সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে তার মঙ্গলময় উপস্থিতি আত্মার ভিতরে অনুভব করা, এই বিশ্বাস সর্বান্তকরণে করা যে, মঙ্গলময় প্রভু, ব্যক্তির সর্বসত্তা ঘিরে আছেন। তারই করুণার প্রত্যাশা করা, তারই ভালবাসা অনুভব করা, তার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পন করা। যখন বিশ্বাসের ভিত্তিমুল আন্তরিক হয় তখন এই চাকচিক্যময় পৃথিবীর রূপ আমাদের চোখে বদলে যাবে। আমাদের মাঝে অন্তর্দৃষ্টির উদ্ভব হয় [Spiritual insight]। আমরা পৃথিবীর ভোগ-লালসা, আনন্দ-উল্লাস, প্রভাব-প্রতিপত্তি সব কিছুই যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বেষ্টন করে থাকে, যার জন্য আমরা প্রাণপণে যত্নসহকারে পরিশ্রম করি, যার জন্য আমরা লালায়িত, তার রূপ যাবে বদলে। এসবই মনে হবে অর্থহীন। শুধু তখনই আমরা বুঝতে পারবো পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। এটা হচ্ছে শিক্ষানবীসকাল পরকালের জন্য। আমরা বুঝতে পারবো আল্লাহ্র কিতাব, তার প্রেরিত রাসূল, ফেরেশ্তা সবই আমাদের পরলৌকিক মঙ্গলের জন্য। পৃথিবীর শিক্ষানবীসকাল নিরাপদে অতিক্রম করার জন্য মহান আল্লাহ্র করুণার স্পর্শ আমরা অনুভব করতে পারবো। আমাদের আত্মার ভিতরে অন্তর্দৃষ্টির উদ্ভব হবে [Spiritual insight]। একেই বলা হচ্ছে বিশ্বাসের আন্তরিকতা [টিকা: ১৭৭ দেখুন]।
১৭৯। (২) ‘দান’বা ‘ব্যয়’ আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসা থেকে, মানুষের মঙ্গলের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য যা কিছু করা হয় তাই ‘দান’ কিন্তু এই দানের পিছনে ব্যক্তির নিয়ত যদি আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসা না হয়, যদি আল্লাহ্কে খুশী করার ইচ্ছা না হয়ে নাম, যশঃ ও সুখ্যাতি অর্জনই মুখ্য উদ্দেশ্য হয় তবে তা আল্লাহ্র কাছে দান বলে পরিগণিত হবে না। এখানে কাদের দান বা দয়া করা যায় তাদের কথা ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। (১) নিকট আত্মীয়, (২) এতিম এই শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে। এতিম বলতে আমরা শুধুমাত্র পিতৃ-মাতৃহীন বালক-বালিকাকে বুঝি। কিন্তু ব্যাপক অর্থে এতিম বলতে বুঝায় সেই ব্যক্তি সমাজে যার কোন সহায় (Support) বা সম্বল (Wealth) নাই। (৩) সেই ব্যক্তি অভাবগ্রস্থ যার সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিন্তু কারও কাছে সে সাহায্য প্রার্থনা করে না। এই সাহায্য শুধুমাত্র অর্থের নিক্তিতে মাপা যাবে না, এ সাহায্যে যে কোনও ধরণের হতে পারে যেমন অশিক্ষিত ব্যক্তির শিক্ষার প্রয়োজন, অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসার প্রয়োজন। এখানে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে এদের খুঁজে বের করা এবং যারা সাহায্য প্রার্থনা করে তাদের উপরে এদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। (৪) পথচারী, অর্থাৎ আজকের যুগে একদেশের লোক অন্যদেশে হর-হামেশা যাতায়াত করে। নূতন দেশে, নূতন পরিবেশে নূতন সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হতে যে কষ্ট ও পরিশ্রম তা লাঘব করার জন্য সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করা। (৫) সাহায্য প্রার্থী, অর্থাৎ আর্থিক সাহায্যে ছাড়াও সমাজে আমরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। আর্থিক সাহায্য ছাড়াও যে সাহায্যের প্রয়োজন একে অপরের, সে সাহায্য করা প্রয়োজন। যেমন-সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে দুর্গত এলাকায় কাজ করা ইত্যাদি। (৬) ক্রীতদাসের মুক্ত করা। আজকের যুগে ক্রীতদাস প্রথা নাই। কিন্তু ঠিক সেভাবে ক্রীতদাস প্রথা বিরাজ না করলেও সময়ের ব্যবধানে এর ধরণ পাল্টে গেছে। মানুষ মানুষের উপরে যে নির্যাতন করে সেও এক ধরণের ক্রীতদাস প্রথা। যেমন-আমরা দেখছি বসনিয়াতে মানুষের নির্যাতন। ঠিক একইভাবে বলা যায় বাংলাদেশে বর্তমানে নারী নির্যাতন ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতের’ স্তরে প্রায় পৌঁছে গেছে। আত্মার স্বাধীনতা যেখানে ব্যাহত হয় তাই-ই হচ্ছে দাস প্রথা। কুরআনের বাণী সর্বকালের, সর্বযুগের। তাই আক্ষরিক অর্থে দাস প্রথার মধ্যে একে সীমাবদ্ধ রাখলে আল্লাহ্র বাণীর অবমাননা করা হয়। যেখানেই মানবতার অবমাননা সেখানেই মানবতার মুক্তির জন্য দান করা কুরআনের নির্দেশ। মানবতার অবমাননাই হচ্ছে ক্রীতদাস প্রথা’ যা আজকের যুগেও বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরূপে বিরাজমান।
