রাত সাড়ে বারোটা। অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি ফুটপাতে। হাত বিশেক দূরে ধর্মতলার মোড়ে দাঁড়ানো শেয়ার ট্যাক্সি। ইতিমধ্যেই পাঁচজন বসে রয়েছেন। হাঁটতে ইচ্ছে করছে না আর। ‘কোথায় যাবেন দাদা?’ ‘ডানলপ’, ‘আমাকে একটু বিডন স্ট্রিটে নামিয়ে দেবেন?’ শোনামাত্র একটা ফিচেল শেয়ালমার্কা হাসি ড্রাইভারের ঠোঁটের কোণে। ‘ভাড়া কিন্তু ওই একই পড়বে।’ ‘ঠিক আছে।’ বলে দরজা খুলে ঠাসাঠাসি করে সেঁটে যাওয়া চালক সহ জনাচারেক সহযাত্রীর সঙ্গে।
রাত একটা বাজতে পাঁচ। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ আর বিডন স্ট্রিটের মোড়। সোনাগাছি। মোড় থেকে প্রায় শোভাবাজার অবধি ফুটপাতে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ের দল । সস্তা টাইট জিন্স, টপ আর স্ন্যাক্স। জালি সেন্টের গন্ধ। উৎকট মেকআপ। খাদ্য প্রচুর কিন্তু খাদকের সংখ্যা কম। যার ফলে একটা কাস্টমার নিয়ে শেয়াল কুকুরের কামড়াকামড়ি। টলতে টলতে এগিয়ে এল এক মাতাল খদ্দের। হাত ধরে টানল মেয়েদের একজন। ‘চল না’। ‘কিতনা?’ জড়ানো গলায় প্রশ্ন করল খদ্দের। ‘বেশি না, এক গজ (একশো টাকা)’ ‘পচাশ রুপিয়া এক্সট্রা দেঙ্গে, লেকিন কন্ডোম নেহি লেঙ্গে।’ তাতেই রাজি মেয়েটি। ‘ঠিক আছে চল’, বলে কাস্টমারকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে গেল পাশের গলিতে। ফিরে এল আধঘণ্টা বাদে। ‘কন্ডোম ছাড়া কাস্টমার বসালি মাগি? এরপর এডে (এইডস) মরবি যে,’ বলল পাশে দাঁড়ানো আরেকজন। জবাবে ঝাঁঝিয়ে উঠল মেয়েটি। ‘চাপ্ তো ঢেমনি! সোয়ামির কারখানা বন্ধ পাঁচ বছর হল। ঘরে বুড়ি শাশুড়িকে নিয়ে পাঁচ পাঁচখানা পেট… কাল তো খেয়ে বাঁচি। পরে না হয় রোগে মরব।’ কীরকম বুঝছেন পাঠক? এসব সাব অলটার্ন ছোটলোকি পাঁচপ্যাঁচালি থেকে চোখ সরিয়ে একটু অন্যদিকে তাকানো যাক। উল্টোফুটে দর্জিপাড়া। মাঝখানে শুধু সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ। কিন্তু আকাশপাতাল ফারাক। ওপারের কোনও ছাপই নেই এপারে। ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের বাড়ি, বাজার। পুরনো বনেদি পাড়া… মনে আছে এখানেই থাকত চিকিদা। দর্জিপাড়ার মিত্তিরবাড়ির ছেলে। প্রেসিডেন্সির উজ্জ্বল নক্ষত্র সাতের দশকে। হাতে গিটার আর ঠোঁটে পিট সিগার, জন লেনন… কলেজ ক্যাম্পাস আর কফি হাউস মাতিয়ে রাখত সবসময়। লকাপে গলায় চুরুটের ছ্যাঁকা দিয়ে মালা এঁকে দিয়েছিল অ্যান্টি নক্সালাইট স্কোয়াডের সহৃদয় এক গোয়েন্দা অফিসার। চিকিদা বহুদিন হল বিদেশে। দর্জিপাড়া কিন্তু রয়ে গেছে স্বমহিমায়। ফ্ল্যাট সভ্যতার দাপট নেই। সেই পুরনো পুরনো লাল ইটের বাড়ি। ফুটের ধারে ঘোলা গঙ্গাজলের কল। সন্ধে হলে কুলপি মালাই আর বেলফুলওয়ালার ডাক। তেলেভাজার দোকান… এই মুহূর্তে ঘুমন্ত সবাই। ঘুমোও দর্জিপাড়া। তোমাকে পেছনে ফেলে এবার সোজা নিমতলা ঘাটমুখো। চার রাস্তার মোড়ে ট্রাম লাইন। ডানফুটে বটতলা আর চিৎপুর যাত্রাপাড়া। বাঁ ফুটে নতুন বাজার আর কোম্পানি বাগান। পোশাকি নাম রবীন্দ্রকানন। পার্কের গায়ে শিবশক্তি সিদ্ধি আর ঠান্ডাইয়ের দোকান। রাস্তা জুড়ে যাত্রাপালার অসংখ্য ব্যানার আর পোস্টার। ‘রোগা স্বামীর দারোগা বউ’,… ‘শাশুড়ি দারোয়ান বউমা চেয়ারম্যান’… গ্লোসাইন লেটারহেড আর নায়ক নায়িকার ছবি… এসব দেখতে দেখতে সিধে নিমতলা ঘাট।
রাত দেড়টা। ভীষণ ভাবে জেগে রয়েছে নিমতলা। উল্টোদিকে খোলা খাবারের দোকানগুলো। ভুবন-বিখ্যাত ঘিয়ের লিট্টি। আর গোলাপজল-জাফরান দিয়ে বানানো পুরু সর ভাসা পোয়াপাত্তি চা। গোটা দুয়েক বডি পুড়ছে। বাকি চারটে ওয়েটিং লিস্টে ইলেক্ট্রিক চুল্লির সামনে। ইতিউতি জটলা পাকানো শ্মশানবন্ধু, আত্মীয়স্বজন… গেঁজেল, পাগল, ভবঘুরে… খ্যাড়খ্যাড়ে গলায় মন্ত্র পড়ছে হাফ মাতাল পুরোহিত। মুখে ভকভকে চোলাইয়ের গন্ধ… একটু দূরে পাড়ে বাঁধা নৌকো, মাঝগঙ্গায় দোল খাওয়া বয়া… এসব দেখতে দেখতে ওপারে ফর্সা হয়ে আসছে আকাশ। কমলা রঙের জার্সি গায়ে রোজকার নিত্যনৈমিত্তিক ওয়ান ডে ম্যাচ খেলতে তৈরি হচ্ছেন সূয্যিমামা। সারা রাত ফুটপাত পর্বেরও ইতি ঘটে যাচ্ছে আপাতত। বাকি রয়ে গেল অনেক অনেক রাত, অনেক ফুটপাত আর একই সঙ্গে অনেকখানি কলকাতা। সময় অবসরে সে সব শোনানো যাবে অন্য আরেকদিন।
২০. এ শহর চেনে না
প্রফেসর শঙ্কু ও বুমেরাং
অনেকটা ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো দেখতে জিনিসটা। উড়ছিল মাটি থেকে ফুট তিরিশেক উঁচুতে। শূন্যে একটা পাক মেরে বাঁক খেয়ে প্রতিবারই ফিরে আসছিল প্রক্ষেপকের হাতে, নিখুঁত লক্ষ্যে। বুমেরাং। অস্ট্রেলিয়ার আদিম জনজাতিদের শিকার-অস্ত্র। লক্ষ্যভেদ না করতে পারলে ফিরে আসে শিকারির হাতে। এক্ষেত্রে অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার জঙ্গল নয়, দেখেছিলাম বিজয়গড় নবযাত্রী সংঘের মাঠে। প্রক্ষেপক শৌভিক মিত্র। কলকাতা শহরে একমাত্র বুমেরাং নির্মাতা। উচ্চ মাধ্যমিক পাস। বয়স সাঁইত্রিশ। পেশায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক, জন্ম-কারিগর, ভাস্কর, রন্ধনশিল্পী, পোষ্যপ্রেমী (তিনটি কুকুর আর ডজন খানেক পায়রা), বাঁশুরিয়া, উদ্ভাবক শৌভিকের ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য কীর্তি নামক মার্জার। বিয়ার ক্যান কেটে বানানো স্পিরিট স্টোভ থেকে ফুট চারেকের রথ হয়ে অসাধারণ ভাস্কর্যগুণ সম্বলিত প্রমাণ সাইজের সরস্বতী প্রতিমা বানিয়ে ফেলতে পারেন স্বশিক্ষিত অনায়াস দক্ষতায়। তবে আমার দেখা ওর সেরা কীর্তি বিশালকায় চিনে ঘুড়ি। মোটা সুতোয় বেঁধে ওড়ানো হয়েছিল রাতের আকাশে। সঙ্গে বাঁধা দুশো গ্রামের একটা জ্বলন্ত টর্চ। পুরো বিজয়গড় তো যাকে বলে হ-য়ে হাঁ। ঘুড়ি তো দেখতে পাচ্ছে না। ভাবছে বোধহয় ইউএফও, নিদেনপক্ষে হ্যালির কমেট। সত্যজিতের ফিল্ম-ফেলুদা আর প্রফেসর শঙ্কুর চিরভক্ত, রামসেবক, কম্পিউটার, অন্তর্জাল অন্তপ্রাণ প্রচারবিমুখ শৌভিকের একমাত্র জীবনবাণী—‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।’
লিভিং ইন্টারনেট অথবা সিধুজ্যাঠা
হ্যাঁ, শ্রীগৌতমকুমার দে তাঁর ঘনিষ্ঠমহলে এ নামেই পরিচিত। আরজ আলি মাতব্বরের প্রথম লেখা বাংলাদেশের কোন প্রকাশন থেকে ছাপা হয়েছিল? আফ্রিকার কোন ফুটবলার একটিও বিশ্বকাপ না খেলে ফিফার ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার বা ব্যালেন ডি অর পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন? সমুদ্রের ইলিশ গঙ্গায় এলে কেন সুস্বাদু হয়? এরকম আরও লাখো এবং সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী প্রশ্নের উত্তর— একমাত্র গৌতম। মিতবাক, ভদ্র আর অসম্ভব জ্ঞানপিপাসু এই মানুষটির গড়িয়ার দশফুট বাই দশফুট ঘরে হাজার হাজার বই। র্যাকে, খাটের তলায়, তাকের ওপর, বইয়ের আলমারিতে। তার বিষয়বৈচিত্র্যই বা কতরকম। ‘হিস্ট্রি অফ হাইহিলস’ থেকে শুরু করে তন্ত্রবিলাসীর সাধুসঙ্গ। এ ছাড়াও গৌতম একজন ‘ভার্সেটাইল কালেক্টর।’ সংগ্রহের তালিকায় রয়েছে দুষ্প্রাপ্য এবং বহুমূল্য সব দেশি-বিদেশি ডাকটিকিট ও মুদ্রা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ব্যতিক্রমী আমন্ত্রণপত্র ও মেনুকার্ড, দুনিয়াখ্যাত মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারির টিকিট, পত্রপত্রিকার প্রথম সংখ্যা, দেশলাই বাক্স, ফার্স্ট ডে কভার… আরও অনেককিছু। লিখতে গেলে একদিস্তে ফুলস্কেপ কাগজ শেষ হয়ে যাবে। ডাকটিকিট, মুদ্রা এবং আরও নানাবিধ বিষয় নিয়ে ওর লেখা প্রকাশিত হয়েছে একাধিক পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে। বছরকয়েক আগে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে যানবাহনের গায়ে আঁকা ও লেখা নিয়ে অনবদ্য এবং তথ্যসমৃদ্ধ একটি বই ‘বাহনলিপি।’ পেশায় জীবনবিমার এজেন্ট (যদিও কলকাতার বাইরে বেশ কয়েকটি লোভনীয় সরকারি-বেসরকারি চাকরির অফার ফিরিয়ে দিয়েছে শুধুমাত্র এই শহরটায় থাকবে আর সংগ্রাহক হবে বলে।) গৌতমের রোজগারের বৃহদংশই ব্যয় হয় বই কেনা, সংগ্রহ এবং ভ্রমণে। নিজের পেশা নিয়ে ও নিজে এতটুকু লজ্জিত নয় (বরং গর্বিত)। কিন্তু ওর গুণগ্রাহী আমরা ক্ষুব্ধ। যাকে কোনও নামী গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক বা মিউজিয়াম কিউরেটরের পদে দেখতে পাওয়ার কথা ছিল তাকে কিনা গুণীর কদর না জানা এ পোড়া দেশে পেটের টানে ক্লায়েন্টকে ‘প্রিমিয়াম’ আর ‘ইন্টারেস্ট’ বোঝানোর ধান্দায় ছুটে বেড়াতে হয় ভোর থেকে রাত? এ আক্ষেপ রাখার জায়গা কোথায়?
জ্ঞানভিক্ষু
“সুপ্রিয়দা, তোমার কাছে অনুষ্টুপের শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সংখ্যাটা আছে?” অথবা “তুমি কি তপন রায়চৌধুরীর ‘বাঙালনামা’ বইটা পড়েছ?” এ ধরনের প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা নিয়ে ফোন আসা মানেই নির্ঘাত দীপঙ্কর। দীপঙ্কর মানে দীপঙ্কর কুণ্ডু। শুনেছি জ্ঞানভিক্ষু অতীশ দীপঙ্কর নাকি মঠ থেকে মঠে কাঁধে করে পুঁথি বয়ে নিয়ে যেতেন। আমাদের দীপঙ্করও কাঁধে বই বয়ে নিয়ে বেড়ায়। তবে মঠ থেকে মঠে নয়, ট্রেন থেকে ট্রেনে। তবে সেটা ট্রেনের অন্যান্য ফেরিওয়ালাদের মতো সস্তা, পাইরেটেড ইংরেজি পেপারব্যাক নয় মোটেই। দীপঙ্কর বাংলা বই বিক্রি করে। সেরকম মনস্ক পাঠক পেলে তাকে পরামর্শ দেয় কোন বইটি কেন তিনি পড়বেন। দীপঙ্কর। আহামরি শিক্ষিত নয়। তথাকথিত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামীদামি ডিগ্রিও নেই তেমন একটা। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অসম্ভব দারিদ্র্যপূর্ণ জীবন-যাপন করে বাড়িতে। অবস্থা দেখে অনেকেই পরামর্শ দিয়েছেন ইংরেজি পেপারব্যাক বিক্রি করার। কিন্তু দীপঙ্কর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিক্রি করতে হলে বাংলা বই আর সেই বই আগে নিজে পড়ে ভাল লাগলে তবেই। আমার এই ষাট পেরোনো জীবনে স্বীকার করতে বাধ্য যে দীপঙ্করের মতো বইপোকা আমি অন্তত জীবনে দুটি দেখিনি। এই ইন্টারনেট-গুগুল-ফেসবুক আর হোয়াটসআপ যুগসমুদ্রে দীপঙ্কর যেন একা একটা লাইট হাউস। অনেকটা হেমিংওয়ের ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র সেই বুড়ো মাঝির মতো। পুরনো মাছধরার নিয়মকানুন সব বাতিল হয়ে গেছে জেনেও যে ভাঙা ডিঙিনৌকো নিয়ে মাঝসমুদ্রে ভেসে পড়ে।
জাদু-নামকরণ-গ্রাফিত্তি-সত্যবান
বেশিদূর নয়। যাদবপুর ৮-বি বাসস্ট্যান্ড থেকে সাইকেল রিকশায় মাত্র মিনিট পাঁচেক। নারকেলবাগান কালীমন্দির। রিকশা থেকে নেমে “ভেটুদার বাড়িটা কোথায়?” জিজ্ঞেস করলে মোড়ের মাথায় পান-সিগ্রেটের দোকানের চার্লি থেকে শুরু করে পাড়ার ন্যাজনাড়া বুধো— যে কেউ দেখিয়ে দেবে। পোশাকি নাম শ্রীসত্যবান মিত্র। মিত্র মহাশয় এবং তাঁর বাড়ি— নামকরণ, ছড়া এবং আরও সব অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপারের আস্ত মিউজিয়াম একটা। গেটে ঢোকার মুখেই লেটার বক্স। ডাকবিভাগের লাল ডাকবাক্সের হুবহু মিনিয়েচার সংস্করণ। সাইজ ফুট দেড়েক। গায়ে সাদা অক্ষরে লেখা— ‘নেক্সট ক্লিয়ারেন্স: নেভার।’ দরজা খুলে ঢুকে পড়ুন। ঝোলানো কার্ডে লেখা— ‘দড়ি ধরে মারো টান/ সাড়া দেবে সত্যবান।’ নিজে থাকেন দোতলায়। নীচে সত্যিই একটা দড়ি আছে, যেটা ওপরে একটা ঘণ্টার সঙ্গে সংযোজিত। দড়িতে টান পড়লেই যার আওয়াজ অতিথির আগমন সম্পর্কে গৃহকর্তাকে সচেতন করবে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কার্ডটাকে উলটে দিয়ে যান যেখানে লেখা আছে— ‘ঊর্ধ্বলোকে সত্য নাই/ দড়ি টানা বৃথা তাই।’ দরজার একপাশে জুতো রাখার র্যাক। নাম— ‘জুতোর বাড়ি।’ ড্রইংরুমে ঝোলানো ছোট্ট কাচের বাক্সে পাতিলেবু। তলায় ক্যাপশন— ‘দোহাই, আমাকে বেশি কচলিও না।’ সেন্টার টেবিলের ওপর একটা ভাঙা খেলনা কুলোর ওপর অ্যাডহেসিভ দিয়ে সাঁটা অ্যাশট্রে। গোদা বাঙলায় যার মানে দাঁড়ায় ‘ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো।’ সত্যবান বাবুর রান্নাঘরের নাম— ‘পাক-ই-স্থান।’ কমোডের নাম— ‘পরম সুখ।’ শাওয়ার—‘সহস্র ধারা।’ টিভি— ‘বিশ্বরূপ’। এসি মেশিন— ‘মা শীতলা’। শখের জাদুকর। তাই ম্যাজিকের সরঞ্জাম রাখার তাকের নাম দিয়েছেন ‘তুক-তাক’। (বাচ্চাদের ম্যাজিক শেখান এবং বিনামূল্যে বিতরণ করেন)। জাদুকর হিসাবে ছদ্মনাম ‘মিটার দ্য চিটার।’ নিজে অত্যন্ত পি পু ফি শু টাইপের। ব্যাঙ্ক কেরানির চাকরি থেকে বেশ কিছুদিন হল অবসর নিয়েছেন। তাই নিজের ঘরের নাম রেখেছেন ‘কুঁড়ে-ঘর।’ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু সেই কুঁড়েমির লেশমাত্র থাকে না বাজার যাবার সময়। নিজের একটি ব্যাটারিচালিত দ্বিচক্রযান আছে যেটি হাতে টানা রিকশার চেয়েও ধীরে চলে। ভক্তরা আদর করে নাম দিয়েছে ‘মিটারস্ হার্লে ডেভিডসন।’ তো সেই হার্লে ডেভিডসন নিয়ে সকাল থেকে দুপুর অবধি যাদবপুর অঞ্চলের সবক’টি বাজার প্রদক্ষিণ করেন মিত্তির মশাই, প্রতিদিন। সঙ্গে হাত দেড়েক লম্বা একটি বাজারের ফর্দ। লাইন টেনে তিনভাগে ভাগ করা। এক খোপে লেখা— ‘আজ কী কী বাজার করা হবে।’ দ্বিতীয় খোপে— ‘কী কী বাজার করা হবে না।’ তৃতীয় এবং শেষ খোপে— ‘যা কখনওই বাজার করা হবে না।’ একমাত্র বাঘের দুধ ছাড়া তৃতীয় খোপটিতে আর কোনও খাদ্যবস্তুর নাম লেখা নেই। রোজ ভোর ছটায় উঠে সত্যবানদার স্ত্রী মানে শ্যামলী বউদিকে ওই জি টি রোডের সমান লম্বা লিস্টিতে এক একটা পদের পাশে টিকমার্ক দিতে হয় (বেচারি বউদি)। রবি ঠাকুর-কবির সুমনে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, ফিল্ম বাফ (ডজনখানেক ফিল্ম ক্লাবের মেম্বার), শিব্রাম-হিমানীশ গোস্বামীর অকুণ্ঠ অনুরাগী সত্যবান অসামান্য রম্যরচনা লেখেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় (যদিও প্রভূত কুঁড়েমির কারণে তার সংখ্যা নিতান্তই কম)। সেগুলো যাঁরা পড়েননি তাঁদের নিতান্তই দুর্ভাগা বলা চলে। অথচ বিরল রসবোধসম্পন্ন মানুষটির এ নিয়ে না আছে কোনও প্রচারের চেষ্টা অথবা ন্যূনতম আত্মশ্লাঘা। প্রচণ্ড নরম মনের এই মানুষটি বাড়ির সামনে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছকে কাটা পড়তে দেখে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রাণাধিক প্রিয় পোষ্য স্মিত্জ কুকুর ভুটিয়া আর দুটি ‘অ্যাডপটেড’ নেড়ি। নাম যথাক্রমে কমরেড কালী ও বুধো। এদের পিছনে ব্যয় করেন দিনের বেশ খানিকটা সময়। এখনও প্রতি বছর নিজের হাতে শ পাঁচেক রংমশাল আর তুবড়ি তৈরি করে প্রিয়জনদের বাড়ি বাড়ি বিতরণ করেন দ্বিচক্রযানের ব্যাটারি পুড়িয়ে। কালীপুজোর আগে। অসামান্য সেইসব আতসবাজি। বাজারে কেনা আতসবাজির সঙ্গে কোনও তুলনাই চলে না। সে যাঁরা পুড়িয়েছেন তাঁরাই একমাত্র সাক্ষী। শেষ একটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন আপনাদের ডেটা ব্যাঙ্কে জমা করে রাখি। ষাটোত্তীর্ণ, শখের ম্যাজিশিয়ান, এখনও তরুণ, মিত্র মহাশয় একই সঙ্গে ভয়ংকর রকম খাদ্যরসিক। এবং অতিথিবৎসল। কেউ আসবে জানলে রানাঘাটের পান্তুয়া, কাঁকড়ার ঝাল না তেল-চিতল, কী খাওয়াবেন— তিনদিন আগে থেকে প্ল্যান ভাঁজতে শুরু করেন। ডাইনিং টেবিল জুড়ে লোভনীয় সব খাদ্যবস্তুর ছবি আর মাঝে মাঝে—‘তুমি কি কেবলই মায়া?’ ‘খাই খাই করো কেন’ জাতীয় ক্যাপশন। ফলে সত্যবান মিউজিয়াম দর্শনে গেলে চোখ আর মনের সঙ্গে উদরের ব্যালান্সটাও মাপমতো হবে একথাটা জোর দিয়ে বলাই যায়।
হেঁটে দেখতে শিখুন
সেই কবে লিখেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। ‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা/ হেঁটে দেখতে শিখুন…। আসলে শৌভিক-সত্যবান-দীপঙ্কর-গৌতমের মধ্যে বেশ কয়েকটা কমন কোয়ালিটি বা হিউম্যান ফ্যাক্টর রয়েছে। এঁরা প্রত্যেকেই প্রচারবিমুখ, অতি সাধারণ, অকারণ বাকপটুতা বা চালিয়াতিবর্জিত, আত্মশ্লাঘাহীন হয়তো-বা নিজের গুণ বা সৃষ্টি সম্পর্কে কিছুটা উদাসীনও । খটমটে ইংরেজি বা বাংলায় সেমিনার হল কাঁপাতে পারেন না। সহজ কথাকে গুরুপাক তত্ত্বের মোড়কে অহেতুক জটিল করে তোলার বিদ্যে এঁদের সম্পূর্ণ অনায়ত্ত। ফলে এই কলকাতার ‘কালচারাল মেইনস্ট্রিমের ‘বাবুমশাই’রা আরেকটা কলকাতার প্রকৃত গুণী এইসব সহনাগরিকদের মোটেই চিনতে পারেন না। তাই হেঁটে দেখতে শেখাটাও বাকি থেকে যায়।