উপরে প্রদত্ত বিবরণ হইতে জানা যায় যে, জলালুদ্দীন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। ইহার প্রমাণ অন্যান্য বিষয় হইতে পাওয়া যায়। প্রায় দুই শত বৎসর ধরিয়া বাংলার সুলতানদের মুদ্রায় ‘কলমা’ উৎকীর্ণ হইত না, জলালুদ্দীন কিন্তু তাঁহার মুদ্রায় ‘কলমা খোদাই করান। রাজত্বের শেষদিকে জলালুদ্দীন খলীফ আল্লাহ (ঈশ্বরের উত্তরাধিকারী) উপাধি গ্রহণ করেন। জলালুদ্দীন তাঁহার পূর্বতন ধর্ম অর্থাৎ হিন্দুধর্ম্মের প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল ছিলেন বলিয়া মনে হয় না। বুকাননের বিবরণী অনুসারে তিনি অনেক হিন্দুকে জোর করিয়া মুসলমান করিয়াছিলেন, যাহার ফলে বহু হিন্দু কামরূপে পলাইয়া গিয়াছিল। ‘রিয়াজ’-এর মতে ইতিপূর্বে জলালুদ্দীনকে হিন্দুধর্ম্মে পুনর্দীক্ষিত করার ব্যাপারে যে সমস্ত ব্রাহ্মণ অংশগ্রহণ করিয়াছিল, জলালুদ্দীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত হইয়া তাহাদের যন্ত্রণা দিয়া গোমাংস খাওয়াইয়াছিলেন।
কিন্তু ‘স্মৃতিরত্নহার’ নামক সামসাময়িক গ্রন্থ হইতে জানা যায় যে, এই জলালুদ্দীনই রায় রাজ্যধর নামক একজন নিষ্ঠাবান হিন্দুকে তাঁহার সেনাপতির পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। ‘স্মৃতিরত্নহার’-এর লেখক বৃহস্পতি মিশ্রও জলালুদ্দীনের নিকটে কিছু সমাদর পাইয়াছিলেন। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, জলালুদ্দীন হিন্দুধর্ম্মের অনুরাগী না হইলেও যোগ্য হিন্দুদের মর্যাদা দান করিতেন। সংস্কৃত পণ্ডিত বৃহস্পতি মিশ্রের সমাদর করার কারণ হয়ত জলালুদ্দীনের প্রথম জীবনে প্রাপ্ত সংস্কৃত শিক্ষা।
মুসলমান ঐতিহাসিকদের মতে জলালুদ্দীন সুশাসক ও ন্যায়বিচারক ছিলেন। ‘রিয়াজ’-এর মতে তিনি জনাকীর্ণ পাণ্ডুয়া নগরী পরিত্যাগ করিয়া গৌড়ে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।
জলালুদ্দীনের রাজ্যের আয়তন খুব বিশাল ছিল। প্রায় সমগ্র বাংলা দেশ ও আরাকান ব্যতীত–ত্রিপুরা ও দক্ষিণ বিহারেরও কিছু অংশ অন্তত সাময়িকভাবে তাঁহার রাজ্যভুক্ত হইয়াছিল বলিয়া মুদ্রার সাক্ষ্য হইতে মনে হয়।
জলালুদ্দীন ১৪৩৩ খ্রীষ্টাব্দের গোড়ার দিক পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায়। সম্ভবত তাঁহার অল্প কিছুকাল পরেই তিনি পরলোকগমন করেন। পাণ্ডুয়ার একলাখী প্রাসাদে তাঁহার সমাধি অছে।
৪
শামসুদ্দীন আহ্মদ শাহ
জলালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র শামসুদ্দীন আহমদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। আইন-ই-আকবরী’, ‘তবকাত-ই-আকবরী’, ‘তারিখ-ই ফিরিশতা’, ‘রিয়াজ-উস্-সলাতীন’ প্রভৃতি গ্রন্থের মতে শামসুদ্দীন আহমদ শাহ ১৬ বা ১৮ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। কিন্তু ইহা সত্য হইতে পারে না। কারণ শামসুদ্দীন আহ্মদ শাহের রাজত্বের প্রথম বৎসর অর্থাৎ ৮৩৬ হিজরা (১৪৩২-৩৩ খ্রী) ভিন্ন আর কোন বৎসরের মুদ্রা পাওয়া যায় নাই। এদিকে ৮১৪ হিজরা (১৪৩৭-৩৮ খ্রী) হইতে তাঁহার পরবর্তী সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের মুদ্রা পাওয়া যাইতেছে। বুকাননের বিবরণী অনুসারে শামসুদ্দীন তিন বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। এই কথাই সত্য বলিয়া মনে হয়।
ফিরিশতার মতে শামসুদ্দীন মহান, উদার, ন্যায়পরায়ণ এবং দানশীল নৃপতি ছিলেন। কিন্তু ‘রিয়াজ’-এর মতে শামসুদ্দীন ছিলেন বদমেজাজী, অত্যাচারী এবং রক্তপিপাসু; বিনা কারণে তিনি মানুষের রক্তপাত করিতেন এবং গর্ভবতী স্ত্রীলোকদের উদর বিদীর্ণ করিতেন। সমসাময়িক আরব-দেশীয় গ্রন্থকার ইব-ই হজরের মতে শামসুদ্দীন মাত্র ১৪ বৎসর বয়সে রাজা হইয়াছিলেন। এ কথা সত্য হইলে বলিতে হইবে, তাঁহার সম্বন্ধে ফিরিশতার প্রশংসা এবং ‘রিয়াজ’-এর নিন্দা–দুইই অতিরঞ্জিত।
‘রিয়াজ’ ও বুকাননের বিবরণীর মতে শামসুদ্দীনের দুই ক্রীতদাস সাদী খান ও নাসির খান ষড়যন্ত্র করিয়া তাঁহাকে হত্যা করেন। এই কথা সত্য বলিয়া মনে হয়, কারণ একলাখী প্রাসাদের মধ্যস্থিত শামসুদ্দীনের সমাধির গঠন শহীদের সমাধির অনুরূপ।
শামসুদ্দীন সম্বন্ধে আর কোন সংবাদ জানা যায় না। তাঁহার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশে গণেশের বংশের রাজত্ব শেষ হইল।
০৫. মাহমুদ শাহী বংশ ও হাবশী রাজত্ব
পঞ্চম পরিচ্ছেদ – মাহমুদ শাহী বংশ ও হাবশী রাজত্ব
১
নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ
শামসুদ্দীন আহমদ শাহের পরবর্তী সুলতানের নাম নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ। ইনি ১৪৩৭ খ্রীষ্টাব্দ বা তাঁহার দুই এক বৎসর পূর্বে সিংহাসনে আরোহণ করেন, ‘রিয়াজ’-এর মতে শামসুদ্দীন আহমদ শাহের দুই হত্যাকারীর অন্যতম সাদী খান অপর হত্যাকারী নাসির খানকে বধ করিয়া নিজে রাজ্যের সর্বময় কর্ত্তা হইতে চাহিয়াছিলেন, কিন্তু নাসির খান তাঁহার অভিসন্ধি বুঝিয়া তাহাকে হত্যা করেন এবং নিজে সিংহাসনে আরোহণ করেন। আহমদ শাহের অমাত্যেরা তাঁহার কর্তৃত্ব মানিতে রাজী না হইয়া তাঁহাকে বধ করেন এবং শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের জনৈক পৌত্র নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহকে সিংহাসনে বসান। অন্য বিবরণগুলি হইতে ‘রিয়াজ’-এর বিবরণের অধিকাংশ কথারই সমর্থন পাওয়া যায় এবং তাহাদের অধিকাংশেরই মতে নাসিরুদ্দীন ইলিয়াস শাহের বংশধর। বুকাননের বিবরণীর হইতেও ‘রিয়াজ’-এর বিবরণের সমর্থন মিলে, তবে বুকাননের বিবরণীতে নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহকে ইলিয়াস শাহের বংশধর বলা হয় নাই। বুকাননের বিবরণীর মতে শামসুদ্দীন আহমদ শাহের ক্রীতদাস ও হত্যাকারী নাসির খান এবং নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ অভিন্ন লোক।
