৭
সৈফুদ্দীন হজা শাহ, শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহ ও আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ
গিয়াসুদ্দীন আজম শাহের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্র সৈফুদ্দীন হজা শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি “সুলতান-উস্-সলাতীন” (রাজাধিরাজ) উপাধি ধারণ করিয়াছিলেন। সৈফুদ্দীন চীন-সম্রাট য়ুং-লোর কাছে দূত পাঠাইয়া গিয়াসুদ্দীনের মৃত্যুর ও নিজের সিংহাসনে আরোহণের সংবাদ জানাইয়াছিলেন। চীন-সম্রাটও বাংলার মৃত রাজার শোকানুষ্ঠানে যোগ দিবার জন্য এবং নূতন রাজাকে স্বাগত জানাইবার জন্য তাঁহার প্রতিনিধিদের পাঠাইয়াছিলেন।
সৈফুদ্দীনের রাজত্বকালের আর কোন ঘটনার কথা জানা যায় না। দুই বৎসর রাজত্ব করিবার পর সৈফুদ্দীন পরলোকগমন করেন। সৈফুদ্দীনের পরে শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহ সুলতান হন। ইব-ই-হজর নামে একজন সমসাময়িক আরব দেশীয় গ্রন্থকার লিখিয়াছেন যে হজা শাহ তাঁহার ক্রীতদাস শিহাব (শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহ) কর্ত্তৃক নিহত হইয়াছিলেন।
শিহাবুদ্দীন রাজার পুত্র না হইয়াও রাজসিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন, কারণ অমিত শক্তিধর রাজা গণেশ তাঁহার পিছনে ছিলেন। বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করিলে মনে হয় যে, রাজা গণেশই শিহাবুদ্দীনের রাজত্বকালে শাসনক্ষমতা করায়ত্ত করিয়াছিলেন এবং রাজকোষও তাঁহারই হাতে আসিয়াছিল, শিহাবুদ্দীন নামে মাত্র সুলতান ছিলেন।
শিহাবুদ্দীন একবার চীনম্রাটের কাছে দূত মারফৎ একটি ধন্যবাদজ্ঞাপক পত্র পাঠান এবং সেই সঙ্গে জিরাফ, বাংলার বিখ্যাত ঘোড়া এবং এদেশে উৎপন্ন আরও অনেক দ্রব্য উপহারস্বরূপ পাঠান। তাঁহার পাঠানো জিরাফ চীনদেশে বিপুল উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
দুই বৎসর (১৪১২-১৪ খ্রী) রাজত্ব করিবার পরে শিহাবুদ্দীন পরলোকগমন করেন। কাহারও কাহারও মতে রাজা গণেশ তাঁহাকে হত্যা করাইয়াছিলেন। সমসাময়িক আরবদেশীয় গ্রন্থকার ই-ইর-হজরও লিখিয়াছেন যে গণেশ কর্ত্তৃক শিহাবুদ্দীন (শিহাব) নিহত হইয়াছিলেন। সম্ভবত শিহাবুদ্দীন গণেশের বিরুদ্ধে কোন সময়ে ষড়যন্ত্র করিয়াছিলেন এবং তাঁহারই জন্য গণেশ তাঁহাকে পৃথিবী হইতে সরাইয়া দিয়াছিলেন।
মুদ্রার সাক্ষ্য হইতে দেখা যায় শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহের মৃত্যুর পরে সিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁহার পুত্র আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহ। কিন্তু কোন ঐতিহাসিক বিবরণীতে এই আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহের নাম পাওয়া যায় না। যতদূর মনে হয়, রাজা গণেশ শিহাবুদ্দীনের মৃত্যুর পরে তাঁহার শিশুপুত্র আলাউদ্দীনকে সিংহাসনে বসাইয়াছিলেন এবং তাঁহাকে নামমাত্র রাজা করিয়া রাখিয়া নিজেই রাজ্য শাসন করিয়াছিলেন।
আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহের কেবলমাত্র ৮১৭ হিজরায় (১৪১৪-১৫ খ্রী) মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে। ৮১৮ হিজরা হইতে জলালুদ্দীন মুহম্মদ শাহের মুদ্রা সুরু হইয়াছে। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, কয়েকমাস রাজত্ব করার পরেই আলাউদ্দীন সিংহাসনচ্যুত হইয়াছিলেন। সম্ভবত রাজা গণেশই স্বয়ং রাজা হইবার অভিপ্রায় করিয়া আলাউদ্দীনকে সিংহাসনচ্যুত করিয়াছিলেন।
০৪. রাজা গণেশ ও তাঁহার বংশ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ – রাজা গণেশ ও তাঁহার বংশ
১
রাজা গণেশ
রাজা গণেশ বাংলার ইতিহাসের একজন অবিস্মরণীয় পুরুষ। তিনিই একমাত্র হিন্দু, যিনি বাংলার পাঁচ শতাধিক বর্ষব্যাপী মুসলিম শাসনের মধ্যে কয়েক বৎসরের জন্য ব্যতিক্রম করিয়া হিন্দুশাসন প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। অবশ্য গণেশের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই এই হিন্দু অভ্যুদয়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও গণেশের কৃতিত্ব সম্বন্ধে সংশয়ের অবকাশ নাই। রাজা গণেশ খাঁটি বাঙালী ছিলেন, ইহাও এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়।
‘তবকাৎ-ই-আকবরী’, ‘তারিখ-ই-ফিরিশতা’, ‘মাসির-ই-রহিমী’ প্রভৃতি গ্রন্থে গণেশ সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। ‘রিয়াজ-উস-সলাতীন’-এর বিবরণ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ; বুকাননের বিবরণী, মুল্লা তকিয়ার বয়াজ, দরবেশদের জীবনীগ্রন্থ ‘মিরাৎ-উল আসরার’ প্রভৃতি সূত্রেও গণেশ সম্বন্ধে কয়েকটি কথা পাওয়া যায়। কিন্তু এই সূত্রগুলি পরবর্তীকালের রচনা। সম্প্রতি গণেশ সম্বন্ধীয় কিছু কিছু সমসাময়িক সূত্রও আবিষ্কৃত হইয়াছে; যেমন,–দরবেশ নূর কুত্ত্ব আলম ও আশরফ সিনানীর পত্রাবলী, ইব্রাহিম শকীর জনৈক সামন্তের আজ্ঞায় রচিত এবং গণেশ ও ইব্রাহিমের সংঘর্ষের উল্লেখসংবলিত ‘সঙ্গীতশিরোমণি’ গ্রন্থ, চীনসম্রাট কর্ত্তৃক বাংলার রাজসভায় প্রেরিত প্রতিনিধিদলের জনৈক সদস্যের লেখা শিং-ছা শ্যং-লান’ গ্রন্থ, আরবী ঐতিহাসিক ইব্ নৃ-ই-হজর ও অল-সখাওয়ীর লেখা গ্রন্থদ্বয়, দনুজমর্দনদেব ও মহেন্দ্রদেবের মুদ্রা প্রভৃতি।
উপরে উল্লিখিত সূত্রগুলি বিশ্লেষণ করিয়া রাজা গণেশের ইতিহাসটি মোটামুটিভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব হইয়াছে। এই পুনর্গঠিত ইতিহাসের সারমর্ম নিম্নে প্রদত্ত হইল।
রাজা গণেশ ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী একজন জমিদার। উত্তরবঙ্গের ভাতুড়িয়া অঞ্চলে তাঁহার জমিদারী ছিল। তিনি ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানদের অন্যতম আমীরও ছিলেন।
গিয়াসুদ্দীন আজম শাহ, সৈফুদ্দীন হজা শাহ, শিহাবুদ্দীন বায়াজিদ শাহ ও আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহের আমলে বাংলার রাজনীতিতে গণেশ বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং শেষ দুইজন সুলতানের আমলে তিনিই যে বাংলাদেশের প্রকৃত শাসক ছিলেন তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। ৮১৭ হিজরার (১৪১৪-১৫ খ্রী) শেষদিকে গণেশ আলাউদ্দীন ফিরোজ শাহকে সিংহাসনচ্যুত (ও সম্ভবত নিহত) করেন এবং নিজের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর সাহায্যে মুসলমান-রাজত্বের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করিয়া স্বয়ং বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন।
