—————-
১১৪. R. E. Hume TPU 184.
১১৫. আধুনিক আধ্যাত্মিক অর্থে উপাসনা নয়। এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।
২০. গান আর নাচ
সমাজের পুরোনো পর্যায়ে গান কিন্তু শুধু গান নয়। আর সঙ্গে নাচেরও সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ : কামনা সফল হবার ছবিটা মানুষ শুধু কথায় নয়, কাজের মধ্যেও ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে। মাওরি মেয়েদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি : গান ছাড়াও ওরা নাচের মধ্যেই পুব-হাওয়ার আর ফুল ফোটার আর ফসল ফলার অনুকরণ করছে, আর ভাবছে এরই দরুন পাওয়া যাবে ফসল। শস্পাতার ব্রতের বেলাতেও একই কথা : ভাঁজোকে কলকলিয়ে তোলবার কামনায় মেয়েদের গান, কিন্তু শুধু গানই নয়—ইন্দ্রদ্বাদশীতে তোলবার কামনায় মেয়েদের গান, কিন্তু শুধু গানই নয়—ইন্দ্রদ্বাদশীতে রাতভোর চাঁচের আলোয় তাদের নাচও। বস্তুত, আজো পৃথিবীর আনাচে-কানাচে যে-সব মানুষের দল সমাজ-বিকাশের পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে পড়ে রয়েছে তাদের মধ্যে নিছক গান বলে কিছুই চোখে পড়ে না। তার বদলে দেখা যায় গানে-নাচে মেশা এক অনুষ্ঠান, যার প্রেরণা যাদুবিশ্বাসে, যার উদ্দেশ্য কাজ। নাচের সঙ্গে গানের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে সমাজ-বিকাশের অনেক পরের পর্যায়ে, আরো পরের পর্যায়ে গানের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়েছে সুর—তখন থেকেই আজকালকার অর্থে কবিতার জন্ম। এ-বিষয়ে অধ্যাপক জর্জ টমসনের সিদ্ধান্তগুলি(১১৬) নিদিধ্যাসিতব্য। মনে রাখা দরকার, ভূয়োদর্শনের ভিত্তিতেই তাঁর ওই সিদ্ধান্তগুলি প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু ছান্দোগ্যের সামগান-রত কুকুরগুলির বেলায় কী রকম? সমাজ-বিকাশের যে-পর্যায়ের মানুষ বলে ওদের সনাক্ত করতে হলো সে-পর্যায়ে গান নিছক গান হবার কথা নয়। নিছক গান অবশ্য নয়; তার সঙ্গে কামনার যোগ রয়েছে, কাজের যোগ রয়েছে। কিন্তু নাচের যোগ? সে-বিষয়ে উপনিষদের লেখায় কি কোনোরকম ইঙ্গিত পাওয়া যায়?
উপনিষদে লেখা আছে, গান শুরু করবার ঠিক আগেই ওরা বহিষ্পবমানের অনুকরণে পরস্পরের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে সর্পিল গতিতে ঘুরেছিলো : তে হ যথৈবেদং বহিষ্পবমানেন স্তোষ্যমাণাঃ সংরব্ধাঃ সর্পিন্তীত্যেবম্আসসৃপুস্তে। এর মধ্যে ওই সংরব্ধা শব্দটিকে আশ্রয় করেই আধুনিক টীকাকারেরা খোদ মানুষগুলিকে কেমনভাবে একেবারে কুকুর বানিয়ে দেবার উপক্রম করেছিলেন সে-কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এবং অর্থবিপর্যয়ের এই আশঙ্কা দেখেই আমরা সিদ্ধান্ত করেছি, আধুনিক ধ্যানধারণাকে অবলম্বন করে প্রাচীন সাহিত্যের অর্থ নির্ণয় করতে অগ্রসর হবো না।
সে-অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে কিন্তু ‘যথৈবেদং বহিষ্পবমানেন স্তোষ্যমাণাঃ’ শব্দগুলির অর্থবিচার করবার সময়েও আধুনিক কালের ধারণার উপর একান্তভাবে নির্ভর করতে যাওয়া ভুল হবে। অর্থাৎ, পরবর্তীকালে বহিষ্পবমানেন স্তোষ্যমাণাঃ বলতে কী বুঝিয়েছে তা জানা থাকলেই ছান্দোগ্যের আলোচ্য অংশে শব্দগুলি কী বোঝাচ্ছে সে-বিষয়ে নিঃসন্দেহে কোনো কথা বলবার জোর থাকবে না। কেননা, এমন তো হতেই পারে যে, আদিকালের অর্থটা অন্যরকম ছিলো এবং আলোচ্য চিত্রটিতে আদিকালের পরিস্থিতিই প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
অবশ্যই, এ-বিষয়ে দীর্ঘতর আলোচনা তোলবার অবকাশ আমরা এখানে পাবো না। কেননা, তাহলে বৈদিক সাহিত্যে যজ্ঞ, ছন্দ ইত্যাদি কথাগুলির আদি তাৎপর্য অনুসন্ধানে অগ্রসর হতে হয়। ‘দ্বিজ’ নামের পরিচ্ছেদে সে-চেষ্টা করবার আগ্রহ রইলো। এখানে সামান্য কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করা যায়।
প্রথমত, পরের যুগে বহিষ্পবমান স্তোত্রের মানে যাই দাঁড়াক না কেন, আদিযুগে তা পার্থিব সম্পদের কামনার গান ছাড়া আর কিছুই নয়। “যাহা গান করা যায়, তাহার নাম স্তোত্র”। বহিষ্পবমান স্তোত্র কোন গান? সামগায়ী ঋত্বিকেরা ঋগ্বেদের নবম মণ্ডলের একাদশ সূক্ত গান করেন; ওই সূক্তটি যখন গীত হয় তখন তার নাম বহিষ্পবমান স্তোত্র। এখন ঋগ্বেদের ওই সূক্তটি যখন গীত হয় তখন তার নাম বহিষ্পবমান স্তোত্র। এখন ঋগ্বেদের ওই সূক্তটি যদি পড়ে দেখেন তাহলে দেখবেন তার মধ্যে অধ্যাত্মবাদের ছিটেফোঁটাও নেই। এই সূক্তে নয়টি মন্ত্র রয়েছে, এবং নবম মন্ত্রটিতেই সূক্তের চরম কামনা প্রকাশ করে বলা হচ্ছে :
হে ক্লেদবিশিষ্ট পবমান সোম! তুমি ইন্দ্রের সহিত আমাদিগকে সুন্দর বীর্যযুক্ত ধন দান কর।
সূক্তটির আগাগোড়াই এই রকম পার্থিব কামনা।
অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, এ-গান তো আর শুধু গলা ছেড়ে গাইবার গান নয়; সোমযজ্ঞের এক নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গাইবার গান এবং যজ্ঞ মানেই পরলোকতত্ত্ব, অধ্যাত্মবাদ। কিন্তু, মুশকিল হচ্ছে, প্রাচীনেরাই এ-ধরনের কথা জোর গলায় বলতে বারণ করে গিয়েছে। কেননা, যদিও উত্তরযুগে যজ্ঞ বলতে স্বর্গাদির কামনামূলক ক্রিয়াকাণ্ডকেই বুঝিয়েছে তবুও যজ্ঞের আদি-অর্থ নিশ্চয়ই তা ছিলো না। একটি প্রমাণ উদ্ধৃতি করা যাক। ঐতরেয়-ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে,—এবং এক-আধবার নয়, বারবার বলা হয়েছে,—
যজ্ঞ দেবগণের নিকট হইতে, আমি তোমাদের অন্ন হইব না, ইহা বলিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। দেবতারা বলিলেন,—না, তুমি আমাদের অন্নই হইবে। দেবতারা তাঁহাকে (যজ্ঞকে) হিংসা করিয়াছিলেন…(১১৭)
কিংবা,—
একদা যজ্ঞ ভক্ষ্য অন্ন সমেত দেবগণের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছিলেন। দেবগণ বলিলেন, যজ্ঞ ভক্ষ্য অন্ন সমেত আমাদের নিকট হইতে চলিয়া গিয়াছেন এই যজ্ঞের অনুসরণ করিয়া আমরা অন্নেরও অনুসরণ করিব। তাঁহারা বলিলেন, কিরূপে অম্বেষণ করিব? ব্রাহ্মণদ্বারা ও ছন্দোদ্বারা (অম্বেষণ) করিব।…
ঐতরেয় ব্রাহ্মণেই দেখা যায় কী ভাবে ব্রহ্ম ও ক্ষত্র পলায়মান যজ্ঞের অনুসরণ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মই (ব্রাহ্মণ-ই?) যজ্ঞকে ধরে ফেলেন।(১১৮)
