ভাঁজো লো কনকলানী, মাটির লো সরা,
ভাঁজোর গলায় দেবো আমরা পঞ্চফুলের মালা।…
এরপর দুই দলে ভাগ হয়ে মুখেমুখে ছড়াকাটাকাটি করে।…সমস্ত রাত দুই দলের নাচগান ছড়াকাটাকাটির উপরে চাঁদের আলো, তারার ঝিকিমিকি।…
এরপর রাত্রিশেষ, মেয়েরা আপন-আপন শস্পাতার সরা মাথায় নিয়ে পুকুরে কিংবা নদীতে বিসর্জন দিয়ে ঘরে আসে। এখানে শস্যের উদ্গমের কামনা সরাতে শস্যবপন ক্রিয়া থেকে আরম্ভ হলো এবং অনুষ্ঠান শেষ হলো উৎসবের নৃত্যগীতে…(১০৪)
————–
৯৭. G. Thomson ch. xiv.
৯৮. Ibid.
৯৯. J. E. Harrison AAR 30.
১০০. Ibid 30f.
১০১. G. Thomson SAGS 440.
১০২. Ibid
১০৩. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বাংলার ব্রত ৩।
১০৪. ঐ ৫৩-৩।
১৮. ব্রত-প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস পুনর্গঠন করবার মালমসলা হিসেবে বাংলার এই ব্রতগুলি সত্যিই অমূল্য। এমনকি, এই একান্ত লোকায়তিক অনুষ্ঠানগুলির সাহায্যেই বৈদিক সাহিত্যের নানান দুর্বোধ্য তথ্য বোঝবার সম্ভাবনা রয়েছে। এ-বিষয়ে অননীন্দ্রনাথের মন্তব্য বিশেষ করে মনে রাখা দরকার :
খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলিতে তার ছড়ায় এবং আলপনায় একটা জাতির মনের, তাদের চিন্তার, তাদের চেষ্টার ছাপ পাই। বেদের সূক্তগুলিতেও সমগ্র আর্যজাতির একটা চিন্তা, তার উদ্যম উৎসাহ ফুটে উঠেছি দেখি। এ-দু’-এরই মধ্যে লোকের আশা আশঙ্কা চেষ্টা ও কামনা আপনাকে ব্যক্ত করেছে এবং দু’-এর মধ্যে এইজন্যে বেশ একটা মিল দেখা যাচ্ছে। নদী সূর্য এমনি অনেক বৈদিক দেবতা, মেয়েলি ব্রতেও দেখি এঁদেরই উদ্দেশ্যে ছড়া বলা হচ্ছে(১০৫)।
অবনীন্দ্রনাথ দেখাচ্ছেন, বৈদিক সূক্তে ঊষাকে, নদীসকলকে উদ্দেশ্য করে যে-রকম কবিতা রচনা হয়েছিলো খাঁটি মেয়েলি ব্রতগুলির মধ্যে প্রায় তারই পুনরুক্তি পাওয়া যায়(১০৬)। এবং এই প্রসঙ্গেই মনে রাখা দরকার আর্য-অনার্য মতবাদ সাধারণত আমাদের পণ্ডিতমহলে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে থাকে অবনীন্দ্রনাথের মন্তব্য তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত :
আর্য এবং আর্যপূর্ব দু’জনেরই সম্পর্ক যে-পৃথিবীতে তারা জন্মেছে তাকেই নিয়ে, এবং দু’জনেরই কামনা এই পৃথিবীতেই অনেকটা বদ্ধ ধন ধান সৌভাগ্য স্বাস্থ্য দীর্ঘজীবন এমন সব পার্থিব জিনিস; দু’জনে ব্রত করছে যা কামনা করে সেটা দেখলে এটা স্পষ্টই বোঝা যাবে, কেবল পুরুষের চাওয়া আর মেয়েদের চাওয়া, বৈদিক অনুষ্ঠান পুরুষদের আর ব্রত অনুষ্ঠান মেয়েদের, এই যা প্রভেদ। ঋষিরা চাচ্চেন—ইন্দ্র আমাদের সহান হোন, তিনি আমাদের বিজয় দিন, শত্রুরা দূরে পলায়ন করুক, ইত্যাদি; আর বাঙালির মেয়েরা চাইছে—‘রণে রণে এয়ো হব, জনে জনে সুয়ো হব, আকালে লক্ষ্মী হব, সময়ে পুত্রবতি হব’। এর সঙ্গে পৃথিবী-ব্রতের শাস্ত্রীয় প্রণাম-মন্ত্রটি দেখি—
বসুমাতা দেবী গো! করি নমস্কার।
পৃথিবীতে জন্ম যেন না হয় আমার।এই যে পৃথিবীর যা-কিছু তার উপরে ঘোর বিতৃষ্ণা এবং ‘গোক’লে গোকূলে বাস, গরুর মুখে দিয়ে ঘাস আমার যেন হয় স্বর্গে বাস’—এই অস্বাভাবিক প্রার্থনা ও স্বপ্ন, এটা বেদেরও নয়, ব্রতেরও নয়। বৈদিক সূক্তগুলি আর ব্রতের ছড়াগুলিকে আমাদের রূপকথায় বিহঙ্গম বিহঙ্গম দুটির তুলনা করা যেতে পারে। দু’জনেই পৃথিবীর, কিন্তু বেদসূক্তগুলি ছাড়া ও স্বাধীন, উদার পৃথিবীর গান; আর ব্রতের ছড়াগুলি যেন নীড়ের ধারে বসে ঘন সবুজের আড়ালে পক্ষিমাতার কাকলি—কিন্তু দুই গানই পৃথিবীর সুরে বাঁধা(১০৭)।
অবনীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছেন, ব্রতের সঙ্গে বেদের সাদৃশ্য সত্ত্বেও একটি মৌলিক অমিল রয়েছে : বৈদিক অনুষ্ঠান পুরুষদের আর ব্রত অনুষ্ঠান মেয়েদের। বামাচার-প্রসঙ্গেও আমরা এই রকমই একটি প্রভেদ লক্ষ্য করেছি : বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের স্মারকগুলি পুরুষপ্রধান, লোকায়তিক বামাচার স্ত্রীপ্রধান। এই প্রভেদের কারণ ঠিক কী—সে প্রশ্নের আলোচনায় পরে ফিরতে হবে। আপাতত, সাদৃশ্যের দিকটিতেই মনোযোগ দেওয়া যাক। অবনীন্দ্রনাথ বলছেন, দুই গানই পৃথিবীর সুরে বাঁধা, দু’-এর মূলেই কামনা হলো এই পৃথিবীতেই অনেকটা বদ্ধ ধন ধান সৌভাগ্যে স্বাস্থ্য দীর্ঘজীবন এমন সব পার্থিব জিনিস। দার্শনিক পরিভাষায়, দুই-ই প্রাক-অধ্যাত্মবাদ, প্রাক-ভাববাদ। আমাদের যুক্তি অনুসারে তার কারণ অস্পষ্ট নয় : দু’-এর উৎসেই রয়েছে প্রাগ-বিভক্ত সমাজ-জীবন। যে-চেতনায় প্রাগ-বিভক্ত সমাজ-জীবন প্রতিফলিত তার মধ্যে অধ্যাত্মবাদের বিকাশ হবার অবকাশ নেই।
ব্রতের মধ্যে সমাজ-জীবনের কোন পর্যায়ের প্রতিচ্ছবি, সে-প্রশ্ন অবশ্য অবনীন্দ্রনাথ তোলেন নি। কিন্তু তবুও তাঁরই নানা মন্তব্য আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় ব্রতের সঙ্গে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের যোগাযোগ অন্বেষণ করবার দিকে। প্রথমত, তিনি বলছেন, এই আদি অকৃত্রিম ব্রতগুলি অতি প্রাচীন—আর্যরা এ-দেশে আসবার আগে থাকতেই এ-দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিলো(১০৮)। ব্রতগুলি যদি সত্যিই অতো পুরোনোকালের হয় তাহলে তার মধ্যে সমাজ-বিকাশের অতি প্রাচীন পর্যায়ের প্রতিচ্ছবিই খুঁজে পাওয়া স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, বাংলা দেশের এই ব্রতগুলিকে বোঝবার কৌশল হিসেবে তিনি যে-পদ্ধতির কথা বলছেন তারও ঈঙ্গিতটা একই রকম : পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আজো যে-সব মানুষ সমাজ-বিকাশের অনেক আদিম পর্যায়ে পড়ে রয়েছে তাদের আচরণ থেকে এগুলিকে বোঝবার সূত্র পাওয়া যাবে। বস্তুত, বাংলা দেশের লক্ষ্মীব্রতটি বোঝবার জন্যে অবনীন্দ্রনাথ প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারের মেক্সিকো, পেরু প্রভৃতি দেশের অনার্যদের(১০৯) আচরণ থেকেই আলো সংগ্রহ করছেন। বাংলার ব্রতের সঙ্গে এ-জাতীয় আদিবাসীদের ক্রিয়াকর্মের যদি মিল থাকে তাহলে নিশ্চয়ই অনুমান করবার সুযোগ থাকে যে, দু’-এর মূলেই অনুরূপ সমাজ-বাস্তব। তৃতীয়ত, ব্রতের সঙ্গে প্রাগ-বিভক্ত সমাজের সম্পর্কের ইঙ্গিত অবনীন্দ্রনাথের নিম্নোক্ত মন্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠতে দেখা যায় :
একজন মানুষের কামনা এবং তার চরিতার্থতার ক্রিয়া, ব্রত-অনুষ্ঠান বলে ধরা যায় না। যদিও ব্রতের মূলে কামনা এবং চরিতার্থতার জন্য ক্রিয়া, কিন্তু ব্রত তখন যখন দশে মিলে এককাজ এক-উদ্দেশ্যে করছে। ব্রতের মোটামুটি আদর্শ এই হলো—এদের কামনা দশের মধ্যে প্রবাহিত হয়ে একটা অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। একের সঙ্গে অন্য দশজনে কেন যে মিলছে, কেন যে একের অনুকরণ দশে করছে, সেটা দেখবার বিষয় হলেও আমরা সে-সব জটিল প্রশ্নের এখন যাবো না। একজনকে দিয়ে নাচ অলে কিন্তু নাটক চলে না, তেমনি একজনকে দিয়ে উপাস্য দেবতার উপাসনা চলে কিন্তু ব্রত অনুষ্ঠান চলে না। ব্রত ও উপাসনা দুই-ই ক্রিয়া—কামনার চরিতার্থতার জন্য; কিন্তু একটি একের মধ্যে বদ্ধ এবং উপাসনাই তার চরম, আর একটি দশের মধ্যে পরিব্যাপ্ত—কামনার সফলতাই তার শেষ—এই তফাত(১১০)।
একের সঙ্গে অন্য দশজনে কেন মিলছে—অবনীন্দ্রনাথ সেই জটিল প্রশ্নে গেলেন না; কিন্তু এ-সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ব্রতের সমস্যা জটিল হয়েই থাকবে। তিনিই যে পথের নির্দেশ দিয়েছেন সেই পথে অগ্রসর হলে আমরা হয়তো এই প্রশ্নেরও উত্তর পেয়ে যাবো। তাই আমরা এখানে আর একটি প্রশ্ন তুলতে চাই : পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আজো যে-সব আদিম মানুষের দল বেঁচে রয়েছে তাদের সম্বন্ধে সাধারণতভাবে এমন কোনো কথা জানা আছে কিনা যার সাহায্যে ওই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, বোঝা যাবে একের সঙ্গে অন্য দশজনে কেন মিলছে।
