অন্নলাভের সঙ্গে গানের কোনো যোগ থাকা সম্ভব কিনা এ-বিষয়ে আজকের দিনে আমার-আপনার একটা মত থাকতে পারে, আছেও নিশ্চয়ই। কিন্তু আমাদের বর্তমান আলোচনা মোটেই তা নিয়ে নয়। আমরা শুধু দেখতে চাইছি, প্রাচীনদের ধারণা অনুসারে এ-রকম কোনো যোগাযোগ মানা দরকার কিনা।
প্রাচীনদের ধারণায় গানের সঙ্গে অন্নের যোগটা যে কতো ঘনিষ্ঠ তার অন্যান্য পরিচয় উপনিষদেই দেখতে পাওয়া যায়। উপনিষদের ঋষিরা উদ্গীথ শব্দটিকে কী ভাবে বিশ্লেষণ করতে চান তাই দেখুন। ছান্দোত্য-উপনিষদে বলা হয়েছে, তাই উদ্গীথের অক্ষরগুলিকে সম্যকভাবে বুঝতে হবে (উপাসীত) :
খলুদ্গীথাক্ষরাণ্যুপাসীতোদ্গীথ ইতি প্রাণ এবোং প্রাণেন হ্যত্তিষ্ঠতি বাগ্গীর্বাচো হ গির ইত্যাচক্ষতেহন্নং থমন্নে হীদং সর্বং স্থিতম্।।১।৩।৬।।
অর্থাৎ, অনন্তর উদ্গীথের অক্ষরসমূহকে উপাসীত। উদ্গীথ এই : প্রাণই হইল উৎ অক্ষর, কেননা, প্রাণের দ্বারাই উত্তিষ্ঠ হয়। বাক্-ই হইল গী অক্ষর, (কেননা) বাক্কেই গী বলা হয়। অন্নই হইল থম্ এই অক্ষর, (কেননা) এই সমুদয় অন্নেরই অবস্থিত।
তাহলে, সামগানের ওই উদ্গীথ বলে নামটিকে ভেঙে দেখলেই দেখতে পাবেন, তার মধ্যে অন্নের অভাব নেই! এবং এ-কথা একালের কোনো চিন্তাশীলের কল্পনা নয়—স্বয়ং ঋষিদের দস্তখৎ করা দলিল।
সামগানের সঙ্গে অন্নের সম্পর্ক নিয়ে উপনিষদে আরো কথা লেখা আছে। সামগানের চতুর্থ পর্যায়টিকে বলে প্রতিহার—আধুনিক পণ্ডিতদের তর্জমায় response। ছান্দোগ্য-উপনিষদেই প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রতিহারের অনুগমনকারী দেবতাটির স্বরূপ নিয়ে। ঊষস্তি চাক্রায়নকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, কে সেই দেবতা? প্রশ্নের শর্তটা অবশ্যই খুব কঠিন : এই দেবতাকে না জেনে ঊষস্তি চাক্রায়ন যদি প্রতিহার-কর্ম করনে তাহলে তাঁর মাথা কাটা যাবে। উত্তরে ঊষস্তি চাক্রায়ন যা বলেছিলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর :
অন্নমিতি হোবাচ সর্ব্বাণি হ বা ইমানি ভূতান্যন্নমেব প্রতিহরমাণানি জীবন্তি সৈষা দেবতা প্রতিহারমন্বায়ত্তা তাং চেদবিদ্বান্ প্রত্যহরিষ্যে মুর্দ্ধা তে ব্যপতিষ্যত্তথোক্তস্য ময়েতি তথোক্তস্য ময়েতি।।১।১।১৯।।
অর্থাৎ, তিনি বলিলেন, অন্নই সেই দেবতা। এই সমুদয় ভূতই অন্ন আনয়ন করিয়া (প্রতিহরমাণানি=প্রতি+হৃ+শানচ্=আনয়ন করিয়া) জীবনধারণ করে। সেই দেবতাই প্রতিহারের অনুগমন করেন। তাহাকে না জানিয়াই আপনি যদি প্রতিহার-কর্ম করিয়া থাকেন তাহা হইলে আপনারই শির নিপতিত হইবে।
ঊষস্তি চাক্রায়ণের শির নিপতিত হয়েছিলো—এমনতরো কোনো কথা উপনিষদে লেখা নেই। বরং, ঊষস্তি চাক্রায়ণের সংবাদ ওইখানেই শেষ হলো। তার থেকেই বোঝা যায়, উপনিষদের ওই অংশে তাঁর এই কথাগুলিই উপনিষদের ঋষিদের কাছে এ-বিষয়ে চরম প্রতিপাদ্য ছিলো।
তাহলে, উপনিষদের ওই কুকুরগুলি গানের সঙ্গে—সামগানের সঙ্গে—অন্ন-আহরণের সম্পর্ক উল্লেখ করে এমন কোনো কথা বলছে না যা কিনা সাধারণভাবে উপনিষদের ঋষিদের মতবাদের সঙ্গে খাপ খায় না। বরং, উপনিষদের ঋষিদের চেতনায় এই সম্পর্কের কথাটা যেন এই স্থির বিশ্বাসের মতো—বারবার তা ঘুরে আসছে দেখা যাক।
১৬. গান আর কাজ
কিন্তু ব্যাপারটা কী? আমাদের আধুনিককালের ধারণার সঙ্গে এই কথাগুলির সঙ্গতি নেই। আর তা যদি না থাকে তাহলে এগুলিকে বোঝবার একমাত্র উপায় হতে পারে আধুনিক যুগের সামাজিক পরিবেশটিকে ছেড়ে প্রাচীন সমাজের দিকে চেয়ে দেখা, সন্ধান করা যে এমন কোনো সমাজব্যবস্থা সত্যিই সম্ভব কিনা যেখানে গান আর খাদ্য-উৎপাদন সত্যিই অঙ্গাদি সম্পর্কে সংযুক্ত।
সত্যিই কি ওই রকম কোনো সমাজের খবর জানা আছে? আছে। সে-সমাজ অবশ্যই খুব পিছিয়ে-পড়া সমাজ—তার আদি ও অকৃত্রিম রূপ নিশ্চয়ই আদিম সাম্যসমাজ, যদিও আদিম সাম্যসমাজ ভেঙে যাবার পরও মানুষের চিন্তায় কাজের সঙ্গে গানের যোগাযোগটির রেশ বহুদিন ধরেই থেকে গিয়েছে।
বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে বুঝতে সুবিধে হবে অধ্যাপক জর্জ টম্সনের(৮৯) রচনা অনুসরণ করলে।
অধ্যাপক টম্সন শুরু করছেন একেবারে গোড়ার কথা থেকে। গান বা সংগীতের জন্ম হলো কী করে? এ-কথা বুঝতে হলে ভাষার জন্মবৃত্তান্তও মনে রাখা দরকার। কেননা, বাক বা ভাষা ছাড়া গান হয় না—অন্তত আধুনিক যুগের বিশুদ্ধ যন্ত্রসঙ্গীতের বেলায় যাই হোক না কেন, পুরোনো আমলে ভাষা বাদ দিয়ে গানের কথা ভাবা যায় না। উদ্গীথের শব্দার্থ-বিশ্লেষণে ঋষিরাও বলছেন, বাক্-ই গী(৯০)! কিন্তু ভাষার জন্মবৃত্তান্ত অনুসন্ধান করতে হলে মানুষের জন্মবৃত্তান্ত নিয়েও আলোচনা তুলতে হয়, কেননা, মানুষের পক্ষে পশুজগৎ ছেড়ে আসবার পরিচয় প্রধানত দু’দিক থেকে : হাতিয়ার আবিষ্কার ও ভাষা আবিষ্কার। জানোয়ারেরা হাতিয়ার বানাতে পারে না, কথা কইতে পারে না—পৃথিবীতে শুধুমাত্র মানুষই তা পারে।
মানুষের পক্ষে হাতিয়ার আবিষ্কার এবং ভাষা আবিষ্কার—দুটো খুব স্বতন্ত্র ঘটনা নয়। হাতিয়ারের সাহায্যে মানুষ উৎপাদন-কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারলো। কিন্তু গোড়ার দিকে কারুর পক্ষেই এই উৎপাদন-কাজ একাএকা সম্পাদন করা সম্ভব নয়—দশহাত এক হয়ে একসঙ্গে কাজ করেছে। আর এরই দরুন পরস্পরের মধ্যে চিন্তার আদান-প্রদানের প্রয়োজন দেখা দিলো—সেই তাগিদেই মানুষের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে সংযোজিত হতে লাগলো অর্থ : মানুষ আর জানোয়ারদের মতো চিৎকার করে না, রীতিমতো কথা বলে। পুরো দলের ওই একান্ত দলগত কাজটিকে সুনিয়ন্ত্রিত করবার তাগিদেই মানুষের ভাষা উন্নত হতে লাগলো। তাই গোড়ার দিকে হাতের কাজের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গি(৯১)।
