এ-কথার প্রমাণ রয়েছে বৃহদারণ্যক উপনিষদে একেবারে শেষের দিকে:
স হ প্রজাপতিরীক্ষাংচক্রে হস্তাস্মৈ প্রতিষ্ঠাং কল্পযানীতি স স্ত্রিয়ং সসৃজে তাং সৃষ্ট্বাহধ উপাস্ত তস্মাৎ স্ত্রিয়মধ উপাসীত স এতং প্রাঞ্চং গ্রাবাণমাত্মন এব সমুদপারয়ত্তে নৈনামভ্যসৃজৎ।।৬।৪।২।।
তস্যা বেদিরুপস্থো লোমানি বর্হিশ্চর্মাধিষবণে সমিদ্ধো মধ্যতস্তৌ মুষ্কৌ স যাচান্ হ বৈ বাজপেয়েন যজমানস্য লোকো ভবতি তাবানস্য লোকো ভবতি য এবং বিদ্বানধোপহাসংচরত্যাসাং স্ত্রীণাং সুকৃতং বৃঙক্তেহথ য ইদমবিদ্যানধোপহাসংচরত্যস্য স্ত্রিয়ঃ সুকৃতং বৃঞ্জতে।।৬।৪।৩।।
প্রজাপতি মনে-মনে চিন্তা করলেন, ‘এসো আমি এর জন্যে একটি প্রতিষ্ঠা সৃষ্টি করি। তিনি স্ত্রী সৃষ্টি করলেন। তাকে সৃষ্টি করে তিনি তার অধোদেশে মিলিত হলেন (উপাস্ত=মিলিত হলেন। মনিয়ার উইলিয়ম্স-এর অভিধান দ্রষ্টব্য)। সেই কারণে স্ত্রীর অধোদেশে মিলিয়ে হওয়া উচিত (উপাসীত)। তিনি নিজের উর্ধ্বোত্থিত গ্রাবাণকে (আক্ষরিক অর্থে গ্রাবাণ যদিও সোমরস নিষ্কাশনের শিলাখণ্ড, তবুও এখানে শব্দটি স্পষ্টই শিশ্ন-ব্যঞ্জক) প্রসারিত করে দিলেন। তার দ্বারা তিনি তাকে গর্ভবতী করলেন।।৬।৪।২।।
তার (অর্থাৎ স্ত্রীলকটির) উপস্থ (=নিম্নাঙ্গ) বেদি (যজ্ঞবেদী); তার লোম (=চুল) যজ্ঞতৃণ; তার চর্ম অধিযবন (=সোমরস নিষ্কাশনের যন্ত্র); তার মুষ্কদ্বয় (=the two labia of the vulva : রাধাকৃষ্ণণ ও হিউমের তর্জমা দ্রষ্টব্য) মধ্যস্থ অগ্নি। বাজপেয়-যজ্ঞকারীর কাছে জগৎ যতো বৃহৎ, এই (তত্ত্ব) জেনে যে মৈথুন করে তার কাছেও জগৎ ততো বৃহৎ। যে স্ত্রী দ্বারা নিজে শক্তিমান হয়। যে এ (তত্ত্ব) না জেনে মৈথুন করে স্ত্রী তার সুকৃতকে…।।৬।৪।৩।। ইত্যাদি, ইত্যাদি।
এরকম প্রকট বামাচারী চিন্তা যদি উপনিষদের মধ্যে মাত্র একবারই উঁকি দিতো তাহলে না হয় আধুনিক পণ্ডিতদের পক্ষে একে দেখেও না দেখার ভাবটা অতোখানি দোষাবহ হতো না। কিন্তু উদ্বৃত অংশের মূল কথাটি শুধুমাত্র উদ্বৃত অংশটুকুর মধ্যেই আবদ্ধ নয়, অন্যত্রও তার স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।
ছান্দোগ্যের ঋষি বলছেন :
যোযা বাব গৌতমাগ্নিস্তস্যা উপস্থ এব সমিধ্ যদুপমন্ত্রয়তে স ধূমো যোনিরর্চির্ষদন্তঃ করোতি তেহঙ্গারা অভিনন্দা বিস্ফুলিঙ্গাঃ।।৫।৮।১।।
তস্মিন্নেতস্মিন্নগ্নৌ দেবা রেতো জুহ্বতি তস্যা আহুতের্গর্ভঃ সম্ভবতি।।৫।৮।২।।
অর্থাৎ, হে গৌতম, স্ত্রীলোকই হলো যজ্ঞীয় অগ্নি। তার উপস্থই হলো সমিধ। ওই আহ্বানই হলো ধূম। যোনিই হলো অগ্নিশিখা। প্রবেশ-ক্রিয়াই হলো অঙ্গার। রতিসম্ভোগই হলো বিস্ফুলিঙ্গ।।৫।৮।১।।
এই অগ্নিতে দেবতারা রেতর আহুতি দেন। সেই আহুতি থেকেই গর্ভ সম্ভব হয়।।৫।৮।২।।
আবার বৃহদারণ্যকেও হুবহু এই কথাই দেখতে পাওয়া যায় :
যোযা বা অগ্নির্গৌতম তস্যা উপস্থ এব সমিল্লোমানি ধূমো যোনিরর্চির্ষদন্তঃ করোতি করোতি তেহঙ্গারা অভিনন্দা বিস্ফুলিঙ্গাস্তস্মিন্নেতস্মিন্নগৌ দেবা রেতো জুহ্বতি তস্যা আহুত্যৈঃ পুরুষঃ সংভবতি…।।৬।২।১৩।।
তর্জমা আগের উদ্বৃতিটির অনুরূপ হবে।
তাহলে, উপনিষদের ঋষি মৈথুন-ক্রিয়াকে খোলাখুলি ভাবেই যজ্ঞ বলে উল্লেখ করছেন। কথায় কথায় সোমযাগ থেকে উপমা নেবার চেষ্টাটাও লক্ষ্য করবার মতো। আমাদের আধুনিক রুচিতে এ-সব কথাবার্তা যতোই কদর্য লাগুক না কেন, উপনিষদের ঋষিরা এই তত্ত্বটির প্রতিই যে কতোখানি গুরুত্ব দিতে চান তার পরিচয় পাওয়া যায় নানান দিক থেকে। বৃহদারণ্যকে উক্ত তত্ত্ব বলবার পরই ঋষি তিনজন প্রাচীন জ্ঞানীর নজির দেখাচ্ছেন : বিদ্বান উদ্দালক আরুনি, বিদ্বান নাক মৌদ্গল্য, বিদ্বান কুমারহারিত—তিনজন বিদ্বানই নাকি এই তত্ত্ব জানতেন এবং সেই মর্মে উপদেশ দিয়েছেন এবং এই প্রসঙ্গেই এগিয়ে বৃহদারণ্যকের ঋষি বলছেন :
…বদ্যুদক আত্মানং পশ্যেত্তদতিমন্ত্রয়েত ময়ি তেজ ইন্দ্রিয়ং যশো দ্রবিনং সুকৃতমিতি শ্রীর্হ বা এবাং স্ত্রীপাং যন্মলোদ্বাসাস্তস্মান্নলোদ্বাসসং যশস্বিনীমভিক্রম্যোপমন্ত্রয়েত।।৬।৪।৬।।
সা চেদস্মৈ ন দন্তাৎ কামমেনামবক্রীণীয়াৎ সা চেদস্মৈ নৈব দস্যাৎ কামমেনাং যষ্ট্যা বা পাণিনা বোপহত্যাতিক্রামেদিন্দ্রিয়েণ তে যশসা যশ আদদ ইত্যযশা এব ভবতি।।৬।৪।৭।।
…কেউ যদি নিজেকে জলে দেখে তাহলে জপ করবে, ‘আমাতে তেজ, ইন্দ্রিয়সামর্থ্য, যশ, ধন, সুকৃত (আসুক)’।
এই হলো স্ত্রীলোকের মধ্যে শ্রী, যখন সে মলোদ্বাসা হয় (মল+উৎবাসাঃ, খুব সম্ভব, ঋতুর পর মলবস্ত্র ত্যাগ করবার উল্লেখ করা হচ্ছে)। অতএব মলোস্বাসা যশস্বিনী স্ত্রীলোকের নিকট গমন করে তাকে আহ্বান করবে।।৬।৪।৬।।
সে (স্ত্রীলোকটি) যদি তাকে কাম দিতে রাজী না হয় তাহলে তাকে (স্ত্রীলোকটিকে) নিজ বসে আনয়ন করবে। সে (স্ত্রীলোকটি) যদি তাকে (পুরুষকে) কাম দিতে রাজী না হয় তাহলে তাকে (স্ত্রীলোকটিকে) লাঠি দিয়ে বা হাত দিয়ে প্রহার করে অভিভূত করে বলবে, ‘আমার ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা, আমার যশদ্বারা তোমার যশকে কেড়ে নিচ্ছি’। এই ভাবে সে (স্ত্রীলোকটি) যশহীনা হয়।।৬।৪।৭।। ইত্যাদি ইত্যাদি।
বলাই বাহুল্য, আজকের দিনে এ-ধরনের উপদেশ দিতে গেলে আমরা ঋষির গৌরব পাবার বদলে নিজেরাই লাঠিপেটা বা কিলচড় খাবো। কিন্তু বৃহদারণ্যক উপনিষদের লেখক মেয়েদের লাঠি-পিটে, কিলচড় লাগিয়ে কামভাব চরিতার্থ করিতে দিতে বাধ্য করবার উপদেশ দিয়েও মারধোর খেয়েছিলেন বলে কোথাও লেখা নেই। বরং তাঁর বইকে প্রাচীনেরা জ্ঞানের আকর বলেই মনে করছেন।
