আমাদের যুক্তি অনুসারে, কৃষিবিদ্যা মেয়েদের আবিষ্কার। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ের কৃষিকেন্দ্রিক সমাজ নারীপ্রধান। এই পর্যায়ের কৃষিবিদ্যার অপরিহার্য অঙ্গ যে-জাদুঅনুষ্ঠান তার মূল কথা হলো, নারীর প্রজননশক্তির সাহায্যে প্রকৃতির ফলপ্রসূতাকে আয়ত্তে আনবার প্রচেষ্টা। এই জাদুঅনুষ্ঠানের মধ্যেই তন্ত্রসাধনার উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। উত্তরকালেও আমাদের দেশে উৎপাদন-কৌশলের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থেকেছে। ফলে দেশের আচার-অনুষ্ঠান ও ধ্যানধারণার ক্ষেত্র থেকে কৃষিবিদ্যার ওই প্রাথমিক পর্যায়ের স্মারকগুলি বিলুপ্ত হয়নি—যদিও এই স্মারকগুলির মধ্যে উক্ত আচার-অনুষ্ঠান ও ধ্যানধারণার আদি-তাৎপর্য অনিবাৰ্যভাবেই বিপরীতে পর্যবসিত হয়েছে। এই কারণেই আমাদের দেশে এতোদিন ধরে তন্ত্রসাধনার এমন ব্যাপক ও গভীর প্রভাব। অবশ্যই, উত্তরকালে এই তন্ত্রসাধনার উপর হিন্দু-ধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের নানা বিষয় প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, তন্ত্রসাধনা দ্বিবিধ, হিন্দু ও বৌদ্ধ। স্বভাবতই, হিন্দুধৰ্মমূলক ও বৌদ্ধধৰ্মমূলক ওই অধ্যস্ত বিষয়গুলির উপর দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে তন্ত্রসাধনার স্বরূপকে চেনা যাবে না। আমাদের দেশের বৈদান্তিকেরা সাধারণত একটি উপমা ব্যবহার করে থাকেন। তারই উপর নির্ভর করে আমরাও এখানে আমাদের বক্তব্য উপস্থিত করতে পারি। জবাফুলের সংস্পর্শে এসে স্ফটিক যদিও রক্তবর্ণ বলে প্রতিভাত হয় তবুও স্ফটিকের স্বরূপ উপলব্ধি করতে হলে এই রক্তবর্ণের উপর দৃষ্টি আবদ্ধ রাখা ভুল হবে। তেমনিই, হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের সংস্পর্শে এসে তন্ত্রসাধনার উপর যে-সব ধ্যানধারণা অধ্যস্ত হয়েছে তারই উপর দৃষ্টি আবদ্ধ রাখলে এ-সাধনার স্বরূপ উপলব্ধি সম্ভবপর হবে না।
আধুনিক বিদ্বানদের মধ্যে অনেকেই স্বীকার করছেন যে, অতি আদিম যুগ থেকে আমাদের দেশে তন্ত্রসাধনার একটি স্রোত বয়ে চলেছে। তারই সঙ্গে হিন্দুধর্মের মিশেল হয়ে হিন্দুতন্ত্রের এবং বৌদ্ধধর্মের মিশেল হয়ে বৌদ্ধতন্ত্রের জন্ম হয়েছিলো। যদি তাই হয় তাহলে মানা দরকার, তান্ত্রিক পুঁথিপত্রগুলির মধ্যে থেকে হিন্দুতন্ত্রের হিন্দুত্ব এবং বৌদ্ধতন্ত্রের বৌদ্ধত্ব সচেতনভাবে সরিয়ে রেখেই আমরা তন্ত্রসাধনার আকৃত্রিম রূপটির পরিচয় পেতে পারি।
হিন্দুতন্ত্রের পুঁথিপত্রে নানান কথা পাওয়া যায় : পূজা, মোক্ষ, স্বর্গপ্রাপ্তি, ব্ৰহ্মজ্ঞান। তাছাড়া নানান দেবদেবীর কথা তো আছেই। এমন কি বেদান্তদর্শনের অনেক ধ্যানধারণাও এই গ্রন্থগুলির মধ্যে খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। তন্ত্রসাধনার আলোচনায় স্বভাবতই এগুলির কথা অপ্রাসঙ্গিক হওয়া উচিত।
বৌদ্ধতন্ত্রের পুঁথিপত্রে নির্বাণ, বজ্রসত্ব, প্রজ্ঞাপারমিতা, বোধিসত্ত্ব প্রভৃতি বিবিধ বিষয়ের উল্লেখ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তাছাড়াও, যোগাচার মাধ্যমিক প্রভৃতি দার্শনিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বকথাও বৌদ্ধতন্ত্রের পুঁথিতে বিরল নয়। গবেষকের দৃষ্টি এগুলির প্রতি আবদ্ধ হলে তন্ত্রসাধনার মৌলিক রূপটি তার চোখে ধরা পড়বে না।
পুঁথিপত্রে পাওয়া তন্ত্রসাধনার রূপ থেকে এইভাবে হিন্দুধর্ম ও হিন্দুদর্শন এবং বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধদৰ্শনের প্রসঙ্গ সচেতনভাবে বাদ দিলে কী বাকি থাকে? কৃষিকেন্দ্রিক জাদুঅনুষ্টান এবং তার অন্তর্নিহিত আদিম বিশ্বাস। পৃথিবীতে যে-সব মানবদল আজো ওই আদিম পর্যায়ের কাছাকাছি আটকে পড়ে আছে তাদের দিকে চেয়ে দেখলে এই বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানের রূপটি আরো প্রকটভাবে আমাদের চোখে ধরা পড়বে। তাই আমাদের পদ্ধতি অনুসারে, তন্ত্রকে বোঝবার জন্যে ওই পিছিয়ে-পড়ে-থাকা মানুষদের দিকে চেয়ে দেখা দরকার : তন্ত্রের লিখিত পুঁথিপত্রের মধ্যে যেসব কথা উত্তরকালের ধ্যানধারণার জটিলতায় অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে সেগুলির জীবন্ত—অতএব স্পষ্টতর—রুপ পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।
————————–
৬২০. M. Monier-Williams SED—তন্ত্রI cf. শঙ্কর ব্রহ্মসূত্র-ভাষ্য ২.১.৩ “কপিলস্য তন্ত্রস্য” ইত্যাদি।
৬২১. বিশ্বকোষ ৭:৫০৪।
৬২.২. R. Briffault op cit. 1:46lsq.
৬২৩. ERE 12:192.
৬২৪. বিশ্বকোষ ৭:৫০৮ ।
৬২৫. ERE 12:192.
৬২৬. পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী ২:২৫৯ ৷
৬২৭. ঐ ২:২৫৯-৬০।
৬২৮. cf. G. Thomson SAGS 239.
৬২৯. পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী ২:২৭৪ ।
৬৩০. ঐ ২:২৮০-১।
৬৩১. ঐ ২:২২০।
৬৩২. S. Dasgupta ORC 27.
৬৩৩. Ibid. xxxiv.
৬৩৪. Ibid.
৬৩৫. বিশ্বকোষ ৭:৫৪৭।
৬৩৬. ERE 12.194.
৩৮. সহজিয়া ও অন্যান্য সম্প্রদায় প্রসঙ্গে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
আমরা শুরুতেই দেখেছি, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলছেন যে, নামান্তরের আড়ালে লোকায়তিক সম্প্রদায় আজো আমাদের দেশে টিকে রয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি সহজিয়া-সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করছেন। অতএব, লোকায়তর আলোচনায় আমাদের পক্ষে এই সহজিয়া সম্প্রদায়ের স্বরূপকে বোঝবার চেষ্টা করা দরকার।
সহজিয়া বলতে ঠিক কী বোঝায়? সহজিয়া সম্প্রদায় এলো কোথা থেকে? মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও বলছেন, এই সহজিয়া সম্প্রদায় বা সহজযান আসলে হলো বৌদ্ধধর্মের অধঃপাতের ফল :
