আবার এই জাদুবিশ্বাসের বিকাশ উল্টো দিক থেকেও হতে পারে। সন্তানবতী হবার কামনায় মেয়ের প্রকৃতিতে ফল-ফলবার নকল তুলতে পারে। আমাদের দেশে আজো পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের নানা বিশ্বাস ও অনুষ্ঠান টিকে আছে; তাই ওই জাদুবিশ্বাসের নমুনাও খুব বিরল নয়। দেখা যায়, সন্তান-লাভের কামনায় বন্ধ্যা মেয়েরা গাছের শাখায় ঢিল বেঁধে দেয়(৩৯৯)। গাছের ঢিল হলো ফলের নকল; এইভাবে ফল ফলবার নকল তুলেই মেয়ের ফলপ্রসূ হবার কামনাকে সফল করবার কল্পনা করে।
প্রকৃতির ফলপ্রসূতার সঙ্গে মেয়েদের ফলপ্রসূতার একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ভিত্তির উপরই জাদুবিশ্বাসটি প্রতিষ্ঠিত। এবং এই জাদুবিশ্বাস
মূলক অনুষ্ঠানের মূল কথা হলো, একটির সাহায্যে আর একটির কামনাকে সফল করবার চেষ্টা। এবং যে-ধরনের উৎপাদন-কাজের সঙ্গে মানুষের সবচেয়ে
প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তা হলো সন্তান-উৎপাদন; ফলে তারই উপমার উপর নির্ভর করে ওই স্তরের মানুষ প্রকৃতির উৎপাদন-রহস্যকেও বোঝবার চেষ্টা করছে। অর্ধ-অসহায় ওই মানুষগুলি প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করবার আশায় আর কোন পথেই বা এগোতে পারতো?
তাহলে, এই জাদুবিশ্বাসকে বোঝবার মূলসূত্র হলো, প্রজনন ও ধনউৎপাদনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কল্পনা।
অধ্যাপক জর্জ টম্সন(৪০০) বলেছেন :
In the earliest phases of human society collective labour was a condition of survival. Food-gathering and hunting, at a low technical level, requird many hands. There was no danger in too many, because the surplus could always move away, but too few meant death. Production of the means of subsistence was inseparable from the reproduction of the group itself. And if the technique of production was precarious, so was that of reproduction. The infant mortality of the primitive peoples is enormous. The magical rites that cluster everywhere round the event of childbirth sprang from material necessity.
Similar conditions recur at a higher level with the discovery of agriculture…The crops, tended labouriously by the women, were blessed or blighted by the goddess of childbirth.
মানবসমাজের সবচেয়ে প্রাকৃত পর্যায়ে জীবন-মরণ নির্ভর করেছে যৌথ-শ্রমের উপর। উৎপাদন-কৌশলের অনুন্নত পর্যায়ে খাদ্য-আহরণ ও শিকারের জন্যে অনেক হাতের প্রয়োজন পড়তো। সংখ্যাধিক্য ভয়ের কারণ ছিলো না, কেননা বাড়তি মানুষেরা অন্তত্র চলে যেতে পারতো। কিন্তু সংখ্যালঘু মানে ছিলো মৃত্যু। জীবনধারণের উপকরণগুলির উৎপাদন এবং দলের প্রজনন—দু’-এর মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিলো। এবং উৎপাদন-কৌশলের মতোই প্রজনন-কৌশলও ছিলো অনিশ্চিত। আদিম মানুষদের মধ্যে শিশু-মৃত্যুর হার ভয়াবহ। সন্তানজন্ম ঘিরে সর্বত্রই যে-জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়া যায় তার উৎসে আছে বাস্তব প্রয়োজনবোধ।
কৃষি আবিষ্কারের পর্যায়ে একই পরিস্থিতির উন্নতর পুনরাবৃত্তি দেখা যায়।…মেয়ের যে-শস্য সযত্নে লালন করে তার উপর সন্তান-জন্মের দেবীর আশীৰ্বাদ বা অভিশাপ।
আমাদের দেশে সন্তান-জন্মের দেবী হলেন ষষ্ঠী। আর ষষ্ঠীক বা ষষ্ঠীকা হলো ব্রীহিধান্য, “চলতি ষেটে ধান। এই ধান ৬০ দিনে পক্ক হয়, সেইজন্য ইহাকে ষষ্ঠীক কহে”(৪০১)। সন্তানদায়িনী দেবীর নামের সঙ্গে শস্যের এই সম্পর্ক কেন?
সন্তানের জন্মদান ও ফসল-ফলানো—আদিম মানুষের ধারণায় দু’-এর মধ্যে সম্পর্ক খুব নিবিড়। প্রত্নতত্ত্ববিদ্(৪০২) অনুমান করেন আদিম নিড়ানি (hoe) পুরুষ-জননঅঙ্গের অনুকরণেই গঠিত হয়েছিলো, ভাষাতত্ত্ববিদ((৪০৩) ও অনুমান করেন লিঙ্গ শব্দ থেকেই লাঙল শব্দের উৎপত্তি। যদি তাই হয় তাহলে স্বীকার করতে হবে, প্রজননের উপমার সাহায্যেই মানুষ ফসল ফলার ঘটনাটিকে বুঝতে শুরু করেছে।
—————
৩৯৮. R. Briffault 3:3.
৩৯৯. গয়া, পুরী প্রভৃতি তীর্থস্থানে এ জাতীয় গাছের দৃষ্টান্ত প্রচুর।
৪০০. G. Thomson SAGS 204.
৪০১. বিশ্বকোষ ২০:৭৫৪।
৪০২. P. C. Bagchi PAPDI 10.
৪০৩. Ibid. 14.
২৯. তান্ত্ৰিক ধ্যানধারণার নারীপ্রাধান্য
প্রজনন ও উৎপাদনের সাদৃশ্য-নির্ভর এই জাদুবিশ্বাসটির আলোচনা অবশ্যই বিস্তারিতভাবে করতে হবে। কেননা তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার উৎস অন্বেষণে এই জাদুবিশ্বাসটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে মৌলিক সূত্র।
কিন্তু এই জাদুবিশ্বাসটির বিভিন্ন বিকাশ সংক্রান্ত আলোচনা তোলবার আগে তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা তুলবো। বৈশিষ্ট্যটি হলো নারী-প্রাধান্য বা শক্তি-প্রাধান্য বা দেবী-প্রাধান্য। আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, এই শক্তি-প্রাধান্য বা নারী-প্রাধান্যের ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে কৃষি-আবিষ্কারের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেই : কৃষি-কাজ মেয়েদের আবিষ্কার, কৃষি-আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ের ধ্যানধারণা তাই অনিবাৰ্যভাবেই নারীপ্রধান।
প্রথমে দেখা যাক, তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার ক্ষেত্রে নারীপ্রাধান্য সত্যিই কী রকম। স্যর্ আর্থার এ্যভেলন(৪০৪) বলছেন :
