সুব্রত দরজার কপাট দুটো ঠেলতেই সামান্য একটু ফাঁক হয়ে গেল, তালা লাগানো থাকা সত্ত্বেও। ঘরের মধ্যে অন্ধকার। কিছু দেখবার উপায় নেই। সুব্রত উপরে নিজের ঘরে গিয়ে হান্টিং টচটা নিয়ে এল। দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে আলো ফেলতে নজরে পড়ল, ঘরের মধ্যে পুরু হয়ে ধুলো জমে আছে। কিন্তু আশ্চর্য হল যখন দেখলে সেই ঘরের ধুলোর ওপরে অনেকগুলো সুস্পষ্ট পায়ের ছাপ। পায়ের ছাপ ছাড়া আর বিশেষ কিছুই সুব্রতর নজরে পড়ে না। তালাটা খোলা যায় না। ভারী মোটা জামান তালা। সুব্রত টর্চ আনবার সময়ই তালাচাবি খোলবার যন্ত্রগুলো নিয়ে এসেছিল এবং কিছুক্ষণ চেষ্টা করতেই তালাটা খুলে গেল। ছোট্ট একটা ঘর। এবং ঘরটা একেবারে খালি, কেবলমাত্র একটা গা-আলমারী দেখা যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে গা-আলমারির কপাটটা খুলে ফেলে। আলমারিটা শূন্য, তার মধ্যে কিছু নেই। কতকগুলো আরশুলা এদিক ওদিক ফরফর করে উড়ে গেল। ঘরের কোন কোণায় একটা ছুঁচো চিকচিক করে ডেকে উঠল। একটা বিশ্রী ধুলোর গন্ধ। মেঝেতে ধুলো জমে আছে। তার ওপর অসংখ্য পদচিহ্ন। কোনটা ঘরের মধ্যে এসে ঢুকেছে, কোনটা বাইরের দিকে চলে গেছে। সুব্রত টর্চের আলো ফেলে ধুলোর ওপরে পদচিহ্নগুলো দেখতে গিল। সবই একই ধরনের এবং একই আকারের পদচিহ্ন বলেই যেন মনে হয়। সুব্রত আবার ঘরের চতুষ্পর্শ্বে আলো ফেলে দেখলে—না, কিছু নেই। এ ঘরে যে দীর্ঘকাল ধরে কোন লোক বাস করে না, তাতে কোন ভুলই নেই, অথচ ঘরের মেঝের ধুলোতে পদচিহ্ন ছড়ানো। একটি মাত্র দরজা ছাড়া ঘরের মধ্যে দ্বিতীয় জানালা পর্যন্ত নেই। এই অপরিসর আলোবাতাসহীন অন্ধকার ঘরটা কিসের জন্য ব্যবহার হত তাই বা কে বলতে পারে! এবং এখন বর্তমানে কেউ না এ ঘরে বাস করলেও ঘরের মেঝেতে পদচিহ্ন।
সুব্রত হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, বেলা প্রায় এগারোটা। এখুনি হয়ত দুঃখীরাম হাট থেকে ফিরে আসবে। সুব্রত ঘর থেকে বের হয়ে তালার মুখটা কোনমতে টিপে লাগিয়ে রাখল মাত্র। সামান্য টানলেই যাতে করে খুলে যায় এবং তখনি জানাজানি হয়ে যাবে—তাতে করে মনে হয় নিশ্চয়ই তালাই ভেঙে রেখে গেছে। কিন্তু উত্তেজনার বশে তালা ভাঙার মুহূর্তে সুব্রতর একটিবারও সে কথাটা মনে হয়নি। কিন্তু এখন আর উপায়ই বা কি? সুব্রত উপরে নিজের ঘরে চলে এল। একটু পরেই সে বুঝতে পারলে দুঃখীরামের গলার স্বরে যে দুঃখীরাম হাট থেকে ফিরে এসেছে।
দ্বিপ্রহরে আহারাদির পর সুব্রত প্রাসাদের আশপাশ চারিদিক ভাল করে পরীক্ষা করে দেখবার জন্য আবার বের হয়ে পড়ল। কাছারীবাড়ির পিছনদিকে টিনের ও খোলার শেড় তোলা অনেকগুলো চালাঘরের মত; সেগুলোর মধ্যে নানা সাইজের কাঠ ও তক্তা সাজানো, বামদিকে একটি প্রশস্ত চত্বর। চত্বরের একদিকে হাতি ও ঘোড়াশালা। দুটি ঘোড়া ও তিনটি হাতি আস্তাবলে আছে—এখন মাত্র একটি ঘোড়াই রয়েছে; অন্যটিতে চেপে চৌধুরী কারখানায় গেছে। একজন মাহুত ও চারজন সহিস তারা সপরিবারেই আস্তাবলের পাশের চালাঘরে থাকে। কাছারীবাড়ির ডানদিকে একটি ফুলের বাগান।
ছোট একটা চালাঘর, সপরিবারে মালী সেখানে থাকে। পিছনদিকে কিছুদূর এগিয়ে গেলে অনুর্বর রুক্ষ মাঠ, মাঠের মধ্যে দিয়ে একটা সরু পায়ে-চলা পথ। আর দূরে দেখা যায় পাশাপাশি দুটি পাহাড়। প্রাসাদ ছেড়ে ঐ পথেই এগিয়ে গেলে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কিছু সাঁওতালদের বাস। তাদের প্রত্যেকেই প্রায় এদের কাঠের কারখানায় কাজ করে। ঘুরে ঘুরে সুব্রত অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, পিপাসাও পেয়েছে খুব; মনে হয় এক কাপ চা পেলে নেহাৎ মন্দ হত না। সূর্য আকাশের পশ্চিম প্রান্তে হেলে পড়েছে। মাঠের একপাশে একটা বাঁশঝাড়। সেই ঝোপের মধ্য হতে শ্রান্ত ঘুঘু ও হরিয়ালের একটানা কৃজনধ্বনি প্রান্তরের তপ্ত হাওয়ায় ভাসিয়ে আনে।
উদাস বিধুর চৈত্র-মধ্যাহ্নের নীল আকাশটা যেন সূর্যালোকে আরও উজ্জ্বল নীল দেখায়। ওই দূরে অনন্তনীলিমায় যেন মহাশূন্যে কালির বিন্দুর মত কয়েকটা চিল উড়ছে।
সুব্রত আবার কাছারীবাড়িতে ফিরে এল।
দুঃখীরামকে ডেকে চা আনতে বললে।
২.০৫ কে কাঁদে নিশিরাতে
ক্রমশ সন্ধ্যার অন্ধকার যেন কালো একটা ওড়না টেনে দেয় পৃথিবীর বুকে।
সুব্রত চুপচাপ একাকী তার ঘরের সামনে খোলা ছাদটার ওপরে একটা ক্যাম্বিসের ইজিচেয়ারে গা ঢেলে নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
অন্ধকারে ছাদের ওপরে নুয়ে পড়া বটবৃক্ষের পাতাগুলো ছোট ছোট হাতের মত যেন দুলে দুলে কি এক অজ্ঞাত ইশারা করছে।
আর কিছুক্ষণ পরে ক্রমে রাত্রি যখন গভীর হবে, এ বাড়ির আশেপাশে সব বিদেহী প্রেতাত্মারা ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে। তাদের দেখা যাবে না, অথচ তাদের পায়ের শব্দ শোনা যাবে। তাদের নিঃশ্বাসে বইবে মৃত্যুর হাওয়া।
জুতোর শব্দ শোনা গেল বারান্দায়, সুব্রত সজাগ হয়ে উঠে বসে। শিবনারায়ণ চৌধুরী আসছেন নিশ্চয়ই। পরক্ষণেই চৌধুরী এসে ছাদে প্রবেশ করলেন, কল্যাণবাবু আছেন নাকি?
হ্যাঁ, আসুন চৌধুরী মশাই। কখন ফিরলেন কারখানা থেকে?
এই তো কিছুক্ষণ হল ফিরে স্নানাদি করলাম। তারপর সারাটা দিন একা একা কাটাতে হল, খুব কষ্ট হয়েছে নিশ্চয়ই!
না, কষ্ট আর তেমন কি, নির্জনতা আমার ভালোই লাগে। আপনার ওদিককার কাজ কতদূর হল?
