ঘুম ভাঙল কল্যাণবাবু? রাতে বুঝি ভাল ঘুম হয়নি?
না, বেশ ঘুম হয়েছিল। অনেকটা পথ সাইকেল হাঁকিয়ে একটু বেশী পরিশ্রান্তই হয়েছিলাম কিনা। আপনার তো দেখছি স্নান পর্যন্ত হয়ে গেছে!
হ্যাঁ, দিনে আমি তিনবার স্নান করি—তা কি গ্রীষ্ম, কি শীত! আমাকে এখুনি একবার কাঠের কারখানায় যেতে হবে। কয়েক হাজার মণ কাঠের চালান আজকালের মধ্যেই যাবে, তার একটা ব্যবস্থা করতে হবে ফিরতে আমার বিকেল হবে, আজকের দিনটা আপনি বিশ্রাম নিন। কাল সকাল পর্যন্ত আমি এদিককার কাজ সেরে ফেলতে পারব, তখন কাগজপত্র দেখাব, কি বলেন?
বেশ তো। ব্যস্ততার কি এমন আছে! সুব্রত বলে।
না, তবে আপনি এলেন, একা একা থাকবেনযদি ইচ্ছে করেন, আমার সঙ্গে কারখানাতেও যেতে পারেন।
সুব্রত বুঝলে এ মস্ত সুযোগ। চৌধুরীর অবর্তমানে প্রচুর সময় পাওয়া যাবে বাড়ির চারপাশটা ভাল করে একবার দেখে নিতে। সুব্রত বলে, না, এখনও ক্লান্তিটা কাটেনি, আজকের দিনটাও বিশ্রাম নেব ভাবছি। আপনি কাজে যান চৌধুরী মশাই, ঘুমিয়েই আজকের দিনটা আমি কাটিয়ে দিতে পারব। ঘুমের আশ এখনও আমার ভাল করে মেটেনি।
বেশ, তবে আমি যাই। দুঃখীরাম ও সুখন রইল, তারাই আপনার সব দেখাশোনা করবেখন। কোন কষ্ট হবে না।
চৌধুরী ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেলেন।
সুব্রত আবার শয্যার ওপরে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে চোখ বুজল। অনেকটা সময় হাতের মুঠোর মধ্যে পাওয়া গেছে। যথাসম্ভব এর মধ্যেই একটা মোটামুটি দেখাশোনা করে নিতে হবে। পুরনো আমলের বাড়ি, তাছাড়া দুঃখীরামও অনেকদিনকার লোক। গতরাত্রে কয়েকবার সাধারণভাবে দেখে লোকটাকে নেহাৎ খারাপ বলে মনে হয়নি। মনে হয় যেন লোকটা একটু সরল প্রকৃতির ও বোকা-বেকাই।
২.০৪ পুরাতন প্রাসাদ
পুরাতন প্রাসাদ
বাবু!
কে? সুব্রত চোখ চেয়ে দেখলে দুঃখীরাম কখন একসময় ঘরে এসে প্রবেশ করেছে।
চা আনব বাবু?
চা! আচ্ছা নিয়ে এস।
দুঃখীরাম ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গেল। এবং একটু পরেই ধূমায়িত চা-ভর্তি একটি কাপ হাতে ঘরে এসে প্রবেশ করল।
দুঃখীরাম!
আজ্ঞে?
তুমি বুঝি অনেকদিন এখানে কাজ করছ?
আজ্ঞে তা প্রায় পনের-ষোল বৎসর তো হবেই—
তোমার বাড়ি কোথায় দুঃখী?
ঢাকা জিলায় বাবু।
তাহলে নিশ্চয়ই তুমি তোমাদের ছোট কুমারকে দেখেছ?
তা আর দেখিনি! আহা বড় সদাশয় লোক ছিলেন তিনি। এমন করে বেঘোরে প্রাণটা গেল! দুঃখীরামের চোখ দুটি ছলছল করে এল, প্রায়ই তো তিনি এখানে এসে এক মাস দু মাস থাকতেন। আমাদের সকলকে তিনি কি স্নেহটাই করতেন বাবু। অমন হাসিখুশি, আত্মভোলা লোক আর আমি দেখিনি। তিনিও এসে এই ঘরেই থাকতেন, বলতেন এই ঘরেই তো আমার ঠাকুরদামশাই খুন হয়েছিলেন!
হ্যাঁ, শুনেছি বটে, শ্ৰীকণ্ঠ মল্লিক মশাই এই বাড়িতেই খুন হয়েছিলেন—তা এই ঘরেই নাকি?
হ্যাঁ বাবু, শুনেছি এই ঘরেই। আমাদের সুধীনবাবুর বাবাও তো এই ঘরেই খুন হন। তিনিও লোক বড় ভাল ছিলেন বাবু।
সুব্রত স্তম্ভিত হয়ে যায়, তাহলে সেই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড পর পর দুবার এই কক্ষেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল! কি বিচিত্র ঘটনা-সংযোগ! সেও এসে এই ঘরেই আজ আস্তানা নিয়েছে। হত্যাকারীর রক্ততৃষ্ণা কি মিটেছে? না আবার সে-রক্ততৃষ্ণায় তারও প্রাণ নিতে রাত্রির অন্ধকারে আবির্ভূত হবে কোনও এক সময়! বিচিত্র একটা শিহরণ সুব্রত তার রক্তের মধ্যে অনুভব করে যেন, মনে হয় সে আসবে! নিশ্চয়ই আবার সে এই ঘরে আবির্ভূত হবে! যখন চারিদিক নিঝুম হয়ে যাবে, ঘন নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে বিশ্বচরাচর অবলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন সে আসবে এই ঘরে। আসুকতাই তো চায় সুব্রত।
সুব্রত সোজা হয়ে বসে, আজ এখানে হাটবার না দুঃখীরাম?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
মাছ পাওয়া যায় এখানে?
আজ্ঞে না, তবে মাংস পাওয়া যায়, ভাল হরিণের মাংস।
হরিণের মাংস! চমৎকার হবে, তাই নিয়ে এস। শুধু মাংসের ঝোল আর ভাত বেঁধে এবেলা। হ্যাঁ শোন, আমাকে আর এক পেয়ালা চা দিয়ে যেও।
যে আজ্ঞে বাবু।
দুঃখীরাম চলে গেল।
***
অনেকক্ষণ থেকে সুব্রত একা একা সমস্ত বাড়িটার মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়িটার বয়স অনেক হয়েছে, ভাঙন ধরেছে এর চার পাশে, অথচ সংস্কারের কোন প্রচেষ্টাই নেই, দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রথমেই সুব্রত তিনতলাটা দেখে এল। প্রকাণ্ড ছাদ, ছাদের এক কোণে পাশাপাশি নাতিপ্ৰশস্ত দুটি ঘর, কিন্তু দুটি ঘরেই দরজার বাইরে থেকে ভারী হবসের তালা লাগানো।
দোতলায় সর্বসমেত পাঁচখানা ঘর, একটি চৌধুরী ব্যবহার করেন, সেটাও বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগানো, এবং সুব্রত যেটি অধিকার করেছে সেটি ছাড়া বাকি তিনটিতে কেবল শিকল-তোলা বাইরে থেকে, কোনো তালা লাগানো নেই। সুব্রত দেখল ঘর তিনটি খালিই পড়ে আছে। দুটি ঘরেই একটি করে আলমারি ছাড়া অন্য কোন দ্বিতীয় আসবাব নেই। নীচে আটটি ঘর। সেটি দুটি মহলে বিভক্ত; অন্দর ও সদর। সদরে মহলেই কাছাড়ীবাড়ি। জন দু-তিন কর্মচারী, দারোয়ান, ভৃত্য সব সদর মহলেই থাকে। অন্দরমহলে একমাত্র পাকের ঘর ছাড়া অন্য কোন ঘর ব্যবহার হয় না। নীচের অন্দরমহলে কোণের দক্ষিণ দিকে একটি মাত্র ঘর ছাড়া বাকিগুলোতে কোন তালা দেওয়া নেই। অন্যান্য তালাবন্ধ ঘরগুলোর মত সুব্রত ঐ ঘরের তালাটা ধরেও নাড়তে গিয়ে একটু যেন বিস্মিত হল। ঐ ঘরের তালাটা বেশ পরিষ্কার, এতে প্রায়ই মানুষের হাতের ছোঁয়া পড়ে–তা দেখলে বুঝতে তেমন কষ্ট হয় না।
