কিরীটী কথা বলতে বলতে এক সময় চেয়ার হতে উঠে ঘরের মধ্যে ধীরে ধীরে পায়চারি শুরু করে দেয় এবং পায়চারি করতে করতেই পুনরায় তার বক্তব্যের মধ্যে ফিরে যায়, এবার আমাদের আসল ও কাজের কথায় আসা যাক—যে জন্য আপনাকে ডেকে এনেছি এ ঘরে। আমি যে প্রশ্নগুলো আপনাকে করব, আশা করি ভেবেচিন্তে তার যথাযথ উত্তর দেবেন।
বলুন?
প্রথমতঃ আপনার কি মনে আছে ঠিক কত রাত পর্যন্ত আপনি জেগে ছিলেন?
ঠিক কারেক্ট টাইম বলতে পারব না হয়ত, তবে মনে হয় সোয়া তিনটে পর্যন্ত বোধ হয় জেগে ছিলাম।
বেশ। আপনি আপনার গত রাত্রির জবানবন্দিতে বলেছেন, কফি পানের পরই কিছুক্ষণের মধ্যে নাকি আপনি ঘুমিয়ে পড়েন। মনে পড়ে আপনার?
হ্যাঁ, এমন ঘুম পেয়েছিল যে কিছুতেই জেগে থাকতে পারলাম না। তাছাড়া রায়বাহাদুরও ঘুমিয়ে পড়ায়–
কিরীটী আবার বলে, আচ্ছা ডাক্তারের কাছেই শুনেছিলাম, ইদানীং প্রায় কোন ঘুমের ওষুধেই নাকি রায়বাহাদুরের তেমন ভাল ঘুম আসত না এবং সেই কারণেই সমস্ত রাত ধরেই। ডাক্তারকে ও আপনাকে বলতে গেলে প্রায় তটস্থ হয়ে——মানে কখন ডাকবেন সেই জন্য। সর্বক্ষণই প্রায় সজাগ হয়ে থাকতে হত, কথাটা কি সত্যি?
হ্যাঁ। মৃদুকণ্ঠে সুলতা জবাব দেয়।
তাই যদি হবে তো অমন চট্ করে মাত্র একটা ঘুমের বড়ি খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লেন কি করে?
সুলতা চুপ করে আছে। কিরীটীর প্রশ্নের কোন জবাব দিচ্ছে না।
মুহূর্তকাল চুপ করে থেকে কিরীটী পুনরায় প্রশ্ন করে, আপনার সঙ্গে শকুনিবাবুর কতদিনকার আলাপ মিস কর?
কিরীটীর প্রশ্নে হঠাৎ যেন একটু চমকেই সুলতা তার মুখের দিকে তাকায়।
কিরীটী সেই চমকানোটুকু লক্ষ্য করেই এবারে বলে, কই, কথাটার আমার জবাব দিলেন না!
সুলতা মৃদুকণ্ঠে বলে, বছর দুই হবে।
দু বছর?
হ্যাঁ, আমার জন্ম এখানে, আমি এখানেই মানুষ। বাবা এখানকার একটা কোলিয়ারীর অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার ছিলেন।
Excuse me, শকুনিবাবুর সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কি করে হল?
রায়বাহাদুরের কোলিয়ারীর হাসপাতালে কলকাতা থেকে নার্সিং শিখে এসে প্রথম যখন বছর দুই আগে চাকরি নিই—হাসপাতালের ডাক্তারবাবু মিঃ ঘোষের বন্ধু ছিলেন, সেই সূত্রে হাসপাতালে ঐ সময় ওঁর যাতায়াত ছিল এবং সেই সময়েই আমাদের পরস্পরের আলাপ-পরিচয় হয়।
একটা কথা সুলতা দেবী, রায়বাহাদুরের এখানে আপনাকে কাজে নিযুক্ত করবার ব্যাপারে মিঃ ঘোষের কোন হাত ছিল কি?
কিরীটীর প্রশ্নটা এত পরিষ্কার যে প্রথমটায় সুলতা কিছুই জবাব দিতে পারে না। নিঃশব্দে বসে কেবল নিজের পরিধেয় শাড়ির আঁচলের পাড়টা টেনে টেনে সোজা করতে থাকে। কিরীটীও সুলতাকে দ্বিতীয় আর কোন প্রশ্ন না করে তীক্ষ্ণ সজাগ দৃষ্টিতে তার প্রতি চেয়ে থাকে।
অতঃপর কিছুক্ষণ ঐভাবেই নিস্তব্ধতার মধ্যেই কেটে যায়।
ধীরে ধীরে এক সময় সুলতা আবার মুখ তুলে বারেকের জন্য কিরীটীর প্রতি দৃষ্টিপাত করল এবং শান্ত ধীর কণ্ঠে বললে, না, আমার এখানে কাজে নিয়োগ সম্পর্কে মিঃ ঘোষের কোন তদারকের প্রয়োজন হয়নি, কারণ আমি রায়বাহাদুরের হাসপাতালেই চাকরি করছিলাম। কাজেই হাসপাতালের ডাক্তারবাবুই নার্সের প্রয়োজন হওয়ায় আমার কথা ডাঃ সানিয়ালকে বলায় এখানে আমার চাকরি হয়। বলতে গেলে হাসপাতালের ডাক্তারবাবুই আমার এখানে চাকরি করে দেন।
কিরীটী আবার কিছুক্ষণ চুপ করে বসে নিঃশব্দে ধূমপান করতে থাকে।
আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, মিঃ ঘোষই হাসপাতালের ডাক্তারবাবুকে বলে এখানে– আপনার নিয়োগ যাতে হয় সে বিষয়ে সাহায্য করেছিলেন?
কিরীটীর প্রশ্নে সুলতা কর মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে কিরীটীর মুখের দিকে তাকায়, তারপর শান্ত ধীর কণ্ঠে বললে, না, আপনার সে সন্দেহ সত্যি নয়, তাছাড়া সে রকম কোন কিছু হয়ে থাকলে আমি নিশ্চয়ই জানতে পারতাম।
মুহূর্তের জন্যই কিরীটীর চোখের তারা দুটি চকচক করে ওঠে এবং যে উদ্দেশ্যে সে একই প্রশ্ন বারংবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সুলতাকে করছিল সেটা যে কতকটা সিদ্ধ হয়েছে তাতেই তার কিছুটা আনন্দ হয়। অতঃপর কিরীটী তার দ্বিতীয় প্রশ্ন করে।
মিস কর, এবারে আপনাকে আমি আবার গত রাত্রি সম্পর্কে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।
বলুন? শান্ত স্বর সুলতার।
গতরাত্রের জবানবন্দিতে এবং আজও এই কিছুক্ষণ আগে আপনি বলেছেন, কফি পানের পরই আপনার দু চোখের পাতায় অসহ্য ঘুম নেমে আসে, আপনি কোনমতেই আর চোখ খুলে রাখতে পারেন না, আপনি ঘুমোতে বাধ্য হন।
১১. কিরীটীর প্রশ্নে কিছুক্ষণের জন্য সুলতা
কিরীটীর প্রশ্নে কিছুক্ষণের জন্য সুলতা ওর মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। কয়েকটা মুহূর্ত নিঃশব্দেই অতিবাহিত হয়।
সুলতাকে নিঃশব্দে বসে থাকতে দেখে কিরীটী আবার বলে, আপনি বোধ হয় জানেন না যে গত রাত্রে আপনাদের প্রত্যেকের জবানবন্দিই থানায় recorded হয়ে গিয়েছে! এবং, বর্তমানের এই রায়বাহাদুরের হত্যা-মামলায় আপনাদের আলাদা আলাদা ভাবে প্রত্যেকের দেওয়া জবানবন্দিই প্রত্যেকের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে evidence হিসাবেই আদালতে জেরা করা হবে!
একটু থেমে কিরীটী আবার তার অর্ধসমাপ্ত বক্তব্যের জের টেনে বলতে শুরু করে, এবং এও হয়ত বুঝতে পারছেন, ঘটনাচক্রে একমাত্র আপনিই সশরীরে অকুস্থানের সর্বাপেক্ষা কাছাকাছি ছিলেন ঠিক হত্যার সময়টিতে!
