বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গিয়েছে যেন রুচিরা।
সাবিত্রী বলতে থাকে, কিন্তু আমিও তাকে ক্ষমা করিনি। অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি। কিন্তু বাকি একজনকে এখনও খুঁজে সামনে পাইনি। সঙ্গীতপিপাসু সে, তাই গানের মুজরা নিয়ে বাগানবাড়িতে বাগানবাড়িতে গানের আসরে আসরে হানা আজও দিয়ে বেড়াচ্ছি, কারণ জানি একদিন-না একদিন তার সন্ধান পাবই। সেই দিন—বলতে বলতে সহসা মুন্না বাঈজী কোমর থেকে একটা তীক্ষ্ণ ধারাল ছুরি বের করে। ছুরির চকচকে অগ্রভাগটা যেন জিঘাংসায় হিলহিল করে ওঠে।
রুচিরা চমকে উঠে দু পা পিছিয়ে যায়।
সাবিত্রী খিলখিল করে হেসে ওঠে এবং হাসতে হাসতেই আবার ছুরিটা কোমরে গুঁজে রাখতে রাখতে বলে, ভয় পেলি রুচি? সম্মানের সঙ্গে গৃহের আব্রু নিয়ে নারীর মর্যাদায় তোরা
প্রতিষ্ঠিত; অপমানিত লাঞ্ছিত নারীত্বের মর্মন্তুদ জ্বালা যে কী—কেমন করে তারা বুঝবি ভাই! কি যন্ত্রণায় তারা নিশিদিন ছটফট করে মাথা খুঁড়ে মরে কেমন করে তোরা বুঝবি!
সাবিত্রীর দু চোখের কোণ বেয়ে অশ্রুর ধারা নেমে আসে।
আর নির্বাক বিস্ময়ে সেই দিকে তাকিয়ে বসে থাকে রুচিরা যেন পাথরের মত।
০৯. ডাঃ সানিয়ালের ঘরে
কিরীটী ডাঃ সানিয়ালের ঘরে আবার ফিরে এল।
ডাঃ সমর সেনই প্রথমে কথা বলেন, এই যে মিঃ রায়, এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? দালাল সাহেব চলে গেলেন যে আপনার জন্যে অপেক্ষা করে করে!
কখন আসবেন কিছু বলে গেছেন? কিরীটী প্রশ্ন করে!
হ্যাঁ, বিকেলের দিকে আবার আসবেন বলে গেলেন। কিন্তু আমি তো আর দেরি করতে পারছি না মিঃ রায়। আজ আবার আমার একটা অপারেশন আছে। জবাব দিলেন ডাঃ সেন।
কিরীটী যেন আপন মনে কি ভাবছিল। ডাঃ সমর সেনের প্রশ্নে ওঁর মুখের দিকে চেয়ে বলে, কি বললেন ডাঃ সেন?
আমার একটা অপারেশন ছিল! ডাঃ সেন আবার কথাটা পুনরাবৃত্তি করলেন।
নিশ্চয়ই। আপনি যাবেন বৈকি। আপাততঃ আপনাকে আর আমাদের প্রয়োজন নেই।
ডাঃ সেন বলেন, কিন্তু দালাল সাহেব যে বলে গেলেন তিনি না ফিরে আসা পর্যন্ত আমাকে অপেক্ষা করতে!
না, তার আপাততঃ কোন প্রয়োজন নেই। তবে যাবার আগে আমার যে কয়েকটা কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করবার ছিল ডাঃ সেন।
কিরীটীর শেষের কথায় যেন একটু বিস্ময়ের সঙ্গেই ডাঃ সমর সেন তার মুখের দিকে তাকান।
কিরীটী মৃদু হেসে বলে, কথাটা অবিশ্যি একটু ব্যক্তিগত।
কি রকম?
আপনি এই বাড়িতে কি কাল রাত্রেই সর্বপ্রথম এলেন–না আগেও এ বাড়িতে দু-একবার এসেছেন?
না, কাল রাত্রেই সর্বপ্রথম এ বাড়িতে আমি পা দিয়েছি।
ও। তাহলে এ বাড়ির কাউকেই আপনি পূর্বে চিনতেন না?
ডাঃ সেন যেন এবারে একটু চমকেই কিরীটীর মুখের দিকে তাকান। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই আমার কথাটা?
আমি—মানে—
বলুন, লজ্জা বা দ্বিধার এতে কিছু নেই।
না, তা ঠিক নয়। রুচিরার সঙ্গে আমার আলাপ ছিল। তবে—
জানতেন না বোধ হয় কালকের রাতে এখানে এসে তাকে দেখার আগে পর্যন্ত যে সে এ বাড়িরই একজন। তাই কি?
হ্যাঁ। বছর দুয়েক আগে কলকাতায় থাকবার সময়ই আলোছায়া সঙ্ঘের একটা চ্যারিটি থিয়েটার পারফরমেন্সের সময় রুচিরার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয়।
তারপর?
তারপর অবিশ্যি একটু ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল।
হুঁ। এখন বুঝতে পারছি—
কি, মিঃ রায়?
কিরীটী মৃদু হেসে বলে, না, বিশেষ কিছু নয়। তারপর একটু থেমে কিরীটী আবার প্রশ্ন করে, আপনি কি কখনও শোনেননি রুচিরা দেবীর মুখে, সমীরবাবুর সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথাবার্তা, চলেছে?
না।
আশ্চর্য!
কি বললেন মিঃ রায়?
কিছু না। রুচিরা দেবীর সঙ্গে কতদিন আগে আপনার শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল?
দিন পনের আগেও কলকাতায় দেখা হয়েছে। মধ্যে মধ্যে আমি কলকাতায় যাই তো, তখন দেখা হয়।
ক্ষমা করবেন, আর একটা কথা।
বলুন!
আপনি তো অবিবাহিত, তাই না?
হ্যাঁ।
বিয়ে সম্পর্কে কিছু ভেবেছেন?
না।
কেন?
সত্যি বলব? মৃদু জবাব দেন ডাঃ সেন।
বলুন না।
এখনও জবাব পাইনি।
সে কি! এখনও জবাব পাননি?
না।
তাহলে আমি বলব মা ভৈষী। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ডাঃ সেন।
কি বলছেন আপনি মিঃ রায়!
পরে বুঝতে পারবেন। আচ্ছা এবারে তাহলে আপনি যেতে পারেন।
কিন্তু ডাঃ সেন একটু ইতস্ততঃ করতে থাকেন তবু।
তখন কিরীটী বলে, যা বলবার তাঁকে আমিই বলবখন। আপনি যান।
ডাঃ সমর সেন উঠে দাঁড়ালেন বোধ হয় ঘর ত্যাগ করবার জন্যই। ডাঃ সানিয়াল ইতিমধ্যে আবার কিরীটীর জন্য এক কাপ চা তৈরী করে চামচের সাহায্যে চিনিটা গুলছিলেন। এবার তাঁর দিকে চেয়ে কিরীটী বলে, আচ্ছা ডাঃ সানিয়াল, রায়বাহাদুরের যে attending nurse সুলতা কর, তার সম্পর্কে আপনার ঠিক কি ধারণা বলুন তো?
ডাঃ সমর সেন ঘর হতে বের হয়ে গেলেন।
চায়ের কাপটা কিরীটীর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে ডাঃ সানিয়াল বলেন, আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না মিঃ রায়।
ডাক্তারের হাত হতে চায়ের কাপটা নিয়ে, চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে একটা আরামসূচক শব্দ করে স্থিরভাবে কিরীটী বলে, বুঝতে পারলেন না?
না।
মানে এই বলছিলাম আর কি, নিজের ডিউটি সম্পর্কে তার সততাকে বিশ্বাস করা যায় কিনা। আপনি তো অনেকদিন থেকেই সুলতা করকে দেখছেন এ বাড়িতে।
তা তাকে বিশ্বাস করা যায় বৈকি। ডিউটির ব্যাপারে কখনও তার কোন গাফিলতি বড় একটা দেখিনি।
বলেন কি! আমার তো মনে হল বরং ঠিক তার উল্টো। নার্স হবার আদৌ উপযুক্ত নন তিনি। She has rather chosen the wrong profession!
