আমরা যারা রাজবন্দি তারা আধ ঘণ্টা থেকে একঘণ্টা সময় পাই। পাশাপাশি বসে আইবি অফিসারদের শুনিয়ে কথা বলে থাকি। দুঃখ হয় যখন বৃদ্ধা মা-বাবা, স্ত্রী এবং ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা বিদায় নেয়, কেহ বা কাঁদতে কাঁদতে, কেহ বা মুখ কালো করে।
৬. এ খাতাটি ১৯৬৭ সালে লেখা
[এ খাতাটি ১৯৬৭ সালে লেখা। ১৯৬৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দি। তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা দায়ের করেছে আইয়ুব-মোনায়েম সরকার। একটি ছোট্ট বাঁধানো খাতা। ২৪০ পৃষ্ঠার। তাঁর কারাগারের জীবনযাপন, ব্যক্তিগত ভাবনা, পারিবারিক কথা ছাড়াও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে অনেক কথাই এ খাতায় লিখেছেন।]
১লা জানুয়ারি–২০শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৭
শরীরটা খারাপ নিয়ে নতুন বৎসর শুরু। চোখের অসুখে ভুগছিলাম, এখন একটু আরামের দিকে। পায়ে একটা ফোড়া হয়েছিল। এখন এটা কারবানক্যল হয়ে গেছে। ৬/৭ তারিখে জেলগেটে মামলা হবে। হাঁটতে পারি না, তবুও যেতে হবে। কারণ ডাক্তার সাহেব ও সিভিল সার্জন সাহস পায় না আমাকে অসুস্থ ঘোষণা করতে। যদি সরকার রাগ হয়, বদলি করে দেয়। বললাম, স্ট্রেচার নিয়ে আসুন, যাবো। স্ট্রেচার প্রস্তুত, হাকিম শুনে তো অস্থির। স্ট্রেচারে এনে মামলা করলে হৈ চৈ হয়ে যাবে। তাই হাকিম সাহেব আমার এডভোকেট সালাম সাহেবের সাথে পরামর্শ করে মামলার শুনানি বন্ধ করে দিলেন। আমাকে আর গেটে নেওয়া হলো না। কারবানক্যল সারতে বেশ কয়েকদিন লাগল। ৭/৮ দিন প্রায় শুয়েই কাটালাম।
১১ তারিখে রেণু এসেছে ছেলেমেয়ে নিয়ে দেখা করতে। আগামী ১৩ই ঈদের নামাজ। ছেলেমেয়েরা ঈদের কাপড় নিবে না। ঈদ করবে না, কারণ আমি জেলে। ওদের বললাম, তোমরা ঈদ উদ্যাপন কর।
এই ঈদটা আমি ছেলেমেয়ে নিয়ে আমার আব্বা ও মায়ের কাছে বাড়িতেই করে থাকি। ছোট ভাই খুলনা থেকে এসেছিল আমাকে নিয়ে বাড়ি যাবে। কারণ কারও কাছে শুনেছিল ঈদের পূর্বেই আমাকে ছেড়ে দিবে। ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি নাই। ওরা বুঝতে শিখেছে। রাসেল ছোট্ট তাই এখনও বুঝতে শিখে নাই। শরীর ভাল না, কিছুদিন ভুগেছে। দেখা করতে এলে রাসেল আমাকে মাঝে মাঝে ছাড়তে চায় না। ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে কষ্ট হয়। আমিও বেশি আলাপ করতে পারলাম না শুধু বললাম, “চিন্তা করিও না। জীবনে বহু ঈদ এই কারাগারে আমাকে কাটাতে হয়েছে, আরও কত কাটাতে হয় ঠিক কি! তবে কোনো আঘাতেই আমাকে বাঁকাতে পারবে না। খোদা সহায় আছে। ওদের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় রেণুকে বললাম, বাচ্চাদের সবকিছু কিনে দিও। ভাল করে ঈদ করিও, না হলে ওদের মন ছোট হয়ে যাবে।
রাত্র ১০টায় হৈ চৈ, আগামীকাল ঈদ হবে।
১২ই সকালবেলা জেলের মধ্যে ঈদ হবে, কারণ সরকারের হুকুম। অনেক সিপাহি ও জেল কর্মচারী রোজা ভাঙতে রাজি হয় নাই। তবে কয়েদিদের নামাজ পড়তেই হবে, ঈদ করতেই হবে। শুনলাম পশ্চিম পাকিস্তানে সরকারি লোক চাঁদ দেখেছে। পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নতি হলে পূর্ব বাংলার উন্নতি হয়! হাজার মাইল দূরে পশ্চিম পাকিস্তানে চাঁদ দেখেছে, এখানে নামাজ পড়তেই হবে। আমাদের আবার নামাজ কি! তবুও নামাজে গেলাম, কারণ সহকর্মীদের সাথে দেখা হবে। এক জেলে থেকেও আমার নিজের দলের নেতা ও কর্মীদের সাথে দেখা করার উপায় নাই। আমি এক পার্শ্বে আর অন্যান্যরা অন্য পার্শ্বে। রাজনৈতিক বন্দিদের বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা করে রাখা হয়।
২ নম্বর ব্লকে শ্রমিক কর্মীদেরই বেশি রাখা হয়েছে। নামাজের আগে রুহুল আমিন, সহিদ (তেজগাঁও), আদমজীর সফি আরও অনেকে ছুটে এল আমার কাছে। শাহজাহানপুরে আমার সহকর্মী আবদুল কাদের ব্যাপারীর ছেলেকেও ধরে এনেছে। তার নাম সিদ্দিক। প্রেসে নাকি কি কাগজ ছাপাইয়াছে। ন্যাপের হালিম, ভাগ্নে মণি পুরানা হাজত থেকে তারা এসেছে। এক জেলে থাকি আমার ভাগ্নে আমার সাথে দেখা করতে পারে না। কি বিচার।
১০ সেল থেকে শামসুল হক, মিজানুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মোমিন, ওবায়দুর রহমান, মোল্লা জালাল, মহীউদ্দিন (খোকা), সিরাজ, হারুন, সুলতান এসেছে। দেখা হয়ে গেল, কিছু সময় আলাপও হলো। এরা সকলেই আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মী। রফিকুল ইসলাম, বজলুর রহমান ও শাহ মোয়াজ্জেম নামাজে আসে নাই।
আমার কাছাকাছিই থাকে ছাত্রলীগ কর্মী নূরে আলম সিদ্দিকী ও খুলনার কামরুজ্জামান, ছাত্র ইউনিয়নের রাশেদ খান মেনন এবং আওয়ামী লীগের নূরুল ইসলাম। বাবু চিত্তরঞ্জন সুতারও আছেন। আমার পায়ে ব্যথা, তাই বসে বসেই মিললাম সকলের সাথে। কারাগার থেকেই দেশবাসী ও সহকর্মীদের জানাই ঈদ মোবারক। পূর্ব বাংলার লোক সেইদিনই ঈদের আনন্দ ভোগ করতে পারবে, যেদিন তারা দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবে, এবং দেশের সত্যিকারের নাগরিক হতে পারবে।
নামাজ আমাদের আজই পড়তে হয়েছে। বাড়ির থেকে খাওয়া-দাওয়া কিছুই আসে নাই। কারণ বাইরের লোক তো আমাদের মত বন্দি না, তারা ১৩ তারিখেই ঈদ করবে। ১৩ তারিখেই শতকরা ৯০ জন লোক ঈদ করেছে। কিন্তু কারাগারে খাওয়ার বন্দোবস্তও ১২ তারিখেই হয়েছে।
আজ ১৩ তারিখ খবর পেলাম ঢাকায়ও আজ নামাজ হয়েছে। অনেকেই নামাজ পড়েছে। জেল কর্মচারীরা আজই দেখা করতে এসেছে। তাদের কথা হলো চাকরি করে বলে নামাজও সরকারের ইচ্ছায় পড়বে নাকি?
আজ ১০ সেল থেকে খাবার এসেছে আমাদের জন্য, ২৬ সেলের নিরাপত্তা বন্দিরাও পাঠাইয়াছেন। আমার তো কিছু করার উপায় নাই, একলা মানুষ, এক জায়গায় থাকি। রোজ পাঁচ টাকা দেয়, ৪/৫ জন লোক নিয়ে খেতে হয়, টাকা বাঁচাব কি করে? তাই কিছুই করি নাই। দেখি ১১টার সময় বেগম সাহেবা খাবার পাঠাইয়াছে। কিছু কিছু অন্যান্য জায়গায় পাঠাইলাম। যার যা ছিল পুরানা ২০ সেলের রাজবন্দিদের নিয়ে আজ এক জায়গায় বসে খাব, বলে দিলাম। আইন আজ আর মানি না। তাই সকলকে নিয়ে আমার জেলখানার ঘরে বিছানা পেতে এক সাথে খেলাম। যে ৬০/৭০ জন কয়েদি সেল এলাকায় ছিল তাদেরও কিছু কিছু দিলাম। পান সিগারেট আনাইয়া রেখেছিলাম। কয়েদিরা আমার সাথে যারা দেখা করতে এসেছিল তাদেরও দিলাম। ৪০ সেলের পাগল ভাইদের কিছুই দিতে পারলাম না, সংখ্যায় তারা প্রায় ৭০ জন। সরকার টাকা আনতে দেয় না রাজবন্দিদের। ফল ফলাদিও বন্ধ। তবুও ঠিক করেছি ওদের কিছু আনাইয়া খাওয়াতে হবে। কয়েদিদের ‘পোলাও দিয়েছিল। মুখে দিয়ে দেখলাম পোলাও না, একটু ভাল করে রান্না ভাত। অনেক দিন ধরে কয়েদির খাবার খরচের থেকে টাকা বাঁচাইয়া একদিন ভাল খাওয়াবে। কি আর বলব, চোরের টাকা চুরি করে খায় আজকাল আমাদের মেসের কিছু কিছু কর্মচারী। পূর্বেও জেলে ছিলাম একটা চক্ষুলজ্জা ছিল, এখন তার বালাই নাই। লুট চলেছে, কেউই দেখার নাই। এক কয়েদি আমাকে বলল, “দেখুন স্যার আমরা চোর, পেটের দায়ে চুরি করে জেলে এসেছি, আর আমাদের খাবার থেকে চুরি করে খেয়ে কেমন মোটা হয়েছে জেলের কিছু কর্মচারী।” আমি বললাম, “সকলে তো চুরি করে না। সে বলল, “যার হাতে আছে সেই চুরি করে খায়।” আমার বুঝতে বাকি রইল না কাকে বলছে।
