ঘরে চলে এলাম, জমাদার সিপাহি মেট পাহারা হৈ চৈ লাগাইয়া দিয়েছে। বড় সাহেব আসবে ডিগ্রি এলাকায়। আমাদের দেখতে আসেন, কিছু বলার থাকলে তিনি শোনেন। প্রায় দশটার সময় সদলবলে আসলেন আমার ঘরে, বসলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছি? খুব ভাল আছি। আমার কিছু বলার নাই। ঠিক করেছি কোনো কিছুই বলব না। একলাই জেল খেটে যাবো। যতদিন রাখতে হয় রাখুক, কিছুই আসে যায় না। জীবনে একলাই জেল খেটেছি অনেক দিন।
তিনি চলে গেলেন। আবার বই নিয়ে বসলাম।
দুপুরে কাগজ এলে দেখলাম সংবাদপত্র সম্পাদক পরিষদ, নিখিল পাক সংবাদপত্র সমিতি ও ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি সমবায়ে গঠিত যুক্ত কমিটি অদ্য দৈনিক ইত্তেফাকের বিরুদ্ধে গৃহীত সরকারি ব্যবস্থার প্রতিবাদে আগামী ৫ই জুলাই একদিন প্রতীকী ধর্মঘট পালনের জন্য সংবাদপত্র শিল্প ও সংবাদ সরবরাহ সংস্থাসমূহের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছেন। ৫ই জুলাই সান্ধ্য পত্রিকা ও ৬ই জুলাই কোনো প্রভাতি পত্রিকা যাহাতে প্রকাশিত হতে না পারে সেই জন্য অনুরোধ জানাইয়াছেন। সমন্বয় কমিটির সদস্যবৃন্দ ইত্তেফাক সম্পাদক জনাব তফাজ্জল হোসেনের গ্রেপ্তার ও তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপন করেন।
নিশ্চয় এটা একটা শুভ সূচনা। কারণ আজ ইত্তেফাক ও ইত্তেফাক সম্পাদকের বিরুদ্ধে হামলা, কাল আবার অন্য কাগজ ও তার মালিকের উপর সরকার হামলা করবে না কে বলতে পারে! সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে তো কিছুই নাই, এখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা শুরু করেছে। পাকিস্তানকে শাসকগোষ্ঠী কোন পথে নিয়ে চলেছে ভাবতেও ভয় হয়! আজ দলমত নির্বিশেষে সকলের এই জঘন্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান উচিত।
আজ জুন মাস শেষ হয়ে গেল।
৩.১ ১লা জুলাই-১০ই জুলাই ১৯৬৬
ভোরবেলায় খবর পেলাম গত সন্ধ্যায় ১০ সেলে যেখানে মানিক ভাই, শামসুল হক, রফিক, মিজান, মোমিন, ওবায়েদ, হাফেজ মুছা সাহেব, সুলতান, হারুন রশিদ এবং বোধহয় রাশেদ মোশাররফ ও অনেককে রাখা হয়েছে সেখানে গোলমাল হয়েছে তালাবন্ধ করার সময়। মানিক ভাই যেখানে আছেন কোনো গোলমাল সেখানে হতে পারে না, কারণ আমাদের কেহই তাঁর সামনে কোনো অন্যায় করতে যাবে না। সঠিক খবর কিছুই পাই নাই। সিপাহিদের মধ্যে আলোচনা হতেছে। কেহ কেহ বলে ১০ সেলের সাহেবদের কোনো দোষ নাই। আর কেউ বলে, সিপাহিদের সাথে গোলমাল শোভা পায় না নেতাদের। তারা হলো দেশের নেতা, দেশের জন্য জেল খাটছে। সিপাহি যদি বেশি কথা বলেও, তবুও চুপ করে থাকা উচিত।
প্রায় ১০ ঘটিকার সময় খবর পেলাম মিজানুর রহমানের ঘর যখন বন্ধ করতে গিয়াছে তখন মতিউল্লা নামে এক পুরানা সিপাহি তালাবন্ধ করে খটখট শব্দ করতে শুরু করে। টেনে দেখে, তালা ঠিক মতো বন্ধ হয়েছে কিনা। তাতে মিজান নাকি বলেছে, ডিউটি সিপাহিকে বলে দিবেন রাতে যেন আস্তে আস্তে তালা টেনে দেখে, কারণ আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত হয়। দু’ঘণ্টা পর পর রাত্রে পাহারা বদলি হয়। সিপাহি বলেছে জোরে জোরেই টানতে হয়। মিজানের তালাবন্ধ হয়ে গিয়াছে। বাইরে মোমিন সাহেব জিজ্ঞাসা করেছেন বাড়ি কোথায় আপনার’? মোমিন সাহেবের রুম তখনও বন্ধ হয় নাই। এক দুই কথায় খুব ঝগড়া হয়েছে। আমাদের এরা নাকি সিপাহিদের মারতে যায়। মতিউল্লা এসে জেল কর্তৃপক্ষকে কিছু কিছু বাড়াইয়া বলে। আমাদের এরাও ডিআইজির কাছে দরখাস্ত করার জন্য কাগজ চেয়ে পাঠাইয়াছে। মহা গোলমাল! আমি সিকিউরিটি জমাদারকে ডেকে মানিক ভাইয়ের কাছে খবর পাঠাইয়া দিলাম এ নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি না করাই উচিত। ভদ্রলোকের কিল খেয়ে কিল হজম করতে হয়। সিপাহিদের মধ্যে শতকরা ৯০ জন লোকই আমাদের ভক্তি করে, আমাদের প্রতি সহানুভূতি আছে। আমার বিশ্বাস ছিল, মানিক ভাই যখন আছেন এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি হবে না। বিকালে খবর পেলাম চুপচাপই আছে আমাদের এরা। সিপাহিদের সাথে কোনো কথা নিয়ে আলোচনা করা উচিত না। ওরা হুকুম পায়, তামিল করে। আমাদের কিছু বলতে হলে, জেলার সাহেব, ডিপুটি জেলার বা ডিআইজি সাহেবকে বলাই উচিত। এদের সাথে কথা কাটাকাটি করা মোটেই উচিত হয় নাই।
আমাদের মধ্যে এরা অনেকেই নতুন জেলে এসেছে। আমার কাছে রাখলে কোনো কথাই হতো না, কিন্তু সরকার রাখবে না আমার কাছে কাহাকেও। যদি জেলের ভিতর কোনো বিপ্লব করে বসি!
বিকালে মতিউল্লাকে ডেকে আমি বলে দিলাম, মনে কিছু না করতে। কারণ একে আমি জানি বহুদিন থেকে। একটু কথা বেশি বলে, মনটা খারাপ না।
আজ বৃষ্টি না হওয়াতে একটু ভালই লেগেছে। হাঁটাহাঁটি করে শরীরটাকে হালকা করতে চেষ্টা করেছি। রেণুর শরীর খারাপ। আমায় দেখতে আসতে পারে নাই। মনটা খারাপ লাগছিল।
পুরানা ২০ সেলের পাঁচ নম্বর ব্লকে চিত্ত সুতার ও রণেশ মৈত্র থাকেন। তাদের বাইরের দরজা বন্ধ করে রাখা হয়-যদি আমার সাথে দেখা হয়ে যায়! সর্বনাশ, দেখা হলে দেশটা ধ্বংস হয়ে যাবে যে! দরজাটা খুলেছে খাবার দিতে, তারাও দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। দেখা হলো, দুই একটা কথাও হলো দূর থেকে কেমন আছেন? ভাল আছি। দরজা বন্ধ করতে হবে কারণ সিপাহির চাকরি থাকবে না, যদি বড় সাহেবরা আমাদের কথা বলতে দেখে।
মোস্তফা সরোয়ারের ভাই গ্রেপ্তার হয়ে এসেছিল নারায়ণগঞ্জ মামলায়। সে পরীক্ষার্থী, বিএ পরীক্ষা দু’টা দিয়েছিল। আবার চার তারিখে পরীক্ষা। ওর নাম হাসু। আমি হাসু বলেই ডাকি। হঠাৎ খবর এল জামিন হয়ে গেছে, এখনি যাবে। আমার সামনে দিয়েই যেতে হবে। দাঁড়িয়ে রইলাম। সে এসে গেল। বললাম, মন দিয়ে পড়ে পরীক্ষা দিয়ে। তোমার ভাবীকে খবর দিও ইনকাম ট্যাক্স নোটিশের উত্তর আমার সাথে দেখা না করে যেন না দেয়। টেলিফোন করে দিও। আরও দুইটা ছেলে পরীক্ষার্থী পড়ে রইল। একজন পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পেয়েছে-নাম খাজা মহীউদ্দিন। আর একজন অনুমতি না পেয়ে খুবই মুষড়ে পড়েছে। কি করব? মনুষ্যত্ব যাদের মধ্যে নাই তাদের সম্বন্ধে কি লিখব?
