রাত কেটে গেল। এমনি অনেক রাত কেটে গেছে আমার। প্রায় ছয় বৎসর জেলে কাটিয়েছি। বোধ হয় দুই হাজার রাতের কম হবে না, বেশি হতে পারে। আরও কত রাত কাটবে কে জানে? বোধ হয় আমাদের জীবনের সামনের রাতগুলি সরকার ও আইবি ডিপার্টমেন্টের হাতে।
১৯শে জুন ১৯৬৬ ॥ রবিবার
ঘরটা তো আমাদের এক মাত্র জায়গা-যা একটু বাহিরে হাঁটাহাঁটি করতাম তাও বন্ধ। বৃষ্টি চলছে সমানে। বারান্দা দিয়ে হাঁটতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু বারান্দাটা ভিজে গিয়েছে। পায়খানায় যাওয়ার উপায় নাই। পানি পড়ে সমস্ত শরীরটা ভিজে যাবে। ছাতাও নাই। চা প্রস্তুত হয়ে গেছে, খেয়ে নিয়ে ঘরের ভিতরই ঘুরতে আরম্ভ করলাম। প্রায় ৯টায় বৃষ্টি থামলে আমি বের হয়ে পড়লাম। দেখলাম বরিশালের বাবু চিত্তরঞ্জন সুতারও দাঁড়াইয়া আছেন তাঁর সেলের দরজার কাছে। বুঝলাম তার অবস্থাও আমার মতো। আমার ঘরের একটা সামান্য বারান্দা আছে। কিন্তু তাঁর সেলে তাও নাই। বৃষ্টি থেমেছে, তাই বের হয়ে পড়েছে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে। তাহাকেও আলাদা করে রাখার হুকুম দিয়েছে। বরিশাল জেলে ছিলেন। মাসে অন্ততপক্ষে স্ত্রী ও ছেলের সাথে দেখা হতো। তা আর হবে না। কষ্ট দেও, যত পার। আমাদের আপত্তি নাই। আমরা নীরবে সবই সহ্য করব ভবিষ্যৎ বংশধরদের আজাদীর জন্য। আমাদের যৌবনের উন্মাদনার দিনগুলি তো কারাগারেই কাটিয়ে দিলাম। আধা বয়স পার হয়ে গেছে।
আর চিন্তা কি? এই নিষ্ঠুর ব্যবহারের বিচার একদিন হবেই। দেখেও যেতে পারি, আর না দেখেও যেতে পারি। তবে বিশ্বাস আছে, হবেই।
আবার বৃষ্টি। তাড়াতাড়ি পাকের ঘরে উপস্থিত হলাম। দেখি কি পাক করছে?’ বাবুর্চি বলল, ‘পটল ভাজি করছি, পেঁপেও পাক করব। মাছ এখনও আসে নাই। কিছু সময় দাঁড়াতে হলো। দেখলাম কিভাবে পাক করবে। পানি পড়ে ঘর দিয়ে। আধা ঘর ভিজে গিয়েছে। একটু পরে আমি জমাদার সাহেবকে বললাম খবর দিতে। এভাবে চলতে পারে না।
কম্পাউন্ডার সাহেব এলেন আমার এখানে ইনজেকশন দিতে। বললাম ‘বসেন, কেমন আছেন?’ বলল, ‘কেমন থাকব। স্বল্প বেতনের কর্মচারী, জীবনটা কোনোমতে কাটাইয়া নিয়ে যাচ্ছি।’ তার কাজ শেষ করে তিনি চলে গেলেন।
আমি বই নিয়ে বসে পড়লাম। মনে করবেন না বই নিয়ে বসলেই লেখাপড়া করি। মাঝে মাঝে বইয়ের দিকে চেয়ে থাকি সত্য, মনে হবে কত মনোযোগ সহকারে পড়ছি। বোধ হয় সেই মুহূর্তে আমার মন কোথাও কোনো অজানা অচেনা দেশে চলে গিয়েছে। নতুবা কোনো আপনজনের কথা মনে পড়েছে। নতুবা যার সাথে মনের মিল আছে, একজন আর একজনকে পছন্দ করি, তবুও দূরে থাকতে হয়, তার কথাও চিন্তা করে চলেছি। হয়ত বা দেশের অবস্থা, রাজনীতির অবস্থা, সহকর্মীদের উপর নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে ভাবতে ভাবতে চক্ষু দু’টি আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে। বই রেখে আবার পাইপ ধরালাম।
সাড়ে এগারটায় জেলের কয়েদিদের খাবার সময় হয়ে যায়। এরা গোসল করে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। বালতিতে ডাল, টিনের বড় এক পাত্রে ভাত আর একটি বালতিতে তরকারি। কয়েদিরা দফায় দফায় এসে বিলাইয়া যায়। ভাত নিয়ে যে যেখানে পারে বসে খেয়ে নেয়। মেশিনের মতো চলে। আমার কিন্তু একটার পূর্বে খাওয়া অসম্ভব। তাই সাড়ে বারটা বা ১টায় গোসল করতে যাই। আজ বহুক্ষণ ভাবলাম গোসল করব কিনা। মেট বলল, না করলে শরীর খারাপ হবে। বসে পড়তে পড়তে পিঠে একটা ব্যথা হয়েছে। খুব তেল মালিশ করে গোসল করে এলাম। খাবার পরেই কাগজ এসে হাজির।
ব্যাপার কি! ভুট্টো সাহেব নাই! বিতাড়িত। ছুটি চেয়েছেন, পেয়েছেনও। সসম্মানে তাড়াইয়া দেওয়ার একটা ফন্দি। আমেরিকার ধাক্কা আইয়ুব সাহেব সামলাইবেন কেমন করে! শোয়েব সাহেবের দৌলতে তিনি যে অর্থনীতি কায়েম করতে চলেছেন তাহাতে আমেরিকা ছাড়া আর কে সাহায্য করতে পারে! আমেরিকা যেখানে সাহায্য দিতে চায় সেখানে অধীনস্ত না করে অর্থ সাহায্য দেয় না। পণ্ডিত জওহরলালের মতো ত্যাগী, কর্মঠ, শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রীও কৃষ্ণ মেননের মতো বৈদেশিক মন্ত্রীকে আমেরিকার চাপে সরায়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর আমাদের আইয়ুব সাহেব যাদের বদৌলতে ক্ষমতায় বসেছেন, যাদের দৌলতে ক্ষমতায় টিকে আছেন, কেমন করে সেই মুরব্বীদের বেজার করবেন? ভাই ভুট্টো আমার কথাগুলি মনে করে দেখবেন নিশ্চয়ই। যখন হঠাৎ আমার সাথে মোলাকাত হয়ে গিয়াছিল তখন তাকে বলেছিলাম, বেশি দিন আর বাকি নাই, আপনারও দিন ফুরাইয়া এসেছে। ডিকটেটরের ধর্ম নাই। সে শুধু নিজকে চেনে এবং নিজের স্বার্থে আঘাত লাগলে কাহাকেও ছাড়ে না। আমেরিকানরা যে আইয়ুব সাহেবকে ছাড়তে পারে না তাহাও আমার বুঝতে বাকি নাই। এমন নেতা আমেরিকা চায় যারা জনগণের সাথে সম্বন্ধ রাখে না। আইয়ুব সাহেব বিবৃতি দিয়েছেন, বৈদেশিক নীতি পূর্বের মতো চলবে। এর কোনো পরিবর্তন হবে না। আমরা জানি যে, কোনোদিন পরিবর্তন করতে পারবেন না।
শনিবার রাতে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যকরী পরিষদের সভায় দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক ঢাকা টাইমস ও সাপ্তাহিক পূর্বাণীর মুদ্রণালয়, নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্তকরণ, সংবাদপত্রের উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা, দেশরক্ষা আইনে জনাব তফাজ্জল হোসেন, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেনসহ অন্যান্য সাংবাদিক গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আগামী সোমবার একদিন প্রতীক ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
