আমি কিছুতেই ওঁকে প্রণাম করতে দিই না, সেন্টার টেবিলের অন্যদিকে চলে যাই। রাষ্ট্রপতি আবার আমাকে ধরার চেষ্টা করেন, আমি আবার ঘুরে যাই।
বেশ কয়েক মিনিট ধরে চেষ্টা করার পর ব্যর্থ হয়ে রাজেন্দ্রপ্রসাদ দুহাত জোড় করে মাথা নীচু করে আমাকে নমস্কার করলেন। তারপর আমার হাত ধরে আগে সোফায় বসিয়ে উনি আমার পাশে বসলেন।
ব্রাহ্মণ হলেই তাকে প্রণাম করতে হবে, আধুনিক কালের মানুষ তা মনে করে না। আমিও করি না। এর মধ্যে কোন যুক্তিও দেখতে পাই না। বোধ হয় শুধুই সংস্কার। রাষ্ট্রপতির মধ্যে এ ধরণের সংস্কার না থাকাই কাম্য কিন্তু ভারতবর্ষের প্রথম নাগরিকের এই বিনয় দেখে আমি বিমুগ্ধ না হয়ে পারিনি। বিদ্যা দদাতি বিনয় আজ বোধ হয় আর সত্য নয়। আধুনিক সভ্যতার প্রথম বলিদান বোধ হয় বিনয়। অতি সাধারণ গরীব-দুঃখী মানুষ বিনয়ী হয় কিন্তু শিক্ষিত ও ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের মধ্যে বিনম্রভাব সত্যি দুর্লভ। কলকাতা কর্পোরেশনের কোন কাউন্সিলারের মধ্যে যে বিনম্রভাব দেখিনি এবং আশাও করিনি, তা স্বয়ং রাষ্ট্রপতির মধ্যে দেখে সত্যি ওঁর প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মন ভরে গেল।
পরে মিঃ হাণ্ডাকে এই ঘটনার কথা বলতে উনি হেসে বললেন, আওয়ার প্রেসিডেন্ট ইজ লাইক দ্যাট। উনি শুধু ব্রাহ্মণকেই প্রণাম করেন না, উনি সমস্ত প্রবীণদের, গ্রামের স্কুলের পুরনো মাস্টারমশাই ও মৌলানা সাহেবদের ছাড়াও পীর সাহেবদের প্রণাম করেন।
হাণ্ডা সাহেব একটু থেমে বললেন, ডোন্ট ফরগেট সংস্কৃত ও আরবী ভাষার বিশিষ্ট পণ্ডিতদের রাষ্ট্রীয় সম্মান দেবার ব্যবস্থা ওঁরই উদ্যোগে চালু হয়েছে।
রাজেন্দ্রপ্রসাদ রাষ্ট্রপতি হলেও নিছক সাধারণ মানুষের মত জীবন কাটাতেন। পশ্চিমী আদব-কায়দা বা বিলাস-ব্যসনের প্রতি তাঁর কোন আগ্রহ ছিল না। খেতেন ডাল-ভাত রুটি-তরকারি। সঙ্গে ঘরে পাতা একটু দই। স্ত্রী রাজবংশী দেবী পূজাপার্বণ আর নাতি নাতনীদের নিয়েই দিন কাটাতেন আর পাঁচজন সাধারণ ঠাকুমা দিদিমার মত। স্বামী রাষ্ট্রপতি হলেও তিনি কখনই তার সঙ্গে কোন অনুষ্ঠানে যেতেন না। এ নিয়ে দিল্লীর রাজনৈতিক মহলের পশ্চিমী আলোকপ্রাপ্তদের হাসাহাসির অন্ত ছিল না। চীন বা রাশিয়ার নেতারা তাদের স্ত্রীদের পাদপ্রদীপের আলোয় আনেন না বলে কোন সমালোচনা হয় না কিন্তু নিজের দেশের রাষ্ট্রপতির স্ত্রী সে কাজ করলে পশ্চিমী ভাবধারার ক্রীতদাসদের মধ্যে ছি ছি পড়ে যায়। সত্যি বিচিত্র দেশ! মজার কথা ডাঃ রাধাকৃষ্ণণ বা ডাঃ জাকির হোসেনের স্ত্রীও শ্রীমতী সরস্বতী গিরির মত স্বামীর উপগ্রহ হয়ে বিচরণ করতেন না কিন্তু তার জন্য তাদের নিয়ে কাউকে হাসাহাসি করতে দেখিনি। কথায় বলে, যাকে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা!
রাজেন্দ্রপ্রসাদ ভোজনরসিক ছিলেন না। তাই রাষ্ট্রপতি ভবনের ভোজসভার ব্যাপারে তিনি পুরোপুরি ভাবেই মিলিটারী সেক্রেটারির উপর নির্ভর করতেন এবং আশা করতেন মিলিটারী সেক্রেটারি অতিথি অভ্যাগতদের রুচি ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করবেন। রাজেনবাবুর ভোজসভার খাবার-দাবার নিয়েও দিল্লীর নানা মহলে অত্যন্ত রুচিবিরুদ্ধ সমালোচনা হত। অনেকেই কথায় কথায় নেহরুর ভোজসভার উল্লেখ করে বলতেন, হ্যাঁ, ওখানে খেয়ে সত্যি মন ভরে। মজার কথা, তিনমূর্তি ভবনেও খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করতেন রাষ্ট্রপতির মিলিটারী সেক্রেটারির অধীনস্থ সরকারী অতিথি আপ্যায়ন বিভাগ (গভর্ণমেন্ট হসপিটালিটি অর্গানিজেশন)।
এই প্রসঙ্গেই রাষ্ট্রপতির এক মিলিটারী সেক্রেটারি কথা মনে পড়ছে। তাঁর নাম ডাঃ বিমানেশ চ্যাটার্জী। ভদ্রলোক ডাক্তারী পাশ করে অবিভক্ত বাংলায় সরকারী চাকরি করতেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর ডাক্তার হন। যুদ্ধ ফেরত ক্যাপ্টেন (নাকি মেজর?) চ্যাটার্জী অবিভক্ত বাংলার শেষ গভর্ণর বারোজের স্টাফ অফিসার হন এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট কলকাতা পুলিশ হাসপাতালে তাঁর পুলিশ-সার্জেনের পদে যোগদানের কথা ছিল। ইতিমধ্যে শ্রীরাজাগোপালাচারীর ঔদার্যে উনি লাটসাহেবের মূখ্য স্টাফ অফিসার হয়ে রাজভবনে থেকে গেলেন। রাজাজী লর্ড মাউন্টব্যাটনের পর প্রথম ভারতীয় গভর্ণর জেনারেল হয়ে দিল্লী যাবার সময় বিমানেশ চ্যাটার্জীকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন এবং তথাকথিত বাঙ্গালী-বিরোধী বলে পরিচিত রাজাজীর সুপারিশ ও অনুগ্রহেই অসামান্য ক্ষমতাসম্পন্ন মিলিটারী সেক্রেটারি হলেন। রাজাজী বিদায় নিলেন; গণতান্ত্রিক ভারতের প্রথন রাষ্ট্রপতি হলেন ডক্টর রাজেন্দ্রপ্রসাদ। বিমানেশ চ্যাটার্জীও বিদায় নেবার জন্য প্রস্তুত কিন্তু রাজেন্দ্রপ্রসাদ তাঁকে বললেন, আপনি যে কাজ করছিলেন, সেই কাজই করুন। আপনি থাকলে আমার বাংলায় কথাবার্তা বলার অভ্যাসটা ঠিক থাকবে। বিমানেশ চ্যাটার্জী থেকে গেলেন এবং রাজেনবাবুর সুপারিশেই উনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন।
রাজেন্দ্রপ্রসাদের আমলে কিছুকাল কাজ করার পরই মেজর জেনারেল চ্যাটার্জী বুঝলেন, নেহরু-রাজেনবাবুর সম্পর্কটা বিশেষ মধুর নয় এবং গভর্ণমেন্ট হসপিটালিটি অর্গানিজেশনের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি ভবনের ভোজসভা ও অতিথি আপ্যায়নকে উপেক্ষা করে তিনমূর্তি ভবনের দিকে একটু বেশি দৃষ্টি দিতে শুরু করলেন। চাকুরি থেকে অবসর নেবার সময় যত এগিয়ে আসে মেজর জেনারেল চ্যাটার্জী তত বেশি মাথাইয়ের প্রিয়পাত্র হবার জন্য সচেষ্ট হন। দিল্লীর রাজ নৈতিক মহলের অনেকেই মনে করতেন, মেজর জেনারেল চ্যাটার্জীর জন্যই নেহরু-রাজেন্দ্রপ্রসাদের সম্পর্ক এত তিক্ত হয়। সত্য-মিথ্যা জানি না কিন্তু মেজর জেনারেল চ্যাটার্জী অবসর গ্রহণ করার পর প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী নেহরুর সুপারিশেই তিনি মরিসাসে ভারতীয় কমিশনার নিযুক্ত হন। মজার কথা, এর পরেও রাজেন্দ্রবাবু রাষ্ট্র পতি ভবনের এক বাঙালী ডাক্তারকে কর্ণেল থেকে ধাপে ধাপে তুলতে তুলতে মেজর জেনারেল করে দেন।
