রাজাজীর মত বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও তীক্ষ্ণ রসবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতি বিদ শুধু ভারতে কেন, সারা দুনিয়ায় বিরল। গভর্ণর জেনারেল হবার কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নয়াদিল্লীস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের মন জয় করে নিলেন। রুচিবোধ ও রসজ্ঞান দিয়ে রাজাজী জয় করে নিলেন নেহরুকেও। নানা দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছ থেকে রাজাজী সম্পর্কে ভাল ভাল মন্তব্য শুনে নেহরু মনে করলেন, রাজাজী প্রথম রাষ্ট্রপতি হলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে নেহরু প্রথম রাষ্ট্রপতি পদের জন্য রাজাজীর নাম প্রস্তাব করলেন। সর্দার প্যাটেল ও অন্যান্যরা তাকে মনে করিয়ে দিলেন বিয়াল্লিশের আন্দোলনের সময় রাজাজী কি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং সে-কথা মনে রেখেই তারা কখনই রাজাজীকে প্রথম রাষ্ট্রপতি হবার সম্মান দিতে পারেন না। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির অধিকাংশ সদস্যদের সমর্থনপুষ্ট রাজেন্দ্রপ্রসাদই ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হলেন এবং নেহরু তাঁর রাজনৈতিক পরাজয়ের প্রথম স্বাদ পেলেন। রাজেনবাবু দ্বিতীয়বারের জন্যও রাষ্ট্রপতি হলেন নেহরুর তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও। এই গ্লানি, এই পরাজয়ের কথা নেহরু কোন দিন ভুলতে পারেননি। আর পারেননি হিন্দু কোড বিলের বিরোধিতা করার জন্য। রাজেন্দ্রপ্রসাদ বলেছিলেন, আইন হোক সমগ্র দেশবাসীর জন্য শুধু হিন্দু বা মুসলমানের জন্য নয়। একাধিক বিবাহ অত্যন্ত নিন্দনীয় ঠিকই, কিন্তু তা সমস্ত ভারতবাসীর জন্য নিষিদ্ধ হোক–শুধু হিন্দুদের জন্য নয়। মুসলমান সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নেহরু রাজেনবাবুর পরামর্শ গ্রহণ করেননি। হিন্দু কোড বিল নিয়েই দুজনের মধ্যেও অত্যন্ত তিক্ততার সৃষ্টি হয়, কিন্তু গণতন্ত্রের পূজাবী নেহরু মতবিরোধকে ব্যক্তিগত বিরোধ মনে করে রাজেনবাবুর মৃত্যুর পরও কেন শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি?
নেহরুর চরিত্রে এই দৈন্য দেখে বহু নেহরু-অনুগ্রাহী ও ভক্তও হতাশ হয়েছিলেন।
০৪. নিষ্ঠাবান গান্ধীবাদী ও কংগ্রেসী
নিষ্ঠাবান গান্ধীবাদী ও কংগ্রেসী হিসেবে রাজেন্দ্রপ্রসাদ সুপরিচিত ছিলেন। গান্ধীজির নেতৃত্বে যে কটি উজ্জ্বল তারকার তেরঙ্গার নীচে সমাবেশ হয়, রাজেনবাবু তাঁদের অন্যতম ছিলেন। ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের চাইতে বিহার ও উড়িষ্যার মানুষ অনেক বেশি বিনয়ী হন। ভারতবর্ষের প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েও বাজেন্দ্রপ্রসাদ বিহারের অতি সাধারণ মানুষের মতই বিনয়ী ছিলেন।
কংগ্রেসের বহু নেতাই অত্যন্ত ভাল ছাত্র ছিলেন। যারা ভাল ছাত্র ছিলেন না, তাঁরাও সুপণ্ডিত ছিলেন। মেধায় রাজেন্দ্রপ্রসাদ ও মৌলানা আজাদ, বিদ্যা-বুদ্ধি পাণ্ডিত্যে নেহরু ও সরোজিনী নাইডু এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় সর্দার প্যাটেল অতুলনীয় ছিলেন। নেহরু, মৌলানা আজাদ ও সরোজিনী নাইডু নিজেদের বিদ্যা-বুদ্ধি পাণ্ডিত্য ও আভিজাত্যের জন্য সব সময় সচেতন থাকতেন বলেই সাধারণ মানুষের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্য সর্দার প্যাটেলের কাছেও অতি সাধারণ মানুষ আসতে দ্বিধা করত কিন্তু রাজেন্দ্রপ্রসাদ চিরকালই নিছক সাধারণ মানুষ ছিলেন।
কলকাতায় রিপোর্টারী করার সময় দু চারটে সভাসমিতি ও সমাবর্তনে রাজেনবাবুকে দেখেছি দূর থেকে কিন্তু দিল্লীতে গিয়ে যেদিন প্রথম কাছ থেকে দেখি, সেদিন চমকে উঠেছিলাম।
এক বিখ্যাত পণ্ডিতের টীকাসহ পদ্মপুরাণ প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতায়। ওদেরই একজন আমাকে চার খণ্ডের পদ্মপুরাণ পাঠিয়ে ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদকে দেবার অনুরোধ করেছিলেন। আমার অগ্রজ প্রতিম রাজেন্দ্রলাল হাণ্ডা তখন রাষ্ট্রপতির প্রেস সেক্রেটারি। ওকে সব কথা জানাতেই উনি বললেন, এই বই যদি রাষ্ট্রপতি ভবনের লাইব্রেরী বা সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট লাইব্রেরীতে থাকে তাহলে প্রেসিডেন্ট এগুলি গ্রহণ করতে পারেন না। দু চারদিন পর ঐ দুটি লাইব্রেরীতে খোঁজখবর নেবার পর মিঃ হাণ্ডা আমাকে জানালেন, না, কোন লাইব্রেরীতেই পদ্মপুরাণের ঐ টীকা নেই। তুমি পরশুদিন সকাল নটায় এসে প্রেসিডেন্টকে বইগুলি দিও।
পৌনে নটায় রাষ্ট্রপতি ভবনে হাজির হয়ে এ-ডি-সির ঘরে গেলাম। কয়েক মিনিট পরে এ-ডি-সি আমাকে রাষ্ট্রপতির স্টাডিতে পৌঁছে দিয়েই বিদায় নিলেন।
রাষ্ট্রপতি ভবনের এই স্টাডি রুম একতলায়। ঘরখানি বড়। ঘরের চারপাশের আলমারীতে বই। তিন কোণায় তিনটি সোফ সেট। এক কোণায় বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিল। ঘরখানির পশ্চিম দিকেই মুঘল গার্ডেন। এই ঘরে বসেই রাষ্ট্রপতি সরকারী কাজকর্ম ও লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেন।
প্রবেশ দ্বারের ঠিক কোণাকুণি উল্টোদিকের সোফায় রাজেন্দ্রপ্রসাদ বসে ছিলেন। আমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ালেন। আমি আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম। তারপর ওঁর কাছাকাছি হতে উনিই এগিয়ে এলেন। একেবারে মুখোমুখি হতেই উনি আমার পায়ে হাত দেবার চেষ্টা করতেই আমি বিদ্যুৎ গতিতে পিছিয়ে এলাম। অবাক বিস্ময়ে বললাম, এ কী করছেন?
রাষ্ট্রপতি শান্তভাবে বললেন, আপনি ব্রাহ্মণ। আপনাকে প্রণাম করব না?
অসম্ভব।… না, না, তা হতে পারে না।
কেন হতে পারে না? উনি প্রশ্ন করতে করতেই আবার আমার দিকে এগিয়ে আসেন।
