দেশে কি ঘটছে জিজ্ঞেস করলে ঠ বলেন, দেশ আর দেশ নেই। ঠ তাঁর আপিস থেকে কয়েকদিনের ছুটি নিয়েছেন। আমি আসার পর থেকে তিনি আর বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন না। তাঁর বড় কন্যা ঠকে আজ একটি প্রশ্ন করেছে, কেন তাকে তার নিজের ঘরটিতে একবার ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, কেন বাড়ির অতিথিটির সঙ্গে, যে অতিথি তার ঘরটিতেই থাকছে, পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে না?
ঠ বলেছিলেন, তাঁর এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া, খুব অসুস্থ, এসেছে ঢাকায় চিকিৎসা করতে। ডাক্তার বলে দিয়েছেন, রোগীর ঘরে যেন পারতপক্ষে কেউ না ঢোকে। জীবাণুমুক্ত পরিবেশ রক্ষা করার জন্যই এই আয়োজন। তা না হলে যে কারও শরীর থেকে জীবাণু উড়ে এসে রোগীর গা জুড়ে বসবে। এসব শুনে ঠ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে নিজেকে খুব পয়পরিস্কার করে তিনিই কেবল রোগীর ঘরে ঢুকবেন। বাড়ির অন্য কারওর রোগীর ঘরে ভিড় করার কোনও দরকারই নেই।
ঠর কন্যার বয়স ষোল। তার সন্দেহ যায় না। কেন সে উঁকি দিয়েও দূরসম্পর্কের আত্মীয়টিকে একটিবার দেখার অনুমতি পাচ্ছে না, সে কারণেই সন্দেহ।
ফস করে মেয়েটি বলে, নাকি ও ঘরে তসলিমা নাসরিন আছে?
ঠ চমকে ওঠেন। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায় তাঁর।
তসলিমা নাসরিন?
হ্যাঁ তসলিমা নাসরিন। সে তো লুকিয়ে আছে। বলা যায় না, ওঘরে হয়ত তুমি তাকে লুকিয়ে রেখেছো!
ঠ মিথ্যে বলেন না সাধারণত। অনেক কষ্টে আগের গল্পটি তাঁকে তৈরি করতে হয়েছিল। ছোট মেয়ে গল্পটি গিললেও বড় মেয়ে গেলেনি। তারপরও তিনি ষোলর সন্দেহ উড়িয়ে দিয়ে আমার সঙ্গে তাঁর কোনও পরিচয়ই নেই, দেখেননি আমাকে কোনওদিন, এ জাতীয় কিছু একটা বলে আপাতত বিপদ থেকে রক্ষা করলেন নিজেকে। কিন্তু বিপদের লালচক্ষু যখন সারাক্ষণই চোখের সামনে নৃত্য করতে থাকে, তখন একসময় করতেই হয় স্বরটিকে নরম, মাথাটিকে নোয়াতেই হয় কিছুটা। ঠ সারা সকাল ছটফট করেন, সারা দুপুর করেন, সারা বিকেল করে সন্ধেয় কন্যাটির কাছে জানতে চাইলেন আমার লেখা সে পড়েছে কি না। কন্যা বলল, পড়েছে এবং তার খুব ভাল লাগে আমার লেখা। তখনই ঠ সিদ্ধান্ত নেন মেয়েকে এ ঘরে এনে একবার আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন। এতে তিনি লাল চক্ষুর বিপদ থেকেও রক্ষা পাবেন। তাঁর বিশ্বাস তাঁর মেয়ে ইশকুলের কাউকে বলবে না এ কথা।
ঠ আমার কাছে জানতে চান আমি রাজি কিনা। আমার রাজি না হওয়ার কারণ নেই। তাঁর উৎসুক কন্যাটি নিয়ে ঠ এ ঘরে আসেন। সুন্দর মেয়ে। পরীক্ষায় ভাল ফল পাওয়া মেয়ে। মেয়েটি স্থির দাঁড়িয়ে থেকে বড় বড় চোখ করে আমাকে দেখে। বলি, ‘তোমার ঘরটা ছেড়ে যেতে হল, নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে হচ্ছে তোমার!’
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলে, না।
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলল যে তার বিশ্বাস হচ্ছে না চোখের সামনে সে আমাকে দেখছে। অপ্রতিভ একটি হাসি আমার মুখে। কেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না যে এটি আমি। আমি ঠিক বুঝতে পারি না এই বিশ্বাস না হওয়ার ব্যাপারটি প্রিয় কোনও লেখককে চোখের সামনে দেখলে যেমন বিশ্বাস হয় না তেমন নাকি এক পলাতক আসামীকে দেখার উত্তেজনা! যার ফাঁসির জন্য দেশ জুড়ে আন্দোলন হচ্ছে। যাকে লক্ষ লক্ষ লোক খুঁজছে খুন করার জন্য!’
রাতে ঙ এলেন। ঠ সন্তর্পণে ঙকে নিয়ে ঢোকেন আমার ঘরে। ত্রস্ত উঠে বসি। ঙ ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়তে নাড়তে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলেন— আজও হল না। আমার কণ্ঠে থিকথিক করছে উত্তেজনা।
—কেন হল না?
—জানি না কেন হল না।
—কী হবে তাহলে?
—কী হবে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
—জামিন হচ্ছে, হবে, এমন কথাই তো বলেছিলেন।
—এমনই তো আমি ভেবেছিলাম।
—সরকার নাকি আশ্বাস দিয়েছে..
—তা তো জানতাম যে দিয়েছে। এখন তো কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না আমার কাছে। কাউকেই এখন আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।
—নাকি দেরি হবে জামিন হতে?
—আর কত দেরি হবে? কিজানি, কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না।
—তাহলে ভরসা কি কিছু নেই?
—ভরসা কার ওপর করব? কিছুরই হয়ত বিশ্বাস নেই।
ঙ চুপচাপ বসে থাকেন। এক কাপ চা খেতে চেয়েও চা আর খাবেন না জানিয়ে দেন। ঙর মুখের দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকেন ঠ। তিনিও কিছু বলছেন না। ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই ঘরে। গভীর একটি কুয়োর মধ্যে আমাকে যেন কেউ ফেলে দিল। বিছানায় বসে আছি, হাঁটু ভাঁজ, হাঁটুতে থুতনি। ধীরে ধীরে চোখ দুটো বুজে আসে। আমার হাত পা শিথিল হতে থাকে ।
৩. অতলে অন্তরীণ – ৬১
তিন আগস্ট, বুধবার
আজও আমাকে তৈরি থাকতে বলা হয়। বলা হয় সকাল দশটার সময় আমাকে নিতে কেউ আসবে। কেউটি কে, তা আমাকে জানানো হয় না। ঠ সকালে নাস্তা নিয়ে এসেছেন। তাঁর চোখের নিচ ফোলা ফোলা, চুল উড়োখুড়ো। রাতে তিনি ঘুমোননি। রাতে তো আমিও ঘুমোই না। একের পর এক রাত যাচ্ছে ঘুমহীন, দিনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে আতঙ্কে। আমি এখন আর নিজের চেহারাটির দিকে তাকাই না। নিজের মুখটি অনেক দিন আমার কাছে আর চেনা মনে হয় না। ঠ অনেকক্ষণ বসে থেকেছেন পাশে। উৎকণ্ঠায় তাঁর ফর্সা মুখটি নীল নীল দেখায়। গা ধুয়ে মুছে কাফন পরিয়ে সুরমা আতর লাগিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার মত ঠ আমাকে সাজিয়ে দেন। কেবল একটি খাটিয়ে আসার অপেক্ষা। খাটিয়া এই এল বলে। সময় পাগলা ঘোড়ার মত লাফাচ্ছে। সময় আবার কচ্ছপের মতও স্থির। আমি একবার চাইছি খাটিয়া আসুক, আরেকবার চাইছি না আসুক। ঘনঘন পেচ্ছাব পায়, গা ঘামে, ঘন ঘন জিভ গলা শুকিয়ে আসে।
