–‘আপনার ল’ইয়ার তো সারা হোসেন, তাই না?’ ভ’বাবু হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘হ্যাঁ সারা, সারার বাবা ডক্টর কামাল হোসেন। ডক্টর কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। উনি আমার দেশে ফেরার ব্যাপারে কোনো কথাই বলতে চান না। ওঁর স্ত্রী হামিদা হোসেনকেও তো চিঠি লিখলাম। মোটেও আগ্রহ দেখালেন না। ফেরা সম্ভব হলে ফিরতাম। এই দেশে থাকার চেষ্টা করতাম না। কোথাও কোনো জায়গা নেই বলে এই দেশে থাকি। প্রাণের টানে, ভাষার টানে, শেকড়ের টানে থাকি। এখানে লেখার মধ্যে থাকতে পারি, বাঙালি বন্ধু, বাঙালি পাঠক, এসবের মধ্যে থাকার প্রয়োজন তো খুব একজন বাঙালি লেখকের। দেশ থেকে কিছু আত্মীয় স্বজনও আসতে পারে। আমি তো ইসলাম নিয়ে এখন কিছু লিখিনি। অনেকদিন আগে লেখা বই দ্বিখণ্ডিত। ভারতে থাকা শুরু করার অনেক আগে। দ্বিখণ্ডিত বিদেশে বসে লেখা বই। ভারতে থেকে আমি ইসলাম নিয়ে লিখিনি কিছু। ওই বই থেকে তো পার্লামেন্টে প্রণব বাবু বলার পর ডিলিটও করে দিলাম। আপনার সঙ্গে প্রণব বাবুর কথা হয় কী না জানি না। উনি জানেন আমি যে ডিলিট করেছি।
ভ’ বাবু মাথা নাড়লেন।
‘এখন যদি আমার রেসিডেন্স পারমিটটা এক্সটেন্ড না করেন, তবে তো আমাকে চলে যেতেই হবে এ দেশ ছেড়ে। বুঝবো আমার জন্য এই উপমহাদেশে কোনও জায়গা নেই’।
এ সময় আমার গলা বুজে আসে কান্নায়। বলতে থাকি আমি। দু’চোখ বেয়ে ঝরতে থাকে জল। বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে আর চোখ বেয়ে জল ঝরছে। ঝরেই যাচ্ছে। ভ’বাবু এত বড় একটি দেশের এত বড় ক্ষমতাবান ব্যক্তি, যে দেশটি অদূর ভবিষ্যতে ‘সুপার পাওয়ার হওয়ার মতো যোগ্যতা রাখছে, সেই দেশটি আমার মতো স্বদেশ হারা, স্বজনহারানো একটি অসহায় লেখককে জায়গা দিতে পারছে না একশ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশে, মাত্র হাতে গোনা কজন মৌলবাদী চাইছে না বলে। অবিশ্বাস্য লাগে সবকিছু। মৌলবাদীদের সন্তুষ্টি করা ভোটের জন্য দরকার, ক্ষমতায় থাকার জন্য দরকার। শুনেছি। ক্ষমতার এত লোভ সবার! সমাজটাকে নষ্ট করে হলেও ক্ষমতা চাই।
বলতে থাকি, চোখের জল মুছে নিয়ে বলতে থাকি, ‘বিদেশে আমি হয়তো প্রাণে বেঁচে থাকতে পারি, কিন্তু সেই বেঁচে থাকা সত্যিকার বেঁচে থাকা নয়। সত্যিকার বেঁচে থাকতে হলে, আমাকে বাংলাদেশে নয়তো ভারতে থাকতে হবে। ওসব দেশে আমি বেঁচে থাকতে পিরবো, কিন্তু লেখক হিসেবে বেঁচে থাকতে পারবো না। আমি বিদেশে যেতে চাই না। ওসব দেশে থাকতে আমার ভালো লাগে না। ওসব দেশে আমি এক মুহূর্তের জন্য ভালো থাকি না। আমি কোথাও যাবো না। দিল্লিতেই থাকবো, যেখানে রেখেছেন সেখানেই। যেদিন কলকাতা যেতে দেবেন, সেদিনই যাবো কলকাতায়। তার আগ অবধি এখানেই থাকবো। আমাকে এ দেশের অনেকে তো ভালোবাসে।
ভ’বাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ তা নিশ্চয়ই বাসে।
‘যারা চাইছে না আমি এ দেশে থাকি, ওরা তো অল্প কজন লোক। ওরা চাইছে বলে আমার জীবন নষ্ট হবে কেন! ওদের হুমকি তোত আমার জীবনে নতুন কিছু নয়। ওরা এমন হুমকি কোনো একটা উদ্দেশ্যে দেয়, পরে আবার চুপ হয়ে যায়। এখন যদি এখানে, এই সেইফ হাইজে কিছুদিন থাকতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়, আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি শুধু চাইবোদু’একজন বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে যেন দেখা করতে দেওয়া হয়..।
ভ’বাবুও তাঁর কথাগুলো পুনরায় বললেন। আমিও অত্যন্ত শান্তকণ্ঠে একই কথা আবার বললাম। কোথাও যাবো না। এরপর তিনি হঠাৎ ঘড়ি দেখলেন। তাঁর তাড়া আছে। যেতে হবে।
‘আপনাকে তো আমি ফোন করতে চাই। কিন্তু আপনার ব্যস্ততা আছে ভেবে ফোন করতে কুণ্ঠা বোধ করি।
হেসে বললেন, ”রাত দশটার পর ফোন করবেন। দেখি আমি পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সঙ্গে কথা বলে দেখি..
এতক্ষণের এই কথোপকথনের পর আমি ভাবলাম ভ’বাবুর মন বোধহয় আমার জন্য একটু নরম হয়েছে। কিন্তু কোথায় নরম। গাড়ি করে আমাকে যখন পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কারাগারে, পথে ফোন এল ভ’ বাবুর, প্রভুর কাছে। এক নম্বর, তিনি জেনুইনলি চাইছেন আমাকে হেল্প করতে। সুতরাং এটা যেন আমি বুঝতে চেষ্টা করি। দুই নম্বর, আজকের সাক্ষাতের কথা যেন মিডিয়া না জানে।
পথে প্রভুকে অনেক অনুরোধ করলাম চলুন কোনো ক্যাফেতে, কোথাও না কোথাও, কোনও রেস্তোরাঁয়, চলুন বাইরে কোথাও। আমি আসলে মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে আমি বন্দি। তাই অমন আবদার করি। প্রভু আমাকে কোথাও নেন না। কারাগারে ফিরে আসেন। পায়চারি করি ভোলা ছাদে। সঙ্গে প্রভু। উনি রহস্যময় মানুষ। বললেন, ”আপনার প্রেজেন্টেশনটা দারুণ। আমি মুগ্ধ।
আমি বলি, ‘আমি তো ওখানে অভিনয় করতে যাইনি। আমার মনের কথাগুলোই বলেছি।
পায়চারি করার সময় মনে থাকে না, ভুলে যাই যে, আমি মাত্র সিসিইউ থেকে উঠে আসা। কোনো বাঁধন না মানা রক্তচাপ থেকে উঠে আসা। রক্তচাপ মেপে দেখলাম, ২২০/১২০।
–চলুন এক্ষুণি যেতে হবে হাসপাতালে। ভর্তি হতে হবে। –কিন্তু ভর্তি করবে না। গিয়ে লাভ নেই।
–কেন করবে না। ওরাই তো বলেছিলো ব্লাড প্রেসার স্বাভাবিক না হলে হাসপাতাল থেকে ছাড়বে না। এখনও তো স্টেবল হয়নি। এই ব্লাড প্রেশার নিয়ে আমি হাসপাতালের বাইরে থাকবো না। কালই আমার রক্তচাপ দু’শ থেকে পঞ্চাশে নেমেছিলো। আমি ভরসা পাচ্ছি না এখানে থাকতে।
