তা ঠিকই, নেই। বৈঠকঘরের সামনের ঘরটি দাদা বানালেন তাঁর আপিসঘর, একটি ড্রয়ারঅলা টেবিল পাতলেন;ফাইসন্স কোম্পানির যাবতীয় কাগজপত্র, ওষুধের ব্যাগ, সব সাজিয়ে রাখলেন সে টেবিলে।
এত আসবাব বানানোর মূল কারণটি হল দাদা বিয়ে করবেন। বউ আসবে, একটি গোছানো বাড়ি পাবে অর্থাৎ তৈরি সংসার পাবে। দামি দামি কাচের বাসনপত্র কিনে আলমারিতে সাজিয়ে রেখেছেন, চাবি তাঁর পকেটে।
আত্মীয় স্বজনরা ঘুরে ঘুরে দাদার সাজানো ঘরদোর দেখে বলে যান নোমানের তো সবই হইল, এইবার একটা বউ হইলেই হয়।
বিয়ে করবেন বলে প্রায় কয়েক বছর থেকে মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছেন দাদা। মেয়ে দেখানো হচ্ছে, কিন্তু কোনও মেয়েকে পছন্দ হচ্ছে না। বিভিন্ন বাড়ি থেকে প্রস্তাব আসে, অথবা প্রস্তাব পাঠানো হয়, তিনি আত্মীয় বা বন্ধু সঙ্গে নিয়ে মেয়ে দেখে আসেন, যাবার সময় প্রতিবারই এলাহি কাণ্ড ঘটান, ঘন্টাখানিক সময় নিয়ে পুরো-সাবান খর্চা করে স্নান করেন, স্নান সেরে অসম্ভব বেসুরো গলায় গান গাইতে গাইতে মুখে পনডস ক্রিম আর পাউডার মাখেন, হাতে পায়ে জলপাই-তেল আর শরীরের আনাচ কানাচে তো আছেই, বুকে পেটে পিঠে, হাতের নাগালে শরীরের যা কিছু পান, মোটেও কাপর্ণ্য না করে সগু ন্ধী ঢালেন। এমনিতে সগু ন্ধীর ব্যাপারে দাদা বেশ হিশেব করে চলেন, বাড়িতে এক দাদারই সগু ন্ধীর আড়ত, মাঝে মাঝে কোথাও বেড়াতে যাবার আগে, দাদা একটু সেন্ট দিবা? যদি বলি, প্রথম বলে দেন, নাই। গাঁই গুঁই করলে কোথায় যাচ্ছি কেন যাচ্ছি ইত্যাদি সব প্রশ্ন করেন, উত্তর পছন্দ হলে তিনি তার ঘরের গোপন এক জায়গা থেকে সগু ন্ধীর শিশি বের করে বারবার বলেন এইটা হইল আর্থমেটিক, বা এইটা হইল ইন্টিমেট, মেইড ইন ফ্রান্স, মেইড ইনটা দাদা বলবেনই, তারপর এক ফোঁটা মত কিছু দিয়ে বলবেন ইস অনেকটা পইড়া গেল!
কি দিলা দেখলামই না তো!
আরে ওইটুকুর মধ্যেই তো দুইশ টাকা চইলা গেছে।
দাদা বাড়ি না থাকলে খুঁজে ওই গোপন জায়গায়, জুতোর ভেতর, সুগন্ধীর শিশি আর পাইনি, নতুন জায়গায় শিশি রেখেছেন লুকিয়ে, মা-বেড়াল যেমন বাচ্চা-বেড়ালের ঘাড়ে কামড় দিয়ে জায়গা বদলায়, দাদাও তেমন সগু ন্ধীর শিশির জায়গা বদলান। যাই হোক, প্রচুর সময় নিয়ে সাজগোজ করে, আয়নার সামনে নানা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেন দাদা। আমাদের জিজ্ঞেস করেন কী, সুন্দর লাগতাছে না! আমরা একবাক্যে বলি, নিশ্চয়ই। নিঃসন্দেহে সুন্দর দেখতে দাদা, চুল যেমন ঘন কালো, নাক টিকলো, বড় বড় চোখ, চোখের পাপড়ি, দৈঘের্ প্রস্থে রীতিমত সপুুরুষ। চকচকে জুতো পায়ে, গরমকালেও স্যুট টাইপরা দাদা চমৎকার হাসি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোন মেয়ে দেখতে আর প্রতিবারই ফেরেন মলিন মখু করে। প্রতিবারই পকেটের সোনার আংটি পকেটেই থাকে, কাউকে আর দেওয়া হয় না।
কী দাদা, মেয়ে কেমন দেখলা? জিজ্ঞেস করি।
দাদা নাক কুঁচকে বলেন আরে ধুর!
প্রতিবারই তিনি বাড়ির সবাইকে বৈঠকখানায় বসিয়ে দেখে আসা মেয়ের খুঁত বর্ণনা করেন।
বাবা একবার দাদাকে পাঠালেন তাঁর এক চেনা লোকের মেয়েকে দেখে আসতে। দাদা দেখেও এলেন। বাবা বাড়ি ফিরে দাদাকে নিয়ে বসলেন, মেয়ে পছন্দ হইছে?
দাদা সঙ্গে সঙ্গে মুখের যা কিছু কোঁচকানোর আছে কুঁচকে বললেন না।
কারণ কি? মেয়ে ত শিক্ষিত !
হ শিক্ষিত।
বি এ পাশ করছে!
তা করছে।
মেয়ে ফর্সা না দেখতে?
হ ফর্সা।
চুল লম্বা না?
হ।
মেয়ে তো খাটো না!
না খাটো না।
বাবা এডভোকেট।
হ।
বার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ছিল ত অনেকদিন।
হ।
শহরে দুইডা বাড়ি!
হ।
ভাল বংশ।
হ।
মেয়ের কাকারা তো সব ভাল চাকরি করে। একজন সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার।
হ।
মেয়ের ফুপাতো একটা ভাই ত লন্ডনে থাকে।
হ।
মুরব্বি কারা কারা ছিল?
মেয়ের ভাই ছিল, বাবা ছিল।
বড় ভাই না ছোট ভাই?
বড় ভাই।
বড় ভাই তো বিয়া করছে কয়দিন আগে, খুব বড়লোকের মেয়েরে বিয়া করছে।
মেয়ের বাবা ডিস্ট্রিক জাজ ছিল।
হ।
ওদের বাড়িঘরের অবস্থা নিশ্চয়ই ভাল।
হ ভাল। ড্রইংরুমে দামি সোফা টোফা আছে।
টেলিভিশন আছে তো!
হ।
কি খাওয়াইল?
তিন রকমের মিষ্টি খাওয়াইল, চা খাওয়াইল।
মেয়ের কথাবার্তা কেমন? আচার ব্যবহার?
তা ভাল।
ভদ্র তো!
হ ভদ্র।
শান্তশিষ্ট মেয়ে!
হ।
তাইলে পছন্দ হইল না কেন?
সবই ঠিক ছিল, কিন্তু
কিন্তু কি?
ঠোঁটটা…
ঠোঁটটা মানে?
নিচের ঠোঁটটা চ্যাপ্টা না, উঁচা। উঁচা ঠোঁটের মেয়েদের আমার দুইচোখখে দেখতে ইচ্ছা করে না।
হুম।
দাদার জন্য চ্যাপ্টা ঠোঁটের মেয়ে দেখা শুরু হল। একটি মেয়ের খবর এল, টাঙ্গাইলে বাড়ি, তার বোনের বাড়ি ময়মনসিংহ, আমাদের পাড়াতেই। মেয়েকে টাঙ্গাইল থেকে বোনের বাড়ি আনানো হল। কনে দেখার দিন তারিখ ঠিক হল। দাদা যথারীতি সেজে গুজে আমাকে আর ইয়াসমিনকে নিয়ে ও বাড়িতে গেলেন। মেয়ের বোন দরজা খুলে দিয়ে আমাদের ভেতরে বসালেন। কিছু টুকটাক কথাও বললেন, যেমন, তুমি তো এবার মেডিকেলে ভর্তি হলে, তাই না?
তোমার নাম কি?
ইয়াসমিন! আমার ভাইঝির নামও ইয়াসমিন।
আমার মেয়েও তো বিদ্যাময়ী ইশকুলে পড়ে,ও আজকে ওর মামার বাড়ি গেছে।
আজকাল গরমও পড়েছে খুব, এই গরমে রাত্রে আবার ইলেকট্রিসিটি চলে যাচ্ছে!
আচ্ছা কী খাবেন বলেন, চা না ঠাণ্ডা?
এধরনের অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যাপারটি ঘটল, ট্রেতে চা বিস্কুট নিয়ে ডানো ঢুকল ঘরে। অপলক তিনজোড়া চোখ ডানোর দিকে। ডানো অপ্রস্তুত হেসে বসল একটি চেয়ারে। চা খাওয়া হচ্ছে, এবং সঙ্গে চলছে অপ্রয়োজনীয় কথা।
