কলেজে।
এখন আবার কলেজ কি?
ক্লাস আছে।
তর তো সকাল আটটায় কলেজ শুরু হইছে।
হ হইছে। তাতে কি! আটটার সময় যে ক্লাস ছিল করি নাই।
এখন কলেজে যাইয়া কি করবি?
দেড়টার ক্লাস করতে যাইতাছি।
যখন ইচ্ছা তখন গেলে ত হয় না।
তোমার তো দৌড় ইশকুল পর্যন,্ত এই সব বুঝবা না।
নিয়মটি আমার খুব ভাল লাগে, যখন ইচ্ছে ক্লাসে যাও, ক্লাস করতে ইচ্ছে না হলে প্রক্সি দিয়ে বেরিয়ে পড়। প্রক্সি শব্দটির চল খুব বেশি কলেজে। ক্লাস না করতে পারি, কিন্তু উপস্থিতির সংখ্যা কম থাকলে পরীক্ষায় বসা যাবে না। বন্ধুৃরা নকল উপস্থিতি দিয়ে দেয়। প্রতিটি ক্লাসে নাম ডাকার সময় ইয়েস স্যার বলে দিলেই হয়। এখন কে বলছে ইয়েস স্যার, তোফাজ্জলেরটা মোজাম্মেল বলছে কি না, তা কে তলিয়ে দেখে! মাথা নিচু করে ইয়েস স্যার বলে উপস্থিত বন্ধুর অনপুস্থিত বন্ধুকে একরকম বাঁচায়। এই উপস্থিত আবার যখন অনপুস্থিত হবে, তখন আগের সেই অনপু স্থিত উপস্থিত থেকে নতনু অনপুস্থিতকে বাঁচাবে।
সেঁজুতির চতথুর্ সংখ্যা নিয়ে পড়েছি। কলকাতা থেকে চিঠি, কবিতা,সাহিত্যপত্রিকা, বই ইত্যাদি আসে। নির্মল বসাক সময়ের খেলনা পাঠিয়েছেন, অভিজিৎ ঘোষের নিঃসঙ্গ মানুষ এসে দাঁড়ায় সামনে। তাঁদের কবিতাপত্রিকা সৈনিকের ডায়রি, ইন্দ্রাণী নিয়মিত পাচ্ছি। মোহিনী মোহন গঙ্গোপাধ্যায়, ক্ষিতিশ সাঁতরা, চিত্রভানু সরকার, শান্তি রায়, বিপ্লব ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র কুমার দেব, প্রণব মুখোপাধ্যায় কবিতা পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কবিতা পৌঁছতে থাকে হাতে। আলমগীর রেজা চৌধুরী, আহমদ আজিজ, খালিদ আহসান, জাহাঙ্গির ফিরোজ, মিনার মনসুর, মোহন রায়হান, রবীন্দ্রনাথ অধিকারী, রমেশ রায়, হারুন রশিদ, সাজ্জাদ হোসেন এরকম আরও অনেকের লেখা পরপর সাজিয়ে নিই। চন্দনার কবিতা হার্দিক রাইফেল নামে। আমারটির নাম দিয়েছি বুর্জোয়া কষ্টরা এসে আমার হৃদয় ধর্ষণ করছে। দুই বাংলার সাহিত্য পত্রিকা প্রতিদিন দশ বারোটি করে আসে। জমিয়ে রাখি টুকিটাকি খবরের জন্য। দশ পৃষ্ঠাই চলে যায় টুকিটাকিতে। চতুর্থ সংখ্যা সেঁজুতিতে, ছোটদাকে জানিয়ে দিই, বিজ্ঞাপন দরকার। এটি বই আকারে বের করছি, বৃহৎ কলেবরে যাকে বলে। ছোটদা পিপুলস টেইলাসর্, আর টিপটপ কনফিকশনারির দুটো বিজ্ঞাপন যোগাড় করে আনেন। বেঙ্গল এন্টারপ্রাইজের জিঙ্ক লোগো দিয়ে শেষ পাতায় একটি বিজ্ঞাপন দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন ধন। বই আকারে হবে তো বোঝা গেল, কিন্তু পঈচ্ছদ করবে কে? পঈচ্ছদ করার জন্য ছোটদাকে বলি শিল্পী যোগাড় করতে। গোলপুকুর পাড়ে পোড়ামাটি-শিল্পী অলক রায়ের ভাই পুলক রায় আড্ডা দিতে আসে, তার কাছে ছোটদা খবর পান অলক রায় শহরে নেই। সুতরাং অলক রায়ের ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই, ছোটদার হাতে আর কোনও শিল্পী নেই। অতএব আমি নিজেই একটি মেয়ের মখু এঁকে ছোটদাকে পাঠাই ব্লক করে আনতে। এরপর তো তাগাদা, কই এত দেরি হইতাছে কেন, আইনা দেও। কিছুতেই দেরি সয় না আমার। সবকিছু ইচ্ছে করে আজই করে ফেলি। এক্ষুনি। এই এক্ষুনি করে ফেলার স্বভাবটি মার মধ্যেও আছে। মা শাদা টেট্রনের কাপড় পেলেন একগজ বাড়ির ছেলেদের টুপি বানানোর জন্য, ঈদের আগে আগে। কাঁচিতে দুটো টুপির কাপড় কাটা হয়েছে, এবার তৃতীয় টুপির কাপড়টি কাটার জন্য হাতের কাছে মা আর কাঁচি পাচ্ছেন না, কাঁচি পাচ্ছেন না, আশেপাশে খুঁজলেন, এঘর ওঘর খুঁজলেন খানিক, এরপর বটি হাতে নিলেন, বটি দিয়েই কাটলেন কাপড়। ছোটদাও বলেন আমার ধৈর্য নেই। জমান প্রিন্টার্সের লোকরাও। আমার কিন্তু মনে হয় না আমার ধৈর্য কিছু কম, বরং মনে হয় মানুষগুলো বড় ঢিলে, যে কাজটি পাঁচ মিনিটে হয়ে যায়, সে কাজটি করতে পাঁচ দিন লাগায়। আমার বসে থাকতে ইচ্ছে হয় না। কবিতা লিখতে গেলেও দীর্ঘক্ষণ সময় নিতে ইচ্ছে করে না। সময় নিলেই মনে হতে থাকে কবিতা আমাকে শেকলে জড়িয়ে ফেলেছে। আমার দম বন্ধ লাগে। একটি কবিতার পর নতুন একটি কবিতা শুরু করতে ভাল লাগে। কিন্তু একটি নিয়ে রাত দিন পড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। ঘষা মাজাও অত পোষায় না। যা লিখেছি লিখেছি। একজনের ধৈর্য দেখেছি, সে বড়মামার শ্বশুরমশাই। বেঁটে ফর্সা ভদ্রলোক, হিমালয়ের গুহা থেকে মাত্র বেরোনো কোনও সন্ন্যাসীর মত দেখতে। তিনি স্ত্রী মারা যাবার পর বিরহ যাতনা বলে একটি কবিতা লিখেছিলেন, দিয়েছিলেন দাদার পাতা পত্রিকায় ছাপতে। তিনশ একচল্লিশটি শব্দের কবিতায় দুশ ছিয়াশিটি শব্দই ছিল হয় যুক্তাক্ষর, নয় রফলা যফলা রেফঅলা শব্দ। তিনি গোটা একটি বছর নিয়েছেন কবিতা লিখতে। দাদা পাতায় সেটি ছাপার পর দ্বিতীয় সংখ্যায় আবার একই কবিতা খানিক সংশোধন করে তিনি ছাপতে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় সংখ্যায় সংশোধিত কবিতা বের হওয়ার পর তিনি তৃতীয় সংখ্যার জন্য যখন একই কবিতার তৃতীয় সংশোধনী নিয়ে দাদার কাছে সকাল বিকাল ধরনা দিতে শুরু করলেন, একসময় এমন হল যে বড়মামার শ্বশুরমশাইএর শ্রীমখু খানা কালো ফটকের কাছে দেখলেই দাদা গোসলখানায় ঘন্টাখানিকের জন্য অদৃশ্য হয়ে যেতেন।
ক্লাস শেষে আমি বেশির ভাগ বাড়ির দিকে না ফিরে যেতে থাকি জমান প্রিন্টার্সের দিকে। জমান প্রিন্টাসর্ রাজবাড়ির ইশকুলের উল্টোদিকে একটি য়চ্ছ সরোবরের পাশে। ছাপাখানার লাগোয়া বাড়িটি উঁচু দেয়াল ঘেরা। খুরশিদ খানের বাড়ি। খুরশিদ খানেরই ছেলে মন, ধন, জন। ধনের বড় ভাই মন দাদার পাতার আমলে ছিলেন। পরে দায়িত্ব চলে গেছে ধনের হাতে। অসম্ভব অমায়িক রসিক ভদ্রলোক ধন। ধোপদুরস্ত জামা কাপড় গায়ে। আমি ছাপাখানায় ঢুকলেই তিনি তাঁর ঘরে ডেকে আমাকে বসান। চায়ের কথা বলেন। বসিয়ে রাজ্যির গল্প করেন। খুরশিদ খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছোট ভাই, জাত মুসলিম লীগ। অথচ ধনকে দেখে মোটেও বোঝার উপায় নেই যে বংশের রাজনীতির মোটেও তিনি বাহক। এমন কোনও প্রসঙ্গ নেই, যা নিয়ে তিনি অনর্গল কথা বলতে পারেন না। মূলত আমি শ্রোতা, ধন মাঝে মাঝেই বলেন, কি ব্যাপার আপনি সাহিত্য করেন, অথচ মখু দিয়া কোনও কথাই বার হয় না আপনার। আমি অনেক কবি লেখকের কাছেই ঘেঁষতে চাই না ওদের কথার জ্বালায়। ঠোঁটের স্মিত হাসিটুকু সম্বল করে আমি ধনের ধনচর্চা মনচর্চা জনচর্চা শ্রবণ করে সেঁজুতির যেটকুু ছাপা হয়েছে তা নিয়ে চলে আসি বাড়িতে, প্রুফ দেখে আবার পরদিন দিয়ে আসি। ছাপাখানার শ্রমিকদের সঙ্গে আমার ভাব হতে থাকে। ছাপাখানায় ঢুকলে, লক্ষ করি, ওদের মুখে প্রশান্তির ছাপ।কি আপা কেমন আছেন? আমাকে প্রতিবারই জিজ্ঞেস করেন কালিঝুলিমাখা শ্রমিকেরা। ধন না থাকলেও আমাকে বসতে দিয়ে চা নিয়ে আসে আমার জন্য। কাছ থেকে শ্রমিকদের কাজকর্ম দেখি, মেশিনগুলো কি করে চালাতে হয় শিখে নিয়ে নিজের হাতে চালাই। শ্রমিকেরা আমার কাণ্ড দেখে হাসে। কালি আমার গায়েও লাগে। ছাপাখানার বিষয়টি আমার কাছে আর দুবোর্ধ ্য বলে মনে হয় না। সেঁজুতি যেদিন ছাপা হল, মস্ত প্যাকেট গুলো রিক্সায় তোলার আগে ধনকে ছাপার খরচ দিতে গেলে তিনি বললেন, আপনার মনে হয় টাকা বেশি হইয়া গেছে। যান যান। ওই কয়টা টাকা না নিলে আমি না খাইয়া মরব না। চতুথর্ সংখ্যা সেঁজুতি ছাপা হয়ে বেরোলো, পঈচ্ছদ শাদা, ভেতরে সবুজ। পঈচ্ছদের কাগজ বাড়তি যা ছিল তা দিয়ে সেঁজুতির প্যাড বানিয়ে নিয়ে আসি। কাগজের ওপরে ডানপাশে তসলিমা নাসরিন, অবকাশ, ১৮, টি এন রায় রোড, আমলাপাড়া আবাসিক এলাকা, ময়মনসিংহ। আমলাপাড়ার লেজে এখানকার কোনও বাসিন্দা আবাসিক এলাকা জুড়ে দেয় না, এটি সম্পণূর্ ই দাদার তৈরি। ঢাকার ধানমণ্ডির মত বড়লোকদের এলাকাকে আবাসিক এলাকা বলা হয়, আমলাপাড়ায় দোকান পাট নেই, লোক বসতি কেবল, এটিকে কেন আবাসিক এলাকা বলা হবে না! যুক্তি আছে বটে।
