—
আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের দ্বিতীয় অংশে প্রতিরোধের মুখেও অনেক বেশি হারে রাজকীয় আমলাতন্ত্রে হিন্দুদের নিয়োগ করেছিলেন।
আমি আগেই উল্লেখ করেছি, ১৬৭৯-১৭০৭ সময়কালের মধ্যে মোগল কর্মকর্তাদের মধ্যে হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব অর্ধেক বেড়ে গিয়েছিল। হিন্দু অভিজাতের এই বৃদ্ধি নিয়ে অনেক কর্মকর্তা আপত্তি উত্থাপন করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে ভীমসেন সাক্সেনার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এই হিন্দু সৈনিক কয়েক দশক আওরঙ্গজেবের অধীনে কাজ করেছিলেন। পরে তিনি ফারসিতে ইতিহাস রচনা করেছিলেন। তিনি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, ‘ওই সময়ের রেওয়াজ ছিল যে [পদোন্নতির জন্য] হিন্দুদের নাম কখনো সুপারিশ করা হতো না।’ খুবই সম্ভব যে মারাঠাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে অভিজাতদের মধ্যকার নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল। ওই পর্যায়ে মোগল অভিজাতদের মধ্যে মারাঠারা রাজপুতদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর ফলেই হিন্দু কর্মকর্তাদের হ্রাস করার (যদি ব্যর্থও হয়ে থাকে) চেষ্টা হয়েছিল ।
পরের দিকেও আওরঙ্গজেব জোরালোভাবে বলে যাচ্ছিলেন যে মোগল চাকরির জন্য ধর্মীয় লিটমাস টেস্টের প্রয়োজন নেই। একবার বুখারা থেকে আগত এক মুসলিম (তিনি ১৬৮০-এর দশকের শেষ দিকে মোগল চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন) এই যুক্তিতে ইরানিদের রাজকীয় চাকরিতে পদোন্নতি দেওয়া বন্ধ করতে সম্রাটের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন যে তারা সুন্নি নয়, শিয়া। আওরঙ্গজেব এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অভিমত প্রকাশ করেন যে “দুনিয়াদারির বিষয়ের সাথে ধর্মের সম্পর্ক কী? গোঁড়ামি দিয়ে প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করার যুক্তি কী আছে? ‘কারণ তোমার জন্য তোমার ধর্ম, আমার জন্য আমারটি।’ এই শাসন [তোমার প্রস্তাবিত] যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আমার কর্তব্য হবে সব (হিন্দু) রাজা ও তাদের অনুসারীদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করা। বিজ্ঞ লোকেরা সক্ষম কর্মকর্তাদেরকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ নাকচ করে।”
শিবাজি ও আওরঙ্গজেব
দিল্লি থেকে সুবেদারগিরি করাটা পতিতাকে প্রলুব্ধ করার মতো । তার সৌন্দর্য দেখে, কে না তাকে কামনা না করে থাকতে পারে?
তার ছলাকলা তো বিশ্ব জয় করার ।
সে যার পানেই তাকাবে, তাকে সে সাথে সাথে কর্পদহীন করে ফেলবে।
ভুষণ বলে, তার সাহচর্যে সময় ব্যয় করায় কোনোই লাভ নেই ।
-–ভূষণ ত্রিপাঠী, হিন্দু কবি, তিনি কাজ করতেন শিবাজির সাথে, ১৬৭৩
আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডার বিরোধিতা করে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন শিবাজি ভোঁসলে। মারাঠা যোদ্ধা শিবাজি শেষ পর্যন্ত নিজের শক্তিতে রাজা হয়েছিলেন। মোগল সম্রাট কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে শিবাজির ধ্বংস সৃষ্টিকারী হামলা দমন করার, অনেকটাই অসফলভাবে, চেষ্টা করেছিলেন ।
আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণের আগে থেকেই শিবাজি ছিলেন একটি কাঁটা। শিবাজি ১৬৫০-এর দশকটি ব্যয় করেছিলেন পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি এলাকায় (আধুনিক কালের পুনের কাছে) একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠায়। তিনি প্রথম সরাসরি আওরঙ্গজেবের বিরোধিতা করেন ১৬৫৭ সালে। এ সময় শাহ জাহানের নির্দেশে যুবরাজ আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য অভিযানে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু মোগল সিংহাসন লাভের লড়াইয়ের জন্য আওরঙ্গজেব যখন মধ্য ভারতে চলে গেলেন, তখন শিবাজি তার এলাকা বাড়ানোর সুযোগটি গ্রহণ করেছিলেন।
শিবাজি ১৬৬০-এর দশকে ছিলেন ১০ হাজার অশ্বারোহী ও ৫০ হাজার পদাতিক সৈন্যের অধিকারী। তিনি তার বাহিনীকে হয়ে মোগল লক্ষ্যবস্তুগুলোতে মোতায়েন করলেন। শিবাজি ছিলেন গেরিলা যুদ্ধ ও হামলায় পারদর্শী। ক্ষিপ্র অভিযানে বিপুলাকার মোগল সেনাবাহিনীর তুলনায় তার বাহিনী ছিল দক্ষ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে ১৬৬৩ সালের এপ্রিলে তিনি মাত্র কয়েক ডজন লোক নিয়ে আওরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খানের বাড়িতে প্রবেশ করে তার কয়েকজন স্ত্রী ও তার ছেলেকে হত্যা করেন। ১৬৬৪ সালের জানুয়ারিতে সুরাত হামলা করেন শিবাজি। এটি ছিল পশ্চিম উপকূলের অন্যতম ব্যস্ত বন্দর। এর জনসংখ্যা ছিল দুই লাখ। শিবাজি কয়েক দিন ধরে নগরীতে লুটপাট চালান। এ সময় মোগল গভর্নর ভয়ে কাছের এক দুর্গে লুকিয়ে ছিলেন ।
এ ধরনের বিপর্যয় অসহ্যকর মনে হওয়ায় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার লঙ্ঘনের কারণে ১৬৬৫ সালের প্রথম দিকে শিবজিকে পাকড়াও করার জন্য মির্জা রাজা জয় সিংকে নির্দেশ দেন আওরঙ্গজেব। জয় সিং ছিলেন কাজওয়াহা রাজপুত ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী। যে কয়েকজন রাজপুত উত্তরাধিকার লড়াইয়ে আওরঙ্গজেবকে সমর্থন করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। জয় সিংয়ের দুই মাস ধরে পুরান্দার পাহাড়ের দুর্গ অবরোধের পর শিবাজি আত্মসমর্পণ করেন। তিনি মোগল রাষ্ট্রের জায়গিরদার হয়ে জমি, দুর্গ সমর্পণ করতে, খাজনা দিতে, মোগলদের জন্য যুদ্ধ করতে রাজি হন। শিবাজি যখন বশ্যতাস্বীকার ও সহযোগিতা করতে সম্মতি প্রদর্শন করছিলেন, আসলে তখনই মোগলদের প্রতি তার বিরোধিতা সবেমাত্র শুরু হয়।
—
শিবাজি ১৬৬৬ সালের মে মাসে সাক্ষাত করতে আগ্রায় আওরঙ্গজেবের দরবারে যান। সম্প্রতি তিনি শত্রু থেকে অভিজাতে পরিণত হয়েছিলেন। প্রত্যাশা মতোই তিনি মোগল সম্রাটকে নজরানা দেন, আনুগত্যসূচক নতজানুও হন । কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পর্ক তিক্ততায় গড়ায়। দুজনের মধ্যে মুখোমুখি সাক্ষাতের এটিই একমাত্র লিখিত ঘটনা। তবে তখন কী ঘটেছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ব্যাপক মতানৈক্য দেখা যায়। তবে বেশির ভাগের অভিমত হলো, কিছুটা কল্পিত উপেক্ষায় শিবাজি কষ্ট পেয়েছিলেন। সেটা হতে পারে সম্রাট তার গুরুত্ব স্বীকার না করায় কিংবা তাকে নিম্ন মর্যাদার অভিজাতদের মধ্যে দাঁড়াতে বলায়। এর ফলে প্রকাশ্য দরবারেই বিরোধ দেখা দেয়। কাফি খান নামের এক ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন, শিবাজি ‘আহত পশুর মতো’ চিৎকার করতে করতে ভূমিতে পতিত হলেন। আরেক ইতিহাসবিদ ভীমসেন স্যাক্সেনা বলেছেন, তিনি ‘অর্থহীন প্রলাপ বকছিলেন, ফালতু জিনিস নিয়ে কথা বলছিলেন, মনে হচ্ছিল যেন তিনি পাগলামিতে আক্রান্ত হয়েছেন।’ সৌজন্যবিধিতে এ ধরনের লঙ্ঘন বরদাস্ত করেননি আওরঙ্গজেব। ফলে শিবাজিকে পাহারায় দরবার থেকে বাইরে নিয়ে গৃহবন্দী করা হয়।
