কোনো জাতির মুখের বুলিও যে সাহিত্য সৃষ্টির বাহন হতে পারে তা অসামান্য প্রতিভা ছাড়া কারুর মনে জাগেও না। তাই বাঙলায় হিন্দুদের সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস ছিল না, জনগণের মধ্যে লৌকিক দেবতার পূজাপ্রচারের আগ্রহ ও গরজই তাদেরকে বাঙলা লেখায় প্রবর্তনা দিয়েছে। এজন্যেই হিন্দুর হাতে আমরা নিছক সাহিত্য-শিল্প পাইনি। গোড়া থেকেই কিন্তু মুসলমানরা এ কাজে হাত দেন। বাঙলার মাধ্যমে ধর্মকথা শোনানোর সাথে সাথে উত্তরভারতীয় ও ইরানী রস কথাও শোনানোর ব্যাপারে তারা উদ্যোগী হলেন। আধুনিক পাক-ভারতীয় ভাষার মধ্যে সম্ভবত বাঙলা ভাষাতেই প্রথম রোমান্স রচিত হয়। এ কৃতিত্ব ইউসুফ জোলেখা রচয়িতা শাহ মুহম্মদ সগীরের (১৩৮৯-১৪০৯ খৃ.)। কিন্তু এ প্রয়াস দেখা দেয় সেকালের মুষ্টিমেয় কয়জনের মধ্যে মাত্র। জনসাধারণ তাদের দিকে চেয়ে বসে ছিল না। তাদের সাহিত্যের ভাষা না থাক, মুখের বুলি ছিল। আরো ছিল জৈব-রস পিপাসা ও হৃদয়-নিঃসৃত বক্তব্য। তাই শিল্প সৃষ্টির মহৎ আদর্শে নয়, বক্তব্য প্রকাশেরই জৈব-প্রয়োজনে তাদের নিজ নিজ আঞ্চলিক বুলিতে অঞ্চলবাসীর উদ্দেশে গান গাথা ছড়া বচন রূপকথা ও রসবার্তা তৈরি করে তারা মুখে মুখে প্রচার করতে থাকে। এগুলোই আমাদের আধুনিক সংজ্ঞায় লোক সাহিত্য বা পল্লী সাহিত্য। বহু মুখের স্পর্শে এগুলো রূপ ও রস বদলেছে, তাই এসব ব্যক্তিক রচনা আর নেই। এ কারণেই গুলোকে গণ রচনা বলে নির্দেশ করা হচ্ছে আজকাল। দেশের লেখ্যভাষায় রচিত নয় বলে এসব রচনা কোনোকালেই অঞ্চলের সীমা অতিক্রম করে দেশময় ব্যাপ্ত হতে পারেনি। আগেই বলেছি পল্লী সাহিত্য সাহিত্য সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস প্রসূত নয়। অনুভূতির আন্তরিকতা ও গভীরতাই এগুলোকে সাহিত্যের স্তরে উন্নীত করেছে, আর আজকাল মর্যাদা পাচ্ছে সাহিত্য হিসেবে। আমাদের মঙ্গলকাব্যও বলেছি দেবতার মাহাত্ম্য প্রচার প্রয়াসের ফল। তবু আনুষঙ্গিক ভাবে তাতে সাহিত্যরস ও সাহিত্যশিল্প গড়ে উঠেছে। তাই ওগুলোও সাহিত্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
অতএব অন্যান্য দেশের বুলি যেমন ধর্মীয় মতবাদ প্রচারের মাধ্যম রূপে বা গেঁয়োলোকের ভাব-ভাবনা ও অনুভূতি-উপলব্ধি প্রকাশের বাহনরূপে ক্রমে সাহিত্যের শালীন ভাষায় উন্নীত হয়েছে, আমাদের বাঙলা বুলির সাহিত্যের ভাষায় রূপান্তরের ইতিহাসও সেরূপ। এর জন্মতারিখ জানা নেই, তবে এর জন্মপদ্ধতি ও জন্মের ইতিকথা আঁচ করা যায় সহজেই।
এবার যে-বাঙালি এ সাহিত্য সৃষ্টি করেছে তাদের মন-মননের সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করা যাক। বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি বুঝবার জন্যে বাঙালিকে তথা বাঙালির চরিত্র জানা আবশ্যক। কেননা, জীবের বিশেষত মানুষের কর্ম ও আচরণে তার আন্তর সত্তার ( Innerself) নিবিড়তম প্রকাশ ঘটে। মানুষের কর্ম ও আচরণ তার অভিপ্রায়েরই বহিঃপ্রকাশ। আর অভিপ্রায় হচ্ছে মন-মনন প্রসূত। এবং ব্যক্তির বা জাতির মন-মনন গড়ে উঠে তার Heredity (জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৃত্তি-প্রবৃত্তি) ও environment-কে (পরিবেশ) ভিত্তি করে। যেহেতু মানুষের কর্ম ও আচরণ তার ভাব-চিন্তা ও অনুভূতি উপলব্ধিরই প্রতিমূর্তি এবং যেহেতু ভাষা-সাহিত্যও জাতির কর্ম ও আচরণের অন্তর্গত, সেহেতু ভাষা ও সাহিত্য ব্যক্তি বা জাতির মানস-সন্তান-মানস ফসল। আবার আমরা এও জানি প্রত্যেক ক্রিয়ারই কারণ রয়েছে, তেমনি সব কারণেরই ক্রিয়া আছে। কিন্তু ক্রিয়ার কারণ একাধিক হতে পারে। যেমন কোথাও যদি আমরা দূর থেকে দেখি যে আমাদের অপরিচিত একটি ছেলে অপর একটি ছেলের পিঠে একটি ঘুষি বসিয়ে দিল তাহলে এ ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করা আমাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না। কেননা এর তিনটি কারণ থাকতে পারে। এক. হয়তো এরা বন্ধু, রসিকতাচ্ছলে একে অপরকে ঘুষি মারল; দুই. হয়তো ঘুষি খাওয়া ছেলেটি আগে ওকে চটিয়েছে তাই ও প্রতিশোধ নিল; তিন. হয়তো ঘুষিদাতা ছেলেটি অন্য একটি ঘটনার বর্ণনাচ্ছলে ঘুষিটি কোথায় কেমন করে দেয়া হয়েছিল তারই বাস্তব দৃষ্টান্ত দিচ্ছে। কাজেই ঘটনার বিশ্লেষণে ও বিচারে পূর্বইতিহাস জানা আবশ্যিক। কারণ আমরা জানি ব্যক্তিকে না জানলে তার কর্ম ও আচরণের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তার ফলে ব্যক্তির কর্ম ও আচরণের গুরুত্ব লঘুত্ব ও যাথার্থ্য বিচারেও ভুল হয়। যাকে সত্যবাদী বলে জানি, সে একটা প্রায় অসম্ভব কথা বললেও পূর্বধারণাবশে বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হয়; আর মিথ্যাবাদীর মুখের সত্যকথাও যাচাই না করে প্রত্যয় করা সম্ভব হয় না। কাজেই বাঙলাভাষা ও সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি তথা স্বরূপ জানতে হলে বাঙালির চরিত্রও জানা দরকার। আর চরিত্র জানতে হলে অতীতে-ঘটা পৌনঃপুনিক ক্রিয়া ও আচরণের সাধারণ লক্ষণ বিচারেই তা সম্ভব।
আগেই বলেছি, বাঙালি সঙ্কর জাতি। নানা গোত্রের রক্তের মিশ্রণের ফলে বিভিন্ন চারিত্রিক উপাদানের বিচিত্র সমন্বয় ঘটেছে তাদের জীবনে। এর ফলে বাঙালি চরিত্রে নানা বিরুদ্ধগুণের সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়। ভাবপ্রবণতা ও তীক্ষ্ণবুদ্ধি, ভোগলিপ্সা ও বৈরাগ্য, কর্মকুণ্ঠা ও উচ্চাভিলাষ, ভীরুতা ও অদম্যতা, স্বার্থপরতা ও আদর্শবাদ, বন্ধনভীরুতা ও কাঙালপনা প্রভৃতি ও দ্বান্দ্বিক গুণই বাঙালি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
