জেনারেল বললেন, এখন আমি যে নতুন মাথাগুলো জমিয়েছি সেগুলো আপনাকে দেখাতে চাই। আমার সঙ্গে লাইব্রেরিতে আসবেন কি?
রেনসফর্ড বলল, আমি আশা করছি, আজকে রাত্রের মতো আপনি আমায় ক্ষমা করবেন। আমার শরীরটা আদপেই ভালো যাচ্ছে না।
জেনারেল উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বললেন, আহা, তাই নাকি! কিন্তু সেইটেই ভো স্বাভাবিক এতখানি দীর্ঘ সাঁতার কাটার পর। আপনার প্রয়োজন রাত্রিতর শান্তিতে সুন্দ্রিা। কাল তা হলে আপনার মনে হবে, আপনি যেন নতুন মানুষ হয়ে গিয়েছেন। আমি বাজি ধরছি। তখন আমরা শিকারে বেরুকী বলেন? কালকের শিকার উত্তম হবে বলেই আমি আশা করছি
রেনসফর্ড তখন তাড়াতাড়ি সে ঘর ছেড়ে বেরুচ্ছে।
জেনারেল পিছন থেকে গলা তুলে বললেন, আজ যে আপনি আমার সঙ্গে শিকারে বেরুতে পারছেন না তার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে। আজ ভালো শিকারের আশা আছে-বড় সাইজের, তাগড়া নিগ্রো। দেখে তো মনে হচ্ছে অন্ধিসন্ধি জানে– আচ্ছা, গুডনাইট, মিস্টার রেনসফর্ড! আশা করি রাত্রিটা পুরো বিশ্রাম পাবেন।
বিছানাটা ছিল খুব ভালো, বিছানায় পরার পাজামা-কুর্তা সবচেয়ে নরম রেশমের তৈরি, তার সর্ব পেশি-মায়ুতে ক্লান্তি, কিন্তু তবুও ন্দ্রিার ওষুধ দিয়ে সে তার মগজটাকে শান্ত করতে পারল না পড়ে রইল দুটো খোলা চোখ মেলে। একবার তার মনে হল, তার ঘরের সামনের করিডরে কার যেন চুপিসাড়ে চলার শব্দ শুনতে পেল। সে দরজাটা খোলার চেষ্টা করল; খুলল না। জানালার কাছে গিয়ে সে বাইরের দিকে তাকাল। তার ঘরটা ছিল উঁচু টাওয়ারগুলোর একটাতে। বাড়ির আলো তখন নিভে গিয়েছে। নীরব, অন্ধকার। শুধু আকাশে একফালি পার চাঁদ; তারই ফ্যাকাসে আলোতে সে আঙিনায় আবছায়া দেখতে পাচ্ছিল। কতকগুলি নিস্তব্ধ কালো আকারের কী যেন সেখানে আনাগোনা করে আলো-ছায়ার আলপনা কাটছিল; কুকুরগুলো জানালাতে তার শব্দ শুনতে পেয়ে কিসের যেন প্রতীক্ষায় তাদের সবুজ চোখ তুলে তাকাল। রেনসফর্ড বিছানায় ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ার জন্য সে বহু পদ্ধতিতে চেষ্টা করল। তার পর যখন কিছুটা ফল পেয়ে, পাতলা ঘুমে ঝিমিয়ে পড়েছে ঠিক ভোরের দিকে তখন অতিদূর জঙ্গলের ভিতর সে পিস্তল ছোঁড়ার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেল।
দুপুরের খাওয়ার পূর্বে জেনারেল জারফ দেখা দিলেন না। লাঞ্চে যখন এলেন তখন তার পরনে গ্রামাঞ্চলের জমিদারের নিখুঁত টুইডের স্যুট। তিনি রেনসফর্ডের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেনারেল বললেন, আর আমার কথা যদি তোলেন, তবে বলি আমার ঠিক ভালো যাচ্ছে না। আমার মনে দুশ্চিন্তা, মিস্টার রেনসফর্ড। কাল রাত্রে আমি আমার পুরনো ব্যারামের চিহ্ন অনুভব করলুম।
রেনসফর্ডের চাউনিতে প্রশ্ন দেখে জেনারেল বললেন, একঘেয়েমি। বৈচিত্র্যহীনতার অরুচি।
আপন প্লেটে আবার খানিকটা ক্রেপ স্যুজে তুলে নিয়ে জেনারেল বুঝিয়ে বললেন, কাল রাত্রে ভালো শিকার হয়নি। লোকটার মাথা গুলিয়ে গিয়েছিল। সে এমন সোজাসুজি চলে গিয়েছিল যে, তাতে করে কোনও সমস্যারই উদ্ভব হল না। খালাসিগুলোকে নিয়ে এই হল মুশকিল। একে তো আকাট, তায় আবার বনের ভিতর চলাফেরার কৌশল জানে না। নিরেট বোকার মতো এমন সব করে যা দেখামাত্রই স্পষ্ট বোঝা যায়। ভারি বিরক্তিজনক। আরেক গেলাস শাবলি চলবে কি মিস্টার রেনসফর্ড?
রেনসফর্ড দৃঢ়কণ্ঠে বললে, জেনারেল, আমি এখুনি এই দ্বীপ ত্যাগ করতে চাই।
তাঁর দুই ঝোঁপ-ভুরু উপরের দিকে তুললেন; মনে হল তিনি যেন আঘাত পেয়েছেন। আপত্তি জানিয়ে বললেন, সে কী দোস্ত! আপনি তো সবে এসেছেন। শিকারও তো করেননি।
রেনসফর্ড বলল, আমি আজই যেতে চাই। তার পর দেখে, জেনারেলের কালো চোখদুটো তার দিকে মড়ার চোখের মতো একদৃষ্টে তাকিয়ে তাকে যেন যাচাই করে নিচ্ছে। হঠাৎ জেনারেল জারফের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
বোতল থেকে প্রাচীন দিনের শাবলি ঢাললেন রেনসফর্ডের গেলাসে। বললেন, আজ রাত্রে আমরা শিকারে বেরুব– আপনাতে-আমাতে।
রেনসফর্ড ঘাড় নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বলল, না জেনারেল, আমি শিকারে যাব না।
জেনারেল ঘাড়দুটো তুলে নামিয়ে অসহায় ভাব দেখালেন। বাগানের কাঁচের ঘরে বিশেষ করে ফলানো একটি আঙুর মোলায়েমসে খেতে খেতে বললেন, আপনার অভিরুচি, দোস্ত! কী করবেন, না করবেন সেটা সম্পূর্ণ আপনার হাতে। তবে যদি অনুমতি দেন তবে বলব, শিকার-খেলা সম্বন্ধে ইভানের ধারণার চেয়ে আমার ধারণা আপনার অধিকতর মনঃপূত হবে।
যে কোণে ইভান দাঁড়িয়েছিল সেদিকে তাকিয়ে জেনারেল মাথা নাড়লেন। দৈত্যটা সেখানে তার পিপের মতো পুরু বুকের উপর দু বাহু চেপে কুটি-কুটিল নয়নে তাকাচ্ছিল।
রেনসফর্ড আর্তকণ্ঠে বলল, আপনি কি সত্যি বলতে চান–।
জেনারেল বললেন, প্যারা দোস্ত! আমি কি আপনাকে বলিনি, শিকার সম্বন্ধে আমি যা-ই বলি না কেন, সেটা সত্য সত্য বলি। কিন্তু এটা আমার খাঁটি অনুপ্রেরণা। আসুন, আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে এমন একজন প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশে আমি পান করি।
জেনারেল তার গেলাস উঁচু করে তুলে ধরলেন; কিন্তু রেনসফর্ড তার দিকে শুধু স্থির নয়নে তাকিয়ে রইল।
সোৎসাহে জেনারেল বললেন, আপনি দেখবেন এ শিকার শিকারের মতো শিকার। আপনার বুদ্ধি আমার বুদ্ধির বিপক্ষে। আপনার শক্তি, আপনার লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমার বিরুদ্ধে। মুক্তাকাশের নিচে দাবা খেলা! এবং যে বাজি ধরা হবে তার মূল্যও কিছু কম নয়–কী বলেন?
