সোজাসুজি পরিচয় সবচেয়ে ভালো পরিচয়। একটি সামান্য উদাহরণ দিই। একখানি পুস্তকের প্রতি আমার ভক্তিশ্রদ্ধার অন্ত নেই– এ সম্বন্ধে পূর্বেও ইঙ্গিত করেছি- বইখানি স্বর্গীয় লোকমান্য বালগঙ্গাধর টিলকের গীতারহস্য।
লোকমান্য গীতার এই নবীন ভাষ্য মারাঠিতে লিখেছিলেন এবং তার এক অতি জঘন্য ইংরেজি অনুবাদ আছে
একদম অখাদ্য অপাঠ্য। কিন্তু বৃদ্ধ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যৌবনে-শেখা, মরচে-ধরা, জাম-পড়া তার মারাঠিজ্ঞানকে ঝালিয়ে নিয়ে বাঙলায় যে অনুবাদখানি করেছেন তার প্রশংসা করতে গিয়ে আমার অক্ষম লেখনী বার বার তার দুর্বলতা নিয়ে লজ্জিত হয়। এ তো অনুবাদ নয়, এ যেন বাঙালি টিলক বাঙলায় লিখেছেন। মারাঠির সঙ্গে মিলিয়ে এ অধম সে পুস্তক বহুবার অধ্যয়ন করেছে, প্রতিবার মনে মনে তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে, বন্ধুবান্ধবকে সে কেতাব-ই-কুত্ত্ব-মিনার পড়তে অনুরোধ করেছে, এবং সত্যপীর ছদ্মনামে সে গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণের জন্য আনন্দবাজারে বিস্তর কান্নাকাটি করেছে।
এই বই পড়লে গীতা নতুন করে চেনা যায় সেকথা অতি সত্য; কিন্তু উপস্থিত আমার নিবেদন, এ গ্রন্থ পড়লে মহারাষ্ট্র দেশকেও চেনা যায়। সংস্কৃত আজ সর্বত্রই মুমূর্ষ, কিন্তু কতখানি সংস্কৃত-চর্চা থাকলে পর এরকম গ্রন্থ বেরুতে পারে সেটা এ বই পড়লে মহারাষ্ট্রের সেই ক্ষুদ্র পল্লি চোখের সামনে ভেসে ওঠে যেখানে বালক বালগঙ্গাধর সংস্কৃত-চর্চার মাঝখানে মানুষ হলেন। আমার গর্ব, আমি সে গ্রামে গিয়েছি, সে তীর্থ দেখেছি।*[** এ প্রবন্ধ আমি বহু বৎসর পূর্বে, ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে লিখি, কিন্তু তখনও রাষ্ট্রভাষা সমস্যা তার রুদ্রতম রূপ ধারণ করেনি বলে আমি জানতুম একদিন নেবেই নেবে, তাই আগেভাগেই সাবধানবাণী শোনাতে চেয়েছিলুম– (দক্ষিণ ভারতে হিন্দির বিরুদ্ধে যে-সংগ্রাম প্রয়োজনাতীত তাণ্ডব রূপ ধারণ করে সে তো তার বহু পরের ঘটনা!) আমার প্রিয় পাঠকবর্গ সমস্যাটির গুরুত্ব অনুভব করতে পারেননি। ফলে, উৎসাহভাবে, আমি প্রবন্ধটিকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে পারিনি।]
সরলাবালা
সরলাবালার অমরাত্মার উদ্দেশে বার বার প্রণাম জানাই।
বাঙলার সংস্কৃতি জগতে তিনি এতই সুপরিচিতা যে, বহু কীর্তিমান লেখক তার জীবনী নিয়ে আলোচনা করবেন, তার বহুমুখী প্রতিভার অকুণ্ঠ প্রশংসা করবেন, তার সরল জীবনাদর্শ তিনি দেশের-দশের চিন্ময় জগতে যে কতখানি সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন, তা দেখে বারবার বিষয় মানবেন।
কিন্তু আমরা যারা তার স্নেহ, তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছি আমাদের শোকের অন্ত নেই যে, আজ আমরা যাকে হারালুম, তার আসন নেবার মতো আর কেউ রইলেন না। সাহিত্য জগতে তিনি ছিলেন আমাদের স্নেহময়ী মাতার মতো। আমরা জানতুম, যে সাপ্তাহিক-দৈনিক পত্রিকার জগতে আমরা বিচরণ করি, সেখানে নানা বাধাবিঘ্ন আছে, কিন্তু একথা আরও সত্যরূপে জানতুম যে, শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের ফরিয়াদ-আর্তনাদ এমন একটি মাতার কাছে নিয়ে যেতে পারব, যেখানে সুবিচার পাবই পাব।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তার সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয় ছিল না।
১৯৪৪ ইংরেজিতে আমি সত্যপীর নাম নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় পরবর্তী স্তম্ভে প্রবন্ধ লিখতে আরম্ভ করি। দুটি লেখা প্রকাশিত হওয়ার পরই সরলাবালার এক আত্মীয়, আমার বন্ধু এসে আমাকে জানালেন, আমার লেখা তার মনঃপূত হয়েছে।
নিজেকে ধন্য মনে করেছিলুম। ওইদিনই আমার আত্মবিশ্বাসের সূত্রপাত।
তাই আজ স্বৰ্গত সুরেশচন্দ্র মজুমদার মহাশয়ের কথাও বার বার মনে পড়ছে। তার পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরলাবালার অনুমোদন না পেলে বাঙালিকে আমার সামান্য যেটুকু বলার ছিল, সেটুকু বলা হত না।
একটুখানি ব্যক্তিগত কথা বলা হয়ে যাচ্ছে, সেটা হয়তো দৃষ্টিকটু ঠেকবে, কিন্তু আজ যদি আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা সর্বজনসমক্ষে উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ না করি, তবে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ-নেমকহারামের আচরণ হবে। বরঞ্চ সে-আচরণ দৃষ্টিকটুকর হোক।
একথা সত্য, আনন্দবাজার, হিন্দুস্থান, দেশ পত্রিকায় আমার একাধিক বন্ধু ও স্নেহভাজন ব্যক্তি ছিলেন এবং তাদের একজনের– এর কথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি–মাধ্যমে সুরেশচন্দ্রের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। কিন্তু একথা আরও সত্য যে, এরা সকলেই সহৃদয় বলে আমার মতো আরও বহু বহু অচেনা-অজানা লেখককে তার কাছে নিয়ে গিয়েছেন। সুরেশচন্দ্র যেমন একদিকে পাকা জহুরির মতো কড়া সমালোচক ছিলেন, অন্যদিকে ঠিক তেমনি অতিশয় সহৃদয় ব্যক্তি ছিলেন। এই দ্বন্দ্বের সমাধান না করতে পেরে তিনি অনেক সময় অভাজন জনকেও গ্রহণ করতেন– আমি তাদেরই একজন।
সুরেশচন্দ্রকে আমি বাঘের মতো ডরাতুম, যদিও খুব ভালো করেই জানতাম যে, তাকে ভরাবার কণামাত্র কারণ নেই। কঠিন কথা দূরে থাক–যে ক বৎসর আমি তাঁর স্নেহ-রাজত্বে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলুম, তার মধ্যে একদিন একবারও তিনি আমার লেখার সমালোচনা করেননি, কোনও আদেশ বা উপদেশও দেননি।
মনে পড়ছে, ১৯৪৪-৪৫ সালে কলকাতায় একবার একটা অশান্তির সৃষ্টি হয়। আফটার-এডিট না লিখে লিখলুম একটি কবিতা। মনে ভয় হল, আফটার-এডিটের এরজাস তো কবিতায় হয় না! তাই এ নিয়ে গেলুম সুরেশবাবুর কাছে স্বহস্তে। তিনি মাত্র দুটি ছত্র পড়েই প্রেমে পাঠিয়ে দিলেন। ওরে- একে চা দে, আর কী দিবি দে, আর– বাক্য অসমাপ্ত রেখে তিনি ফের কাজে মন দিলেন।
