আর ভাষার দিক দিয়ে চেখফ মোপাসঁকেও ছাড়িয়ে যান। টলস্টয় ফ্লবেরের চেয়ে অনেক বড় স্রষ্টা এবং চেখফ যদিও টলস্টয়ের শিষ্য নন তবু তিনি বহু বৎসর ধরে টলস্টয়ের সাহচর্য ও উপদেশ পেয়েছিলেন। টলস্টয় স্বয়ং গর্কির চেয়ে চেখফকে পছন্দ করতেন বেশি-তিনি নাকি একবার গর্কিকে বলেছিলেন, চেখফ মেয়ে হলে তিনি তাঁর কাছে নিশ্চয়ই বিয়ের প্রস্তাব পাড়তেন।
রবীন্দ্রনাথের গোড়ার দিকের গল্পগুলি বড় ঢ়িলে। প্রমাণ করা কঠিন, কিন্তু আমার মনে হয়, এই ঢ়িলে ভাব তার প্রথম কাটল মোপাসঁর গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের গল্পে মোপাসঁরই মত ঠাস বুনুনি দেখতে পাওয়া যায়, আর কাঠামোটাও হরেন্দরে মোপাসার। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মত লেখক আপনি বৈশিষ্ট্য বর্জন করে লিখবেন-তা সে কাচা লেখাই হোক আর পাকা লেখাই হোক—সে কথা অনায়াসে অস্বীকার করা যায়। রবীন্দ্রনাথের গল্প মোপাসঁ, চেখফ দুজনের গল্পকেই হার মানায় তার গীতিরস দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত গল্পটি কেমন যেন সঙ্গীতের কোনো এক রাগে বঁধা। এখানে সংস্কৃত নাটকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মিল রয়েছে। মৃৎশকটিকা, শকুন্তলা, রত্নাবলী নাটক গ্ৰীক কাঠামোতে ফেলা যায়। সত্য; কিন্তু এগুলিতে যে গীতিরস রয়েছে, গ্ৰীক নাটকে তো নেই-তই আমরা সংস্কৃত নাটকে যে আনন্দ পাই, গ্ৰীক নাটকে সেটি পাই নে।
রবীন্দ্ৰনাথ বিশেষ বয়সে শেলি, কীটসের প্রভাবে পড়েছিলেন সত্য, কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য, রবীন্দ্রনাথ সে প্রভাব একদিন সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। গল্পের বেলাতেও রবীন্দ্রনাথ একদিন মোপাসার প্রভাব ঝেড়ে ফেলে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। রবীন্দ্ৰনাথ শেষের দিকের গল্পগুলিতে কি যেন এক অনির্বচনীয়ের প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। ‘মিস্টিক’ কথাটাতে সব কিছুই ঢাকা পড়ে যায় বলে শব্দটা ব্যবহার করতে বাধো বাধো ঠেকে; কিন্তু মানব-চরিত্রের আলো-অন্ধকারের আবছায়া আঁকুবীকু, মানব-চরিত্রের যে দিক দৈনন্দিন জীবনে আমাদের চোখে পড়ে না, মানুষকে যে সব সময় তার বাক্য আর আচরণ দিয়েই চেনা যায় না মানুষের সেই দুজ্ঞেয় অন্তঃস্তল রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছিলেন আধা-আলোরই ভাষা এবং ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করতে। সেখানে রবীন্দ্ৰনাথ এক, মোপাসঁ, চেখফের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র সেখানে সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।
রেডুকৎসিয়ো আড আবসু্ররডুম
গিয়ে দেখলুম ক্লাবের প্রত্যন্ত প্রদেশে সেই নিমগাছের তলায় চীনা বন্ধু, গুণী অধ্যাপক উ বসে আছেন। নিমপাতা এখন বর্ষণ রসে টৈটস্কুর বলে টেবিলের উপর ঝরে পড়ে না। তাই উ বকুল ফুল দিয়ে আল্পনা আঁকছেন।
আমি চীনা কায়দায় ঝুঁকে ঝুঁকে দুলতে দুলতে বললুম, ‘জয় হিন্দ!’
অধ্যাপক মৃদু হাস্য করে মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘আলাইকুম সালাম, আজ তোমাদের ইদের পারব না?’
আমি বললুম, ‘ছুটির বাজার, তাই আপনার কাছ থেকে তত্ত্বকথা শুনতে এলুম।’
‘তৎপূর্বে বল, এ ফুলের নাম কি?’
মূল বক্তব্যের সঙ্গে এ প্রশ্নোত্তরের কোনো যোগ নেই। তবু বাঙালির মনে বিমলানন্দের সৃষ্টি হবে বলে নিবেদন করছি।‘
বললুম, ‘বাঙলা, মারাঠী, সংস্কৃতে ‘বকুল’, হেথাকার নেটিভ ভাষাতে ‘মোলশী’।*
অনেকক্ষণ ধরে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বললেন, ‘বকুল, মোলশী,-মোলশী বকুল। উহুঁ, বকুলটিই মিষ্টি।’ বাঙালির ছাতি তিন বিঘৎ ফুলে উঠল তো?’
আমি বললুম, ‘মিষ্টি নামই যদি রাখবেন তবে ‘প্ৰাণনাথ’ বলে ডাকলেই পারেন।’
ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘সে আবার কি?’
‘প্ৰাণনাথ মানে, মাই ডার্লিং।’
‘আরো বুঝিয়ে বলো।’
আমি বললুম, ‘আমি বাঙাল। আমারই দেশের এক ‘চুকুমবুদাই’ অর্থাৎ এদিকে মুখচোরা ওদিক চটে যায় ক্ষণে ক্ষণে, এসেছে কলকাতায়। গেছে বেগুন কিনতে। দোকানীকে বললে, ‘দাও তো হে, এক সের বইগন।’ দোকানী পশ্চিম বাঙলার লোক।‘বেগুনে’র উচ্চারণ ‘বইগন’ শুনে একটুখানি গর্বের ঈষৎ মৌরী-হাসি হেসে শুধালো, ‘কি বললে হে জিনিসটার নাম?’ বাঙালি গেছে চটে, উচ্চারণ নিয়ে যত্রতত্র এরকম ঠাট্টা-মস্কার করার মানে?–চতুর্দিকে আবার বিস্তর ‘ঘটি’ দাঁড়িয়ে। তেড়েমেড়ে বলল, ‘বাইগন কইছি, তো বেশ কইছি হইছে কি?’
দোকানী আরেক দফা হাম্বড়াই আত্মম্ভরিতার মৃদু হাসি হেসে বললে, ‘ছোঃ, বইগন, বইগন। দেখো দিকিনি আমাদের শব্দটা কি রকম মিষ্টি—বেগুন, বেগুন।’
বাঙাল বলল, ‘মিষ্টি নামই যদি রাখবা, তবে ‘প্ৰাণনাথ’ ডাকলেই পারো। দাও। তবে এক সেরা প্ৰাণনাথ। প্ৰাণনাথের সেরা কত? ছ’ পয়সা না। সাত পয়সা?’
ঊ প্রাণভরে হাসলেন উচ্চস্বরে। তারপর চোখ বন্ধ করে মিটমিটিয়ে। সর্ব শেষে চেশায়ার বেড়ালের হাসিটার মত ‘আকাশে আকাশে রহিল ছড়ানো সে হাসির তুলনা।’
সুশীল পাঠক, তুমি রাগত হয়েছ, বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। এ বাসি মাল আমি পরিবেশন করছি কেন? এ গল্প জানে না কোন মৰ্কট? পদ্মার এ-পারে কিংবা হে-পারে?
তিষ্ঠ, তিষ্ঠ। এ গল্পের খেই ধরে চীনা-গুণী সেদিন তত্ত্ব বিতরণ করেছিলেন বলেই এটাকে ‘এনকোর’ করতে হল।
***
হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ গল্পে কি তত্ত্ব লুক্কায়িত আছে?’
খাইছে। আমি করজোড় বললুম, ‘আপনিই মেহেরবাণী করুন।’
বললেন, ‘রেডুকৃৎসিয়ে আড় আবসুভূমি’ কাকে বলে জানো?
আমার পেটের এলেম আপনারা বিলক্ষণ জানেন। কাজেই বলতে লজা নেই, অতিশয় মনোযোগের সহিত গ্ৰীবাকণ্ডুয়নে নিযুক্ত হলুম।
