পরিশেষে আর একটি কথা নিবেদন করি। বাঙালী মহিলা দ্বিজবৰ্ণা হইলে নামান্তে দেবী লেখেন। যাঁহারা দ্বিজ নহেন তাহারা সেকালে দাসী লিখিতেন, এখন স্বামীর পদবী বা অনূঢ়া হইলে পিতৃপদবী লেখেন। যাহারা দ্বিজাতির দেবত্বের দাবি করেন তাহারা দেবী লিখুন, কিছু বলিবার নাই। কিন্তু যেসকল মহিলা বংশগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করেন না তাহারা কেন নামের শেষে দেবী লিখিয়া দ্বিজেতরা নারী হইতে পৃথক গণ্ডিতে থাকিবেন? অবশ্য নারী মাত্রেই যদি দেবী হন। তবে আপত্তির কারণ নাই, বরং একটা সুবিধা হইতে পারে। অনাত্মীয়া অথচ সুপরিচিতা মহিলাকে মাসী পিসী দিদি বউদিদি বলিয়া অথবা নাম ধরিয়া ডাকা চলে। কিন্তু অল্প পরিচিতার সঙ্গে হঠাৎ সম্বন্ধ পাতানো যায় না, কেবল নাম ধরিয়া ডাকাও বেয়াদবি। যদি নামের সঙ্গে দেবী যোগ করিয়া ডাকার প্রচলন হয় তবে বাংলা কথাবার্তায় শ্রুতিকটু মিস আর মিসিস বাদ দেওয়া চলে। কুমারী বা বিবাহিতা, তরুণী বা বৃদ্ধা যাহাই হোন, ‘শুনছেন অমুকা দেবী’ বলিয়া ডাকিলে দোষ কি?
প্রার্থনা
রাম চাকরির জন্য দরখাস্ত পাঠিয়েছে। রামের মা তার মাথায় একটি টাকা ঠেকিয়ে মনে মনে মা কালীর কাছে মানত জানিয়ে টাকাটি বাক্সে তুলে রাখলেন। এই মানত যদি ভাষায় বিস্তারিত করা যায় তবে এইরকম দাঁড়ায়।–হে মা কালী, চাকরিটি আমার রামকে দিও। ছেলের বিয়ে দিয়েছি, এখন রোজগার না করলে চলবে কেন। মা, আমি শুধু হাতে তোমার কাছে আসিনি, এই দেখ একটি টাকা নজর দিচ্ছি। আমার ছেলে প্রথম মাইনে পেলেই তা থেকে যা পারি খরচ করে তোমার পুজো দেব, এই টাকাটি তারই বায়না।
সম্ভবত রামের মায়ের মনের কথা শুধু এইটুকু, কিন্তু যদি সাবধানে জেরা করা হয় তবে তার অন্তরের গহন প্রদেশ থেকে আরও কিছু বার হবে। এই জেরা আপনার আমার সাধ্য নয়, কারণ রামের মা ধর্মশীলা, ঠাকুর দেবতার ব্যাপারে কোনও আজগবী প্রশ্ন করলেই তিনি ক্ষেপে উঠবেন। তাঁকে জেরা করতে পারেন কেবল একজন, স্বয়ং মা কালী। দেবীকৃত প্রশ্নের অর্থ বোঝবার শক্তি হয়তো রামের মায়ের নেই, তিনি ঘাবড়ে গিয়ে বলতে পারেন–মা, আমি মুখখু মানুষ, কি বলছ কিছুই বুঝছি না, অপরাধ নিও না। ধরে নেওয়া যাক যে মা কালী নাছোড়বান্দা, তিনি রামের মায়ের বোধগম্য ভাষায় জেরা করছেন এবং আমাদের বোধগম্য ভাষায় তা প্রকাশ করছেন।–
হ্যাঁগা রামের মা, ওই যে টাকাটা ছেলের মাথায় ঠেকিয়ে তুলে রাখলে, ওটা কার জন্যে?
তোমারই জন্যে মা। শুধু একটি টাকা নয়, চাকরিটি হলে আরও অনেক কিছু দেব।
চাকরি যদি না হয় তা হলেও টাকাটা আমায় দেবে তো?
তা কি আর দিতে পারি মা, গরিব মানুষ। চাকরিটি হলে গায়ে লাগবে না।
ও, আমাকে লোভ দেখাবার জন্যে টাকাটা বার করেছ?
সেকি কথা মা! এই যে দরখাস্ত করা ইস্তক রোজ মন্দিরে গিয়ে শ্রীচরণে পাঁচটি করে পঞ্চমুখী জবাফুল দিচ্ছি তা তো আর ফেরত নেব না।
চাকরি না হলেও রোজ ফুল দিয়ে যাবে?
তা কোত্থেকে দেব মা, পাঁচটি ফুল দু পয়সা।
ও, এই ফুলগুলো আমাকে ঘুষ দিচ্ছ?
ঘুষ বলতে নেই মা, বল পুজো।
আচ্ছা রামের মা, শুনেছ বোধ হয় যে এই চাকরিটার জন্য দু হাজার দরখাস্ত পড়েছে। তোমাদের তো কিছু বিষয় সম্পত্তি আছে, যেমন করে তোক। চলে যাচ্ছে। কিন্তু রামের চেয়ে গরিব উমেদার অনেক আছে, তাদের কেউ যদি চাকরিটি পায় তবে খুশী হও না?
এ যে ছিষ্টিছাড়া কথা মা। থাকলই বা গরিব উমেদার, আমার ছেলে আগে না যেদো মেধো আগে?
আচ্ছা, ওই যে চৌধুরীরা আছে, মস্ত বড়লোক, তাদের মেজো ছেলে হারু যদি চাকরিটা পায় তো কেমন হয়? তার মা এর মধ্যেই ঘটা করে আমার পুজো দিয়েছে।
তা হেরোকে চাকরি দেবে বইকি মা, তারা যে বড়লোক, তোমাকে অনেক ঘুষ খাইয়েছে।
অর্থাৎ তোমার ঘুষ খেয়ে যদি আর সবাইকে ফাঁকি দিই তাতে তুমি খুশী হবে, আর যদি অন্যের ঘুষ খেয়ে তোমাকে ফাঁকি দিই তবে চটবে। আচ্ছা, এত লোক যখন উমেদার, আর অনেকেই আমার কাছে মানত করেছে, তখন চাকরিটা কাকে দেওয়া যায় বল তো? একচোখা হয়ে রামকেই দিতে বল নাকি?
তাই বলছি মা।
কিন্তু সকলেই তো একচোখা হতে বলছে, কার দিকে চোখ দেব?
অত শত জানি না মা, যা ভাল বোঝ কর।
তাই তো চিরকাল করি।
.
চারুবালা শিক্ষিত মহিলা, রামের মায়ের মতন তার অন্ধ সংস্কার নেই। তিনি আগে ভগবানের খোঁজখবর নিতেন না, কিন্তু সম্প্রতি বিপদে পড়ে প্রার্থনা করছেন।–ভগবান, আমার স্বামীকে রোগমুক্ত কর। লোকটা আমাকে অনেক জ্বালিয়েছে, কিন্তু এখন আর আমার কোন রাগ নেই, সে সেরে উঠুক–শুধু এইটুকুই চাই। যদি মরে যায় তবে আমার সর্বনাশ হবে, ছেলেমেয়েরা খাবে কি? গয়না বাড়ি জিনিসপত্র সব বেচে ফেলতে হবে। দয়াময়, আমি অন্যায় আবদার করছি না, কাকেও বঞ্চিত করে নিজের ভাল চাচ্ছি না। শুধু আমার স্বামীকে সারিয়ে দাও, তাতে বিশ্বসংসারের কোনও ক্ষতি হবে না।
এবারেও সওয়াল-জবাব আমরা কল্পনা করতে পারি।–
আচ্ছা চারুবালা, তুমি কি করে জানলে যে তোমার স্বামী বেঁচে উঠলে কারও ক্ষতি হবে না? সে মরলেই তার চাকরিটা যোগেন ঘোষাল পাবে, বেচারা অনেক কাল আশায় আশায় আছে। আর তোমাদের এই বাড়িটার উপর চৌধুরীদের নজর আছে, তোমরা নিরুপায় হলেই তারা সস্তায় কিনে নেবে।
