সাধু আর চলিত দুরকম ভাষার পৃথক অস্তিত্বের আর প্রয়োজন আছে। মনে হয় না। দুইএর সমন্বয় অসাধ্য নয়। এমন লৈখিক ভাষা চাই যাতে বর্তমান সাধুভাষার আর মার্জিতজনের মৌখিকভাষা দুইএরই সদ্গুণ বজায় থাকে। সংস্কৃত সমাসবদ্ধ পদের দ্বারা যে বার্সংকোচ লাভ হয় তা আমরা চাই, আবার মৌখিক ভাষার সহজ প্রকাশশক্তিও ছাড়তে চাই না। আমার প্রস্তাব সংক্ষেপে নিবেদন করছি।
(১) ক্রিয়াপদ আর সর্বনামের সাধুরূপের বদলে চলিত রূপ গৃহীত হক।
(২) অন্যান্য অসংস্কৃত ও সংস্কৃতজ শব্দের কতকগুলির সাধুরূপ আর কতকগুলির চলিত রূপ গৃহীত হক। যে শব্দের সাধু ও মৌখিক রূপের ভেদ আদ্য অক্ষরে, তার সাধু রূপই বজায় থাকুক, যথা–ওপর, পেছন, পেতল, ভেতর না লিখে উপর, পিছল, পিতল, ভিতর। যার ভেদ মধ্য বা অন্ত্য অক্ষরে, তার মৌখিক রূপই নেওয়া হক, যথা–কুয়া, মিছা, উঠান, একচেটিয়া স্থানে কুয়ো, মিছে, উঠন, একচেটে।
(৩) যে সংস্কৃত শব্দ বর্তমান চলিতভাষায় অচল নয়, অর্থাৎ বিখ্যাত লেখকগণ যা চলিতভাষায় লিখতে দ্বিধা করেন না, তা যেন বিকৃত করা না হয়। সত্য, মিথ্যা, নূতন, অবশ্য স্থানে যেন সত্যি, মিথ্যে, নোতুন, অবিশ্যি লেখা না হয়।
(৪) বর্তমান সাধুভাষার কাঠামো বা অন্বয়পদ্ধতি বা syntax বজায় থাকুক। ইংরেজী ভগীর অন্ধ অনুকরণ অথবা অকারণে বিশেষ্য সর্বনাম ক্রিয়াপদের বিপর্যয় বর্জনীয়।
এ ভাষায় অনুবাদ করলে সংস্কৃত রচনার ওজোগুণ নষ্ট হবে, অথবা এতে দর্শন বিজ্ঞান লেখা যাবে না এমন আশঙ্কা অমূলক। দুরূহ সংস্কৃত শব্দ এবং সমাসের সঙ্গে মৌখিক ক্রিয়াপদ আর সর্বনাম চালালেই গুরুচণ্ডাল দোষ হবে না।
ভাষার তৃতীয় অঙ্গ বানান। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানানের কতকগুলি নিয়ম সংকলন করে যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন তা সকল সাহিত্যসেবীকেই পড়ে দেখতে অনুরোধ করি। রবীন্দ্রনাথের সমর্থন ও তার লিখিত দৃষ্টান্তের প্রভাবে নূতন বানানগুলি ধীরে ধীরে প্রচলিত হচ্ছে। সবিস্তার আলোচনা না করে নূতন বানানের কয়েকটি প্রধান বিধি জানাচ্ছি।
(১) হিন্দী মরাঠী গুজরাটী প্রভৃতি সংস্কৃতজাত ভাষায় রেফাক্রান্ত ব্যঞ্জন বর্ণের দ্বিত্ব হয় না। ব্যাকরণ অনুসারেও দ্বিত্ব আবশ্যক নয়। বাংলাতেও দ্বিত্ব বর্জনীয়। কার্য লিখতে একটা য যথেষ্ট।
(২) কতকগুলি বাংলা শব্দের শেষে অ-কার উচ্চারিত হয়, যেমন–ছিল, বড়, কত; কিন্তু অধিকাংশ শব্দে হয় না, যেমন–ছিলেন, তোমার, কেমন। শেষোক্ত শব্দগুলিতে হস্ চিহ্ন দেওয়া হয় না, যদিও উচ্চারণ হসন্ত। যদি ভুল উচ্চারণের আশঙ্কা না থাকে তবে অসংস্কৃত শব্দে অন্ত্য হস্ চিহ্ন বর্জনীয়। ওস্তাদ, পকেট, হক, ডিশ প্রভৃতি শব্দে হস্ চিহ্নের কোনও দরকার নেই।
(৩) অসংস্কৃত শব্দে ণ থাকবে না, কেবল ন। কান, বামুন, কোরান, করোনার প্রভৃতিতে ন। এই প্রথা নূতন নয়, অনেক খ্যাতনামা লেখক বহুকাল থেকে এইরকম লিখছেন।
(৪) ফারসী আরবী ইংরেজী প্রভৃতি বিদেশী শব্দের মূল উচ্চারণ অনুসারে বাংলা বানানে s স্থানে স এবং sh স্থানে শ হবে। যথা–জিনিস, সরকার, ক্লাস, নোটিস দন্ত্য স; শরম, শুরু, শাগরেদ, পালিশ তালব্য শ। হিন্দী প্রভৃতি ভাষাতেও এই রীতি চলে। অনেক বাঙালী মুসলমানও এইরকম। বানান করেন।
(৫) নবাগত বিদেশী শব্দে অনর্থক য় বর্জনীয়। war ওয়ার নয়, ওআর। কিন্তু wire ওয়ার।
(৬) বক্র আ বা বিকৃত এ বোঝাবার জন্য আদিতে অ্যা এবং মধ্যে বা অন্তে া বিধেয়, যথা–অ্যাসিড, হ্যাট, নিউম্যান।
(৭) পৌষমাসের প্রবাসী পত্রিকায় সম্পাদক মহাশয় চলিত ক্রিয়াপদের খামখেয়ালী বানানের নিরূপণ চেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়কৃত নিয়মে তা আছে; বল্লেন, কছিল নয়, বললেন, করছিল।
কেউ কেউ বলেন–এই নিয়মের কতকগুলি পালন করতে গেলে নানা ভাষায় জ্ঞান দরকার। জিনিস-এর মূল জি, সাগরেদ-এর মূল শার্গি তা কত লোক জানে? আমি বলি, জানবার বিশেষ দরকার নেই। ব্যুৎপত্তি না জেনেও আমরা শিখি যে উজ্জ্বলএ ব-ফলা আছে কিন্তু কজ্জলএ নেই। যারা জানেন এবং যাঁদের উৎসাহ আছে তারা নির্দেশ দেবেন এবং সাধারণে ক্রমে ক্রমে শিখবে।
বিনীত
রাজশেখর বসু
বিদ্যালয়ের বাংলাভাষা
এই নাম দিয়ে শ্রীযুক্ত কৃষ্ণদয়াল বসু একটি প্রবন্ধ সম্প্রতি শিক্ষা ও সাহিত্য পত্রিকায় লিখেছেন। কথাসাহিত্য আষাঢ় সংখ্যায় তার সম্বন্ধে আলোচনা আছে। তারই জের টেনে আমি কিছু বলছি। শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা : আমার মোটেই নেই। কিন্তু বহু কাল আগে যখন স্কুলে পড়তাম তখন বাংলা ভাষা শিক্ষার যে ব্যবস্থা ছিল তার দোষ-গুণ আমার মনে আছে। সেজন্য লেখকের যুক্তি বুঝতে আমার বাধা হয় নি।
কৃষ্ণদয়ালবাবুর এই কালোচিত প্রবন্ধটি শিক্ষাধিকারের কর্তাদের অবশ্যপাঠ্য। যাঁরা বাংলা শিক্ষায় গোড়া থেকে সুব্যবস্থা চান তাদের সকলেরই লেখকের মত ও প্রস্তাবগুলি সযত্নে বিচার করে দেখা উচিত। আলোচনার সুবিধার জন্য মূল প্রবন্ধ থেকে কিছু কিছু তুলে দিচ্ছি–
আমি নিজে বাংলা চলিতভাষার অনুরাগী। কিন্তু বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা চলিতভাষার মোহ ত্যাগ করে তাদের প্রত্যেকটি রচনা সাধুভাষায় লেখা অভ্যাস করুক এই আমি চাই।..ছেলেবেলা থেকেই যেসব ছাত্র চলিতভাষা লিখতে শুরু করে তারা স্বভাবতই তদ্ভব দেশজ ও বিদেশী শব্দ আর বড়জোর গোটাকতক অতিপরিচিত সহজ সরল তৎসম শব্দ দিয়ে কাজ চালিয়ে যায় বলে অধিকাংশ তৎসম শব্দ অপ্রয়োজনে ও অব্যবহারে তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। এর অনিবার্য পরিণাম…বাংলা সাহিত্যের বহু শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, বহু ক্লাসিক শ্রেণীর রচনা ছাত্রদের অনধিগম্য ও অপঠিত থেকে যায়।..আমার মতে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষে ভাষাশিক্ষার প্রয়োজনটাই মুখ্য, সাহিত্যদীক্ষার প্রয়োজন গৌণ।..বিদ্যালয়ে চলিত ভাষা যদি আদৌ না চালানো হয় তা হলে ছাত্রদের ব্যাকরণ শিক্ষার চাপটা অনেকখানি কমে যায়।…চলিতভাষা এখন কেবল গড়ে উঠছে, তার ব্যাকরণ এখনও সবটা লেখাই হয় নি।…নিম্নতম শ্রেণী থেকে অষ্টম মান পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের গদ্যাংশ সাধুভাষায় লেখা হওয়া চাই–একটি নিবন্ধও চলিত ভাষায় লেখা হলে চলবে না।…নবম ও দশম মানের জন্য একখানি সংকলন-পুস্তক এতকাল যেমন চলে আসছিল তেমনি চলুক।
