সংস্কৃত ছন্দের অনুকরণ
সংস্কৃত ছন্দের সমস্ত নিয়ম বজায় রেখে কেউ কেউ বাংলা পদ্য লেখবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সুবিধা হয় নি, কারণ স্বতেদীর্ঘ স্বর বাংলা ভাষার প্রকৃতি-বিরুদ্ধ, তাতে রচনা কৃত্রিম হয়ে পড়ে। বলদেব পালিতের লেখা। থেকে উপজাতি ছন্দের নমুনা–
দৈবানুকূলে বলহীন শক্ত,
বলী অশক্ত প্রতিকূল দৈবে।
দৈবে হবে নির্জিত সূতপুত্র।
তোমার ভাগ্যে ঘটিবে জয়শ্রী।
প্রতি চরণে ১১ অক্ষর। প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ চরণ ইন্দ্ৰবজ্রা, ১৮ মাত্রা; দ্বিতীয় চরণ উপেন্দ্ৰবজ্রা, ১৭ মাত্রা। অনুরূপ সংস্কৃত–
এষা প্রসন্নস্তিমিতপ্রবাহা
সরিদ বিদূরান্তরভাবতন্বী।
মন্দাকিনী ভাতি নগোপকণ্ঠে
মুক্তাবলী কণ্ঠগতেব ভূমেঃ ॥
রবীন্দ্রনাথের ছন্দ পুস্তকে দ্বিজেন্দ্রনাথ-রচিত একটি মন্দাক্রান্তার নমুনা আছে–
ইচ্ছা সম্যক ভ্রমণগমনে কিন্তু পাথেয় নাস্তি,
পায়ে শিকলী মন উড়ু উড় এ কি দৈবেরি শাস্তি।
সংস্কৃত মাত্রাচ্ছন্দের রীতিতে বাংলায় অনেক গান রচিত হয়েছে, যেমন দেশ দেশ নন্দিত করি, জনগণমন অধিনায়ক। এইসব গানে স্বতেদীর্ঘ স্বর থাকলেও তার ফল ভালই হয়েছে, কারণ গানের তালের সঙ্গে দীর্ঘস্বরের । টান সহজেই খাপ খায়।
বাংলা মাত্রাবৃত্তের নিয়মে, অর্থাৎ শুধু পরতোদীর্ঘ স্বর অবলম্বন করে কেউ কেউ সংস্কৃত অক্ষরচ্ছন্দের অনুকরণ করেছেন। কিন্তু স্বতেদীর্ঘ স্বরের জন্য সংস্কৃতে যে লালিত্য হয় অনুকরণে তা পাওয়া যায় না। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত বাংলা মাত্রাবৃত্তে মালিনী ছন্দের নমুনা–
উড়ে চলে গেছে বুলবুল, শূন্যময় স্বর্ণপিঞ্জর,
ফুরায়ে এসেছে ফাগুন, যৌবনের জীর্ণ নির্ভর।
প্রতি চরণে ১৫ অক্ষর, ২২ মাত্রা, অক্ষরবিন্যাস সংস্কৃত অক্ষরচ্ছন্দের রীতিতে, শুধু স্বলতাগুরু অক্ষর নেই। অনুরূপ সংস্কৃত–
শশিনমুপগতেয়ং কৌমুদী মেঘমুক্তং
জলনিধিমনুরূপং জন্ধু কন্যাবতীর্ণা।
সংস্কৃত মাত্রাচ্ছন্দে অক্ষরবিন্যাসের বাঁধাবাঁধি নেই, সেজন্য বাংলায় অনুরূপ রচনা আড়ষ্ট না করেও সংস্কৃত ছন্দের সঙ্গে অল্পাধিক সাদৃশ্য রাখা যেতে পারে। যথা রবীন্দ্রনাথের–
পঞ্চশরে দগ্ধ করে করেছ এ কী সন্ন্যাসী,
বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে।
দুই চরণে যথাক্রমে ২০, ১৪ মাত্রা (চরণের অন্ত্যস্বর দীর্ঘ)। অনুরূপ গীতগোবিন্দে–
বদসি যদি কিঞ্চিদপি দন্তরুচিকৌমুদী
হরতি দরতিমিরমতিঘোর।
ছন্দ পুস্তকে সংস্কৃত শিখরিণী অক্ষরচ্ছন্দের রবীন্দ্রনাথ-কৃত বাংলা রূপান্তরের একটি নমুনা আছে। এতে শুধু মাত্ৰাসংখ্যা ঠিক রাখা হয়েছে–
কেবলি অহরহ মনে মনে।
নীরবে তোমা সনে যা খুশি কহি কত;
সংস্কৃত নমুনা–
চলাপাঙ্গাং দৃষ্টিং/স্পৃশসি বহুশো বেপথুমতী
প্রতি ভাগে যথাক্রমে ১১, ১৪ মাত্রা। পরিশেষে বাংলা মাত্রাবৃত্ত-মন্দাক্রান্তার একটি উদ্ভট নমুনা দিচ্ছি–
মন্দ্রাক্রান্তায় রচিল কালিদাস কাব্য মেঘদূত চমৎকার,
বাংলায় তদ্রূপ বিভেদ নেই বলেই শক্ত একটু
যুক্তাক্ষর তাই যত পার চালাও আর দেদার দাও হসন্ত,
ঠিক ঠিক জায়গায় বসালে পাবে এই তকে কিঞ্চিৎ দুধের স্বাদ।
বাংলা বানানের নিয়ম
বাংলা বানানের রীতি নির্দিষ্ট করার জন্য রবীন্দ্রনাথ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ করেন। তদনুসারে নভেম্বর ১৯৩৫এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বানান সংস্কার সমিতি গঠিত হয়। এতে ছিলেন–রাজশেখর বসু (সভাপতি), প্রমথনাথ চৌধুরী, মহামহোপাধ্যায় বিধুশেখর শাস্ত্রী, রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র, অধ্যাপক বিজয়চন্দ্র মজুমদার, দ্বারকানাথ মুখোপাধ্যায়, দুর্গামোহন ভট্টাচার্য, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ও চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য (সম্পাদক)।
সমিতি নির্ধারিত বানানের নিয়মাবলী সমর্থনে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র নিম্নোক্ত মত প্রকাশ করেন।—
বাংলা বানান সম্বন্ধে যে নিয়ম বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট করিয়া দিলেন আমি তাহা পালন করিতে সম্মত আছি। —
১লা আশ্বিন ১৩৪৩
১১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৬
.
বানান যথাসম্ভব সরল ও উচ্চারণসূচক হওয়া বাঞ্ছনীয়, কিন্তু উচ্চারণ বুঝাইবার জন্য অক্ষর বা চিহ্নের বাহুল্য এবং প্রচলিত রীতির অত্যধিক পরিবর্তন উচিত নয়। অতিরিক্ত অক্ষর বা চিহ্ন চালাইলে লাভ যত হইবে তাহার অপেক্ষা লেখক, পাঠক ও মুদ্রাকরের অসুবিধা অধিক হইবে। ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থে বা শব্দকোষে উচ্চারণ-নির্দেশের জন্য বহু চিহ্নের প্রয়োগ অপরিহার্য, কিন্তু সাধারণ লেখায় তাহা ভারস্বরূপ। প্রচলিত শব্দের উচ্চারণ লোকে অর্থ হইতেই বুঝিয়া লয়। আমাদের ভাষায় বহু শব্দের বানানে ও উচ্চারণে মিল নাই, যথা-গণ, বন, ঘন, জলখাবার, জলযোগ, আষাঢ়, গাঢ়; সহিত, গলিত, অশ্বতর, হ্রস্বতর, একদা, একটা; অচেনা, দেখা। এইপ্রকার শব্দের বানান-সংস্কার করিতে কেহই চান না, প্রদেশভেদে উচ্চারণের কিঞ্চিৎ ভেদ হইলেও ক্ষতি হয় না। সুপ্রচলিত শব্দের বানান সংস্কার যদি করিতে হয় তবে, বানানের জটিলতা না বাড়াইয়া সরলতা সম্পাদনের চেষ্টাই কর্তব্য।
নবাগত বা অল্পপরিচিত বিদেশী শব্দ-সম্বন্ধে বিশেষ বিচার আবশ্যক। এইপ্রকার শব্দের বাংলা বানান এখনও সর্বজনগৃহীতরূপে নির্ধারিত হয় নাই, অতএব সাধারণের যথেচ্ছতার উপর নির্ভর না করিয়া বানানের সরল নিয়ম গঠন করা কর্তব্য।
