আমাদের চতুর্থ লাভ,—এটুকু কেবল বাঙ্গালার লাভ;—সমাজের কর্তৃত্ব ভূম্যাধিকারীদের হাত হইতে এই প্রথম মধ্যবিত্ত লোকের হাতে গেল। অর্থাৎ কর্তৃত্ব, ধনের হাত হইতে বুদ্ধি-বিদ্যার হাতে গেল। এখন হইতে বাঙ্গালায় ধনবানেরা আর কেহই নহেন, শিক্ষিত সম্প্রদায়ই কর্তা। ইহা সমাজের পক্ষে বিশেষ মঙ্গলকর, উন্নতির লক্ষণ, এবং উন্নতির সোপান। এখনকার নূতন সমাজ নেতৃগণের নিকট আমাদের নিবেদন, তাঁহারা সমাজ ধীরে ধীরে সুপথে চালাইলে, বিপ্লব না ঘটে।
এই গেল লাভের অঙ্ক জমা। এক্ষণে খরচটা দেখা যাউক।
আমাদের প্রথম ক্ষতি এই যে, এ উৎসবে দ্বেষক ইংরেজ-সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈরিতা বড় বাড়িয়া উঠিল। মুখে যিনি যাহা বলুন, তাঁহারা এ উৎসব কখন মার্জনা করিবেন না। তাঁহাদের সঙ্গে আর গোল মিটিবে না। ইহাতে সময়ে সময়ে আমাদিগকে ক্ষতিগ্রস্ত হইতে হইবে।
আমাদের দ্বিতীয় ক্ষতি এই যে, কিছু “ষ্টীম” ছাড়া হইয়াছে, যে সঞ্চিত বলে সমাজ-যন্ত্র দ্রুতবেগে চলিবে, তাহার কিছু ব্যয় হইয়াছে। সেটা নিতান্ত মন্দও হয় নাই। বড় বেশী ষ্টীম জমিলে বিপ্লব উপস্থিত হয়।
আমাদের তৃতীয় ক্ষতি এই যে, গলাবাজির দৌরাত্ম্যটা বড় বাড়িয়া গেল। কথার ছড়াছড়ি বড় বেশী হইয়া গিয়াছে। সেটা কুশিক্ষা। একে ত বাঙ্গালী সহজেই কেবল বাক্য-বাহাদুর, তার উপর বক্তৃতা নামে বিলাতি মালের আমদানি হইয়াছে। সোণা বলিয়া সোহাগা বিক্রয় হইতেছে। আমাদের ভয়, পাছে আপনাদের বাক্জালে আপনারাই জড়াইয়া পড়ি, কথার কুয়াশায় আর পথ দেখিতে না পাই; তুবড়ী বাজির মত মুখে সোঁ সোঁ করিয়া ফাটিয়া যাই।
সে যাহাই হৌক, খরচের অপেক্ষা জমা যে বেশী, তাহাতে কোন সন্দেহই নাই। খরচাগুলি ছোট ছোট, লাভগুলি বড় বড়। উৎসবে আমরা মুনাফা করিয়াছি, এখন রেখে ঢেকে চালাইতে পারিলেই হয়। তবে লাভ কি, লোক্সান কি তাহা না বুঝিয়া, “বেড়ে হয়েছে! বেড়ে হয়েছে!” বলিয়া বেড়ান জাতীয় শিক্ষার পক্ষে ভাল নহে।
–‘প্রচার’, পৌষ ১২৯১, পৃ. ২১৮-২২০।
সর্ উইলিয়ম গ্রে ও সর্ জর্জ কাম্বেল
পূর্ববঙ্গবাসী কোন বর, কলিকাতানিবাসী একটি কন্যা বিবাহ করিয়া গৃহে লইয়া যান। কন্যাটি পরমাসুন্দরী, বুদ্ধিমতী, বিদ্যাবতী, কর্মিষ্ঠা এবং সুশীলা। তাঁহার পিতা মহা ধনী, নানা রত্নে ভূষিতা করিয়া কন্যাকে শ্বশুরগৃহে পাঠাইলেন। মনে ভাবিলেন, আমার মেয়ের কোন দোষ কেহ বাহির করিতে পারিবে না। সঙ্গের লোক ফিরিয়া আসিলে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন হে, বাঙ্গালেরা মেয়ের কোন দোষ বাহির করিতে পারিয়াছে?” সঙ্গের লোক বলিল, “আজ্ঞা হাঁ—দোষ লইয়া বড় গণ্ডগোল গিয়াছে।” বাবু জিজ্ঞাসা করিলেন—“সে কি? কি দোষ?” ভৃত্য বলিল, “বাঙ্গালেরা বড় নিন্দা করিয়াছে, মেয়ের কপালে উল্কি নাই।” আমরা এই বঙ্গদর্শনে, কখন সর্ জর্জ কাম্বেল সাহেব সম্বন্ধে কোন কথা বলি নাই। যাঁহার নিন্দা তিন বৎসরকাল বাঙ্গালাপত্রের জীবনস্বরূপ ছিল, তাঁহার কোন উল্লেখ না থাকাতে, আমাদের ভয় করে যে পাছে কেহ বলে যে, বঙ্গদর্শনের উল্কি নাই। আমরা অদ্য বঙ্গদর্শনকে উল্কি পরাইতে প্রবৃত্ত হইলাম।
তবে এই উল্কি বড় সামান্য নহে। যে পত্র বা পত্রিকা (কোন্গুলি পত্র আর কোন্গুলি পত্রিকা তাহা আমরা ঠিক জানি না—কি করিলে পত্র পত্রিকা হইয়া যায়, তাহাও অবগত নহি) একবার কপালে এই উল্কি পরিয়াছে, তিনি বঙ্গদেশে মোহিয়াছেন, মুগ্ধ হইয়া বঙ্গীয় পাঠকগণ তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিয়াছে—এবং সাম্বৎসরিক অগ্রিম মূল্যে বরণ করিয়া তাঁহাকে ঘরে তুলিয়াছে। যে এই উল্কি পরে, তাহার অনেক সুখ।
এক্ষণে সর্ জর্জ কাম্বেল এতদ্দেশ ত্যাগ করিয়া গিয়াছেন—ইহাতে সকলেই দুঃখিত। এ পৃথিবীতে পরনিন্দা প্রধান সুখ—বিশেষ যদি নিন্দিত ব্যক্তি উচ্চশ্রেণীস্থ এবং গুণবান্ হয় তবে আরও সুখ। সর্ জর্জ কাম্বেল গুণবান্ হউন বা না হউন উচ্চশ্রেণীস্থ বটে। তাঁহার নিন্দায় যে সুখ, তাহাতে এক্ষণে বঙ্গদেশের লোক বঞ্চিত হইল। ইহার অপেক্ষায়, আর গুরুতর দুর্ঘটনা কি হইতে পারে? এই যে গুরুতর দুর্ভিক্ষবহ্নিতে দেশ দগ্ধ হইতেছিল—তাহাতেও আমরা কোন মতে প্রাণ ধারণ করিতেছিলাম—খবরের কাগজ চলিতেছিল, বাঙ্গালি বাবু গল্পের মজলিশে অশ্লীল গল্প ছাড়িয়া সর্ জর্জের নিন্দা করিয়া বোতল শেষ করিতেছিলেন। কিন্তু এক্ষণে? হায়! এক্ষণে কি হইবে!
এইরূপ সর্বজননিন্দার্হ হওয়া সচরাচর দেখা যায় না। অনেকে বলিবেন, সর্ জর্জ কাম্বেলের অসাধারণ দোষ ছিল, এই জন্যই তিনি এইরূপ অসাধারণ নিন্দনীয় হইয়াছিলেন। আমাদিগের বিশ্বাস আছে যে এইরূপ সর্বজননিন্দনীয় হয়, যাহার নিন্দায় সকলের তুষ্টি জন্মে, সে হয় অসাধারণ দোষে দোষী বা অসাধারণ গুণে গুণবান্—নয়ত দুই। জিজ্ঞাস্য, সর্ জর্জ কাম্বেল, অসাধারণ দোষে দোষী, না অসাধারণ গুণে গুণবান্ বলিয়া তাঁহার এই নিন্দাতিশয্য হইয়াছিল?
তাঁহার পূর্বগামী শাসনকর্তা সর্ উইলিয়ম গ্রে। সর্ উইলিয়ম গ্রের ন্যায় কোন লেঃ গবর্ণর প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হয়েন নাই। সর্ জর্জ কাম্বেল ও সর্ উইলিয়ম গ্রের এই ভাগ্যতারতম্য কোন্ দোষে বা কোন্ গুণে? কোন্ গুণে সর্ উইলিয়ম সকলের প্রিয়, কোন্ দোষে সর্ জর্জ সকলের অপ্রিয়?
যাঁহারা এই কথার মীমাংসা করিতে ইচ্ছুক তাঁহাদিগকে একটা কথা বুঝাইতে হয়। এই ব্রিটিশ ভারতীয় শাসনপ্রণালী দূর হইতে দেখিতে বড় জাঁক, শুনিতে ভয়ানক, বুঝিতে বড় গোল—ইহার প্রকৃতি কি প্রকার? এক লেঃ গবর্ণর কর্তৃক যে এই বৃহৎ রাজ্য শাসিত হয় সে কোন্ রীতি অবলম্বন করিয়া?
