তিনি, প্রথম উপকার, এই দেখান যে, দেবসেবার অনুরোধে সেবক ভাল খায় পরে। এবং এই কথা প্রতিপন্ন করিবার জন্য বৈষ্ণবের বাড়ী ব্রাহ্ম অতিথির উদাহরণ দিয়াছেন। শ্রীঃ মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করি, যাহারা ঠাকুরপূজা করে না, তাহারা কি কখন ভাল খায় পরে না? শ্রীঃ মহাশয় কি তখন সাহেবদিগের আহার দেখেন নাই, তাহারা কয়টা শালগ্রামের ভোগ দেয়? হিন্দু পুত্তল পূজা করে, ইংরেজ করে না; ইংরেজ ভাল খায়, না হিন্দু ভাল খায়? ইংরেজ। তবে আহারাদির পারিপাট্য যে ঠাকুরপূজার ফল নহে, তাহা শ্রীঃ মহাশয়কে স্বীকার করিতে হইবে।
তিনি হয়ত বলিবেন, ইহা সত্য, তবে বাঙ্গালি এমন জাতি যে, যাহা কিছু ভাল খায়, তাহা ঠাকুরের অনুরোধে, ঠাকুর না থাকিলে খাইত না। এ কথা মিথ্যা। অনেক ঘোর নাস্তিক, উৎকৃষ্ট আহার করে, এবং অনেক দৃঢ়ভক্ত কানাইয়া লালকে এমন কদন্ন ভোগ দেয় যে, তাহার গন্ধে ভূত প্রেত পালায়। স্থূল কথা এই যে, যাহার শক্তি ও সংস্কার আছে, সেই ভাল খায়। যে এখন ঠাকুরকে উপলক্ষ করিয়া ভাল খায়, বা খাওয়ায় সে পৌত্তলিক না হইলে উদরের অনুরোধে ভাল খাইত, খাওয়াইত। শ্রীঃ মহাশয় দ্বিতীয় উপকারটি বঙ্গমহিলা সম্বন্ধে দেখাইয়াছেন। লিখেন, “প্রকৃত ঈশ্বরের নিকট থাকায় যে ফল, তাহা তাহাদের ফলিতেছে।” শ্রীঃ মহাশয় সে ফল কি আপনি জানেন? সে ফল পুরুষোত্তম, কাশী, প্রভৃতি তীর্থস্থানে প্রকটিত আছে। ঈশ্বরসান্নিধ্য হিন্দু মহিলার নিকট নিঃশঙ্কচিত্তে পাপ করিবার স্থান বলিয়া পরিচিত।
তিনি বলেন, সাকারে প্রার্থনা আন্তরিক হয়, নিরাকারে তত হয় না। কে বলিয়াছে? কেন হয় না? যাহাকে চাক্ষুষ মাটি বা পাতর দেখিতেছি, তাহার কাছে যদি আন্তরিক কাঁদিতে পারি, তবে যাঁহাকে চক্ষে দেখিতেছি না, কিন্তু মনে জানিতেছি তিনি ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছেন, কেন তাঁহার কাছে আন্তরিক কাঁদিতে না পারিব? কেন সেইরূপ সান্ত্বনা লাভ না করিব? শ্রীঃ যুবতীর মুখে যে কয়টি কথা বসাইয়াছেন, তাহা মেয়েলি কথা বলিয়া উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না। যুবতী স্ত্রীবুদ্ধিতে অলীক কথা বলিয়াছে, ভক্ত নিরাকারবাদীর অন্তঃকরণ বুঝিতে পারে না বলিয়া বলিয়াছে। দেবতার কাছে আছি বলিয়া, তাহার যে সুখ, যে সাহস, সর্বব্যাপী ঈশ্বরের কাছে আছি বলিয়া নিরাকার ভক্তেরও সেই সুখ, সেই সাহস। বিশ্বাসের দার্ঢ্য থাকিলে সাকার নিরাকারে কোন প্রভেদ নাই।
তৃতীয় উপকার, তারকেশ্বর, বৈদ্যনাথ রোগ ভাল করেন, শ্রীঃ বলেন, রোগ বিশ্বাসে ভাল হয়, বিশ্বাস দেবতার উপর। যদি বিশ্বাসে রোগ ভাল হয়, তবে বিশ্বাসযোগ্য ডাক্তারের সংখ্যা বাড়িলেই দেবতারা পদচ্যুত হইতে পারেন।
চতুর্থ উপকার, উৎসব, যথা দুর্গোৎসবাদি। জিজ্ঞাসা করি এই হতভাগ্য অন্নক্লিষ্ট, বৃথা হট্টগোলে ব্যতিব্যস্ত বঙ্গসমাজে একটা উৎসবের কি প্রয়োজন আছে? এখন কতকগুলি কঠিনহৃদয়, ভোগপরাঙ্মুখ, উৎসববিরত সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় না হইলে, ভারতবর্ষের কি উদ্ধার হইবে?
পঞ্চম, শ্রীঃ বলেন, এই উপধর্ম বঙ্গের সমাজবন্ধন; এ বন্ধন রাখিয়া, সমাজ রক্ষা কর। বঙ্গসমাজবন্ধন ছিন্ন করিয়া, সমাজ ভঙ্গ করা, বিচলিত, বিপ্লুত করারই প্রয়োজন হইয়াছে; এই খইয়ে বন্ধনে বাঙ্গালির প্রাণ গেল। এ পচা গোরুর দড়ি আর আমাদের গলায় রাখিও না। যদি দেবতাপূজাই এই নরক তুল্য সমাজের মূল গ্রন্থি, তবে আমি বলি যে, শীঘ্র শাণিত ছুরিকার দ্বারা ইহা ছিন্ন কর। নূতন সমাজ পত্তন হউক।
রূপক একটি ভ্রমের কারণ। “বন্ধন” শব্দটি ব্যবহার করিলে লোকে মনে করিবে “বড় আঁটাআঁটি—দড়ি ছাড়িস না, বাঁধন ঠিক রাখিস।” বস্তুতঃ সমাজবন্ধন মানে কি? শ্রীঃ কি মনে করেন যে, দেবতার পূজা উঠিয়া গেলেই, সমাজ খসিয়া পড়িবে, সমাজের লোক সকল, সমাজ ছাড়িয়া গোশালাবিমুক্ত গোরুর ন্যায় বনের দিকে ছুটিবে? তাহা নহে। আসল কথা এই দেবতাভক্তি, বঙ্গসমাজের একটি ধর্মভিত্তি। এ ভিত্তি ভাঙ্গিয়া গেলে ধর্মের অন্য ভিত্তি হইবে ; সমাজ নষ্ট হইবে না। যত দিন না নূতন ভিত্তি পত্তন হয়, তত দিন কেহ এই ভিত্তি বিনষ্ট করিতে পারিবে না। শিক্ষা এবং লোকবাদ (public opinion) এবং উৎকৃষ্ট নীতিশাস্ত্রজনিত নূতন ভিত্তি চারিদিকে স্থাপিত হইতছে। শ্রীঃ বলেন, “ভক্তি, শ্রদ্ধা, প্রভৃতি যে কয়েকটি গুণের নিমিত্ত বাঙ্গালা বিখ্যাত, তাহা এই দেবতাদিগের প্রসাদাৎ।” ইত্যাদি। পুত্তলপূজা ভিন্ন যে ভক্ত্যাদি গার্হস্থ্য ধর্মের অন্য মূল নাই, এ কথা এরূপ অমূলক এবং অশ্রদ্ধেয় যে ইহার প্রতিবাদ আবশ্যক করে না।
আমি সংক্ষেপতঃ দেখাইলাম যে, শ্রীঃ বঙ্গীয় দেবতাগণকে যে কয়েক বিষয়ে উপকারক মনে করেন, তাহা কেবল তাঁহার ভ্রান্তি। সকল ভ্রান্তি দেখাইতে গেলে, তিন নম্বর ভ্রমর আমাকেই ইজারা করিতে হইবে। কিন্তু বিচারার্থ আমি স্বীকার করিতে প্রস্তুত আছি যে, কোন কোন বিষয়ে সাকার-পূজা উপকার করে। তাই বলিয়া কি সাকার পূজা অবলম্বনীয়? এ জগতে এমন অপকৃষ্ট সামগ্রী কি আছে যে, তদ্দ্বারা কোন না কোন উপকার নাই। মদ্য উৎকৃষ্ট ঔষধ; অনেক বিষে উৎকৃষ্ট ঔষধ প্রস্তুত হয়; তাই বলিয়া কি মদ্য এবং বিষ নিত্য সেবা করা কর্তব্য? কয়েদী জেলে গিয়া, পরের খরচে খাইতে পায়, তাই বলিয়া কি বলিয়া কি কারাবাস কামনীয়? অপুত্রকের ব্যয় অল্প, সেই জন্য কি অপুত্রকতা কামনীয়; অনেক স্ত্রীলোক অসতী হইয়াই পুত্রবতী হইয়াছে; তাহাতে কি অসতীত্ব ইষ্টবস্তু হইল? সাকার পূজায় কিছু কিছু উপকার আছে বলিয়াই কি সাকার পূজা প্রচলনীয় বলিয়া সিদ্ধ হইল?
