৪
সপ্তম দশা দিনে, সজিনা খাড়া রাঁধিল
বলে প্রাণ বঁধূ কোথা গেলে।
যে খাঁড়া রেঁধেছি ভাই, তুমি বঁধূ কাছে নাই,
যদি পেট ফাঁপে একা খেলে ||
৫
অষ্টম দশা দিনে, বিরহ বিষাদিনী,
মন দুঃখে কিনিল ইলিশ।
তিতিয়া নয়ন জলে, ভাজায় ঝোল অম্বলে,
খায় ধনী খান বিশ ত্রিশ ||
৬
নবম দশার দিনে, পেট ফেঁপে ঢাক হলো,
আইল কানাই কবিরাজ।
সই বল কর্মভোগ, এ ঘোর বিরহ রোগ,
কবিরাজের নাহি ইথে কাজ ||
৭
দশম দশা দিনে, বিরহিণী মরে নরে,
আই ঢাই বিছানায় পড়ি।
কাতরে কহিছে সতী, কোথা পাব প্রাণপতি,
কোথা পাব পাচকের বড়ি ||
৮
বিরহীর দশ দশা, পন্ পন্ করে মশা,
মাছি উড়ে ছেলে কাঁদে কোলে।
চাকরাণীর চীৎকার, সইসাঙ্গতির টিট্কার,
খেদে কবি ছন্দোবন্ধ ভোলে ||
—‘বঙ্গদর্শন’, ফাল্গুন, ১২৭৯
মাসিক সংবাদ
গঙ্গাতীরে পাটনা নামে এক নগর আছে। তথায় কর্কুড নামা প্রথিতযশা অতি জ্ঞানবান্ এক বিচারপতি জনসমাজের প্রতি কৃপা করিয়া মাসিক আড়াই হাজার টাকামাত্র বেতন লইয়া বিচার বিতরণ করিতেন। তাহাতে পুণ্যক্ষেত্র পাটলিপুত্র পবিত্রিত হইতেছিল। একদা, বুধিয়া নাম্নী অপ্রাপ্ত-যৌবনা ক্কচিৎ কুমারী তাঁহার বিচারাগারে বিচার প্রর্থিত হইল। বলিল—“ধর্মাবতার! গুরুচরণ দোসাদ নামে চোর, আমার ঘটি বাটি চুরি করিয়াছে।” বিচারনিধান এই অশ্রুতপূর্ব অভাবনীয় অঘটনীয় সম্বাদশ্রবণে বিস্মিত ও চমৎকৃত হইয়া মনে মনে নানাবিধ তর্ক বিতর্ক করিতে লাগিলেন। ভাবিলেন—“কালের কি বিচিত্র গতি! হায়! কুমারীর ঘটি বাটি চুরি! এমন কি হয়!” মলিম্লুচ যুক্তপাণি হইয়া বিচারাসনতলে নিবেদন করিল—“হে ধর্মস্বরূপ! এমন কি হয়! বরং আকাশে স্তরে স্তরে সহস্রদল পুষ্প প্রস্ফুটিত হইতে পারে—বরং প্রভাতে পশ্চিমে দ্বাদশ আদিত্য উদিত হইতে পারে, বরং হিমালয়-শিখর-দেশে যূথে যূথে মকর কুম্ভীর সন্তরণ করিতে পারে, তথাপি হে, ধর্মস্বরূপ! কুমারীর কখন ঘটি বাটি চুরি যাইতে পারে না। ধর্মাবতার! এই দুশ্চারিণী বুধিয়া ঘোরতর অসতী—ইহার কথা বিশ্বাসযোগ্য নহে।” তখন বিচারাসন হইতে সেই জ্ঞানসমুদ্রের কল্লোল সমুত্থিত হইল—“রে মলিম্লুচ! সাধু! সাধু! এ অতি সঙ্গত কথা। আমি অনন্ত জ্ঞানী বিচারক; আমি অচিরেই পরীক্ষার দ্বারা এ কঠিন সমস্যার মীমাংসা করিব।” তখন ধন্বন্তরির প্রতি মহা বিচারক আজ্ঞা প্রচার করিলেন, “বিবস্ত্র করিয়া এই দুশ্চারিণীকে পরীক্ষিত কর।” দুশ্চারিণী পরীক্ষিতা হইয়া চরিতার্থ হইল। কিন্তু কালের কি অনন্ত মহিমা! সেই প্রদেশে “বেহার হেরল্ড” নামে অতি দুর্দান্ত রাক্ষস ধর্মহিংসা করিয়া দিন যাপন করে। সেই মহাধনুর্ধর, পাটলিপুত্র নগরে এইরূপ সাক্ষাৎ ধর্মের অবতারণা শ্রবণ করিয়া মহা ক্রোধভরে বিচারপতির প্রতি এমন এক শর প্রয়োগ করিলেন যে, তাহা ত্যাগে এক, মুদ্রাঙ্কনে সহস্র, পতনকালে লক্ষ, এবং সংহারকালে কোটি কোটি হইয়া পড়িল। প্রথিতযশা বিচারনিধি শরজালে বিদ্ধ হইয়া, বিচারাসন হইতে ভূপতিত হইলেন। ইতি কর্কূড—বধ।
He comes, nor law, nor justice his course delay
Hide! Blushing Glory, hide Budhia’s day.
The vanquished hero leaves his broken bands,
And shows his misery in distant lands.
His fate was destined on Patna’s sand,
A petty niggeress, and a Baboo’s hand!
* * * * *
কৃষ্ণনগরের মুন্সেফ শ্রীযুক্ত চণ্ডীচরণ সেন মহাশয় তাঁহার একটি রায়ে লিখিয়াছেন, হিন্দু বিধবাদিগের মধ্যে শতকরা ৯৯ জন অসতী। আমাদের একটি গল্প মনে পড়িল। গুরুদেব শিষ্যালয়ে গিয়াছেন, আদর অভ্যর্থনার পর যথাসময়ে শিষ্য রন্ধনের যোগাড় করিয়া দিল। ঝোল রাঁধিতে বড় বড় দশটি কই মাছ আনিয়া দিল; অভিপ্রায়, গুরুদেবের সেবা হইবে, অবশিষ্ট শিষ্য সহ স্ত্রীপুত্র প্রসাদ পাইবেন। রন্ধন শেষ হইল, গুরুদেব ভোজনে বসিলেন। ঝোলে নুন ঝাল সমান হইয়াছিল, একটি করিয়া অমৃত বোধে গুরুদেব নয়টি মাছ খাইয়া ফেলিলেন। তখন তিনি অম্ল রসাস্বাদে প্রবৃত্ত হইলেন। এদিকে কিন্তু গুরুদেবের কার্য শিষ্যের ভক্তির সীমা অতিক্রম করিয়া উঠিয়াছিল, সে জিদ করিয়া বলিল—“এখন অম্বল থাকুক, আগে ও মাছটি খান।” গুরুদেব কিন্তু কিছুতেই স্বীকার পাইলেন না। শিষ্য তখন যৎপরোনাস্তি বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হইয়া কহিল—“উটি যদি না খান, ত আপনার বেটার মাথা খান।” আমরাও চণ্ডী বাবুকে অনুরোধ করি, যদি নিরানব্বইটির মাথাই খাইলেন, তবে আর একটি রাখিয়া ফল কি? আর একবার রায় লিখিয়া উটিকেও টানিয়া লউন।
—‘প্রচার’, শ্রাবণ ১২৯৫, পৃ. ১৫৪-৫৫।
সম্পাদিত গ্রন্থের ভূমিকা
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতাসংগ্রহ—ভূমিকা
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতাসংগ্রহ—ভূমিকা
জীবনচরিত ও কবিত্ব
[১২৯২ সালে প্রকাশিত]
উপক্রমণিকা
বাঙ্গালা সাহিত্যে আর যাহারই অভাব থাকুক, কবিতার অভাব নাই। উৎকৃষ্ট কবিতারও অভাব নাই—বিদ্যাপতি হইতে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত অনেক সুকবি বাঙ্গালায় জন্ম গ্রহণ করিয়াছেন, অনেক উত্তম কবিতা লিখিয়াছেন, বলিতে গেলে বরং বলিতে হয় যে, বাঙ্গালা সাহিত্য, কাব্যরাশি ভারে কিছু পীড়িত। তবে আবার ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা সংগ্রহ করিয়া সে বোঝা আরও ভারি করি কেন? সেই কথাটা আগে বুঝাই।
প্রবাদ আছে যে, গরিব বাঙ্গালীর ছেলে সাহেব হইয়া, মোচার ঘণ্টে অতিশয় বিস্মিত হইয়াছিলেন। সামগ্রীটা কি এ? বহুকষ্টে পিসীমা তাঁহাকে সামগ্রী বুঝাইয়া দিলে, তিনি স্থির করিলেন যে, এ “কেলা কা ফুল”। রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া যায় যে, এখন আমরা সকলেই মোচা ভুলিয়া কেলা কা ফুল বলিতে শিখিয়াছি। তাই আজ ঈশ্বর গুপ্তের কবিতা সংগ্রহ করিতে বসিয়াছি। আর যেই কেলা কা ফুল বলুক, ঈশ্বর গুপ্ত মোচা বলেন।
একদিন বর্ষাকালে গঙ্গাতীরস্থ কোন ভবনে বসিয়াছিলাম। প্রদোষকালে—প্রস্ফুটিত চন্দ্রালোকে বিশাল বিস্তীর্ণ ভাগীরথী লক্ষবীচিবিক্ষেপশালিনী—মৃদু পবনহিল্লোলে তরঙ্গভঙ্গচঞ্চল চন্দ্রকরমালা লক্ষ তারকার মত ফুটিতেছিল ও নিবিতেছিল। যে বারাণ্ডায় বসিয়াছিলাম তাহার নীচে দিয়া বর্ষার তীব্রগামী বারিরাশি মৃদু রব করিয়া ছুটিতেছিল। আকাশে নক্ষত্র, নদীবক্ষে নৌকায় আলো, তরঙ্গে চন্দ্ররশ্মি! কাব্যের রাজ্য উপস্থিত হইল। মনে করিলাম, কবিতা পড়িয়া মনে তৃপ্তি সাধন করি। ইংরেজি কবিতায় তাহা হইল না—ইংরেজির সঙ্গে এ ভাগীরথীর ত কিছুই মিলে না। কালিদাস ভবভূতিও অনেক দূরে।
মধুসূদন, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র কাহাতেও তৃপ্তি হইল না। চুপ করিয়া রহিলাম। এমন সময়ে গঙ্গাবক্ষ হইতে মধুর সঙ্গীতধ্বনি শুনা গেল। জেলে জাল বাহিতে বাহিতে গায়িতেছে—
“সাধো আছে মা মনে।
দুর্গা ব’লে প্রাণ ত্যজিব,
জাহ্নবী-জীবনে।”
তখন প্রাণ জুড়াইল—মনের সুর মিলিল—বাঙ্গালা ভাষায়—বাঙ্গালীর মনের আশা শুনিতে পাইলাম—এ জাহ্নবি-জীবন দুর্গা বলিয়া প্রাণ ত্যজিবারই বটে, তাহা বুঝিলাম। তখন সেই শোভাময়ী জাহ্নবি, সেই সৌন্দর্যময় জগৎ, সকলই আপনার বলিয়া বোধ হইল—এতক্ষণ পরের বলিয়া বোধ হইতেছিল।
