বিদুরের নিকট পাণ্ডবদের জনপ্রিয়তার বর্ণনা শুনে ধৃতরাষ্ট্র যে কিঞ্চিৎ বিচলিত হননি তা নয়। বিদুরই তাঁর পরামর্শদাতা, তাঁর বিশ্বস্ত মন্ত্রী। ধৃতরাষ্ট্রের কর্ণকুহরে বিদুর নিজেই হয়তো এসব রটনা শুনে ভীত বিহ্বল হবার অভিনয় করে তাঁকে অস্থির করেছেন। ধৃতরাষ্ট্র প্রকৃতই চিন্তান্বিত হয়ে মন্ত্রজ্ঞ নীতিনিপুণ মন্ত্রীবর কণিককে আহবান করে বললেন, ‘পাণ্ডবরা নাকি অতিশয় বর্ধনশীল হয়েছে, তুমি বুদ্ধি দাও আমি কী করবো।’ এই কণিকই জম্বুকের গল্পটি তাঁকে তখন বলেছিলেন। আরো যে সব মন্ত্রণা দিয়েছিলেন সে সব পড়তে পড়তে মনে হয় রাজনীতি নামক পদার্থটির মধ্যে আর যাই থাকুক নীতি নামে কোনো বস্তু নেই। কণিক প্রথমেই তাঁকে রাজার যা যা করণীয় বলে শুরু করলেন সংক্ষেপে তা হলো এই। এক, রাজার নিরবচ্ছিন্ন দণ্ড বা নিয়ত পৌরুষপ্রকাশ করা উচিত নয়। দুই, যাতে প্রতিপক্ষেরা কোষবলাদির কোনো অনুসন্ধান না নিতে পারে সে বিষয়ে সতত সতর্ক থাকা দরকার। তিন, তিনি সাধ্যানুসারে বিপক্ষের রন্ধ্রান্বেষণে তৎপর হবেন। চার, রাজার আত্মচ্ছিদ্র, গোপন পরিচ্ছিদ্রের অনুসরণ করা অবশ্যকর্তব্য। পাঁচ, অপকারী শক্রকে বধ করাই সর্বতোভাবে প্রশংসনীয়। ছয়, শক্র দুর্বল হলেও কোনোক্রমে অবজ্ঞেয় নয়। সাত, পণ্ডিতেরা বলেছেন, যদবধি সময় আগত না হয় তৎকাল পর্যন্ত শক্রকে স্কন্ধে বহন করবে। অনন্তর, নির্দিষ্টকাল উপস্থিত হলে, যেমন মৃন্ময়ঘটকে প্রস্তরোপরি নিক্ষেপ করলে চূৰ্ণ করা যায়, তাদৃশ অপকারী শক্রকে বিনাশ করবে।
মাত্রই কয়েকটি লাইন আমি এখানে তুলে দিলাম। ধৃতরাষ্ট্রর সততায় সেই সব উপদেশ বিশেষ ফলবতী না হলেও, তিনি খুব নিরাপদে আছেন সে বিশ্বাস বিঘ্নিত হলো। এই নীতি, যার নাম রাজনীতি, সেই নীতি বিষয়ে কণিক আরো বললেন, যেমন, শক্রকে শপথ, অর্থদান, বিষপ্রয়োগ, বা মায়া প্রকাশ করে বিনাশ করা বিধেয়। পরমর্মবিদারক দারুণ কর্ম সম্পাদন, ও শত শত শত্রু সংহার না করে মনুষ্য কখনোই মহতী শ্ৰী লাভ করতে পারে না। দণ্ডায়ত্ত শক্রকে যে রাজা ধনমানাদি প্রদানপূর্বক অনুগ্রহ করেন, তিনি আপনার মৃত্যু সংগ্রহ করে রাখেন। শত্রুপক্ষ সংখ্যায় অলপ হলেও কদাচ উপেক্ষা করবে না। কারণ তারাই আবার কালক্রমে শক্ৰভাব বদ্ধমূল করতে পারে।
এই সব উপদেশ ধৃতরাষ্ট্র অনুসরণ করতে না পারলেও পাণ্ডবপক্ষীয়রা যে অবিকল সেই পথেই পা ফেলে ফেলে চলছেন এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদুর, সে বিষয়ে সন্দেহ না রাখাই ধৃতরাষ্ট্রের কর্তব্য ছিলো। কিন্তু সেকথা তিনি বোঝেননি। তবে জনগণকে বিদুর যা বোঝান আর না-ই বোঝান, দৃষ্টিহীন ধৃতরাষ্ট্রকে নিজের অক্ষিদ্বয় দিয়ে যা দেখান আর না-ই দেখান, ভীষ্মচালিত রাষ্ট্রে প্রজাবিদ্রোহ ঘটানো সাঁতার কেটে সমুদ্র অতিক্রম করার মতোই অসাধ্য ব্যাপার। যদি এই মুহুর্তেই এ রাজ্যের দখল নিতে হয় তা হলে অন্য কোনো শক্তিমান রাজার সাহায্য ব্যতীত তা সম্ভব নয়। বিদুর তাঁর সতর্ক বুদ্ধি, দৃষ্টি আর শ্রবণ সজাগ রেখে বসে থাকেন রাজসভায়। কেউ কল্পনাও করতে পারে না তাঁর কুটিল অন্তর কুরুবংশের সৌভাগ্যে কী ভীষণ অগ্নিযন্ত্রণায় দপ দপ করে জ্বলছে। ভিতরে এবং বাইরে বিদুর সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মানুষ।
মহাভারতের মহারণ্যে – ১.৮
পাণ্ডবদের বিষয়ে দুৰ্যোধন এই প্রথম মুখ খুললেন, পিতাকে বললেন, ‘হে পিতঃ পৌরগণ নাকি আপনাকে পরিত্যাগ করে যুধিষ্ঠিরকেই রাজা করতে চাইছে? এই অশ্রদ্ধেয় বাক্য শুনে আমার অত্যন্ত মনোবেদনা হচ্ছে। শেষে কি আমরা রাজবংশে থেকে জনগণের মধ্যে হীন ও অবজ্ঞাত হয়ে থাকবো? পরপিণ্ডোপযোগী লোকেরা নরকভোগ করে। অতএব, হে রাজন! যাতে আমরা ঐ নরক থেকে মুক্ত হতে পারি, এরকম কোনো পরামর্শ করুন।’
বর্ধনশীল যুধিষ্ঠিরকে কীভাবে রোধ করা যায়, কী করলে ধৃতরাষ্ট্র জীবিত থাকতেই প্রজাবিদ্রোহ না ঘটে, সে বিষয়ে পিতা-পুত্র আপাতত রক্ষা পাবার মতো একটা সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হলেন।
যেখানে রাজত্ব নিয়ে পিতাপুত্রেই সংঘর্ষ হয়, যেখানে কুন্তী-বিদুর মিলে হয়তো বা পাণ্ডু-মাদ্রীকে হত্যা করতে পারেন, যেখানে কয়েকজন পর্বতনিবাসী যারা সত্যিই পাণ্ডুর ক্ষেত্ৰজ কিনা এবং প্রকৃতই যুধিষ্ঠির দুর্যোধন অপেক্ষা এক বৎসরের বড়ো কিনা সেটা প্রমাণিত তথ্য নয়, সেখানে সাবধান হওয়াটাই বা নিন্দনীয় হবে কেন?
দুৰ্যোধন বললেন, ‘কিছুদিনের জন্য পাণ্ডবরা সপরিবারে যদি অন্যত্র কোথাও গিয়ে কাটিয়ে আসেন, তাহলে আমি বিদ্রোহীদের ধন ও সমুচিত সম্মান প্রদর্শন করে তাদের পরিতুষ্ট করবো। আপনি যদি কোনোভাবে ওদের বারণাবতে পাঠিয়ে দিতে পারেন, তবে সেই সময়ের মধ্যেই আমরা সমুদয় কার্য শেষ করে নিতে পারবো। সেখানে এই সময়টাতে খুব সুন্দর একটা মেলা হয়।’
প্রকৃতই বারণাবতে সেই সময়ে একটা উৎসব হয়। সভায় বসে সকলের মুখে বারণাবতের প্রশংসা শুনে পাণ্ডবরা সেখানে যাবার জন্য বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করলেন। প্রশংসাটা অবশ্য উদ্দেশ্যমূলকভাবেই করা হচ্ছিলো। পাণ্ডবদের আগ্রহ দেখে ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ‘বেশ তো, কিছুদিন না হয় সবান্ধবে ও সপরিবারে গমন করে পরম সুখে কাটিয়ে পুনরায় হস্তিনানগরে প্রত্যাগমন করো।’ ধৃতরাষ্ট্রর এই কথার মধ্যে এমন কিছু ছিলো না যাকে ভয় দেখিয়ে পাঠানো বা জবরদস্তি বলা যেতে পারে। তদ্ব্যতীত, তিনি তাদের আমোদ আহ্লাদ করে কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে এসো এ কথাও বলে দিয়েছিলেন কিন্তু তারা ফিরে আসেননি। ফিরে আসার জন্যও যাননি।
