গুজরাটের প্যাটেল বংশে আর মেয়ে নেই। বিহার আর ওড়িষ্যা থেকে গরিব মেয়েদের কিনে নিয়ে আসা হচ্ছে এখন। এই মেয়েরা ক্রীতদাসী আর যৌনদাসী হিসেবে আর পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্র হিসেবে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
মেয়েদের মেরে ফেলে এখন মেয়ের অভাব এত তীব্র যে ‘সাতা পাধ্যাতি’ বলে একটি বিনিময়-নিয়ম চালু হয়েছে, ‘আমার মেয়ে বিয়ে দেব ছেলের কাছে একটি শর্তে, বিনিময়ে ছেলের বোনকে চাই, আমার ছেলে যেন বিয়ে করতে পারে।’
নতুন প্রজনন প্রযুক্তি এসে গেছে। মেয়েভ্রুণহত্যা এখন হাই টেক ক্তাইম সবখানে। ‘ভগবানের নিজের দেশ’ কেরালাতেও। মেয়েরা কোথাও নিরাপদ নয়। রাষ্ট্রে, সমাজে পরিবারে কোথাও না। ভাবা হত মায়ের গর্ভ সবচেয়ে নিরাপদ। এখন, মায়ের গর্ভই মেয়েদের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওখানে মেয়েশিশুর ভ্রুণ আছে, খবর পেলেই মেয়েদের নিরাপত্তা নষ্ট হচ্ছে।
ভারতের দক্ষিণও উত্তরের পথে হাঁটছে।
মেয়েরা শিক্ষিত হলে মেয়েভ্রুণহত্যা রোধ করা যাবে না। শিক্ষিত মেয়েরা অশিক্ষিত মেয়েদের চেয়েও তাদের গর্ভের ভ্রুণকে হত্যা করার পরিকল্পনা খুব ভালো নিতে পারে। শিক্ষিত মেয়েরা যারা দিব্যি আছে, তারাও কেন এ কাজ করছে! এর পেছনে কারণটি হল, ‘আত্মবিশ্বাসের অভাব’। বহু শতাব্দী ধরে হীনমন্যতার চর্চা চলেছে মেয়েদের মধ্যে, ফলে মেয়েদের রক্তে মাংসে মত্তায় জিনে ঢুকে গেছে এটি। প্রচলিত শিক্ষা দিয়ে এটি নির্মূল করা যায় না। মেয়েরা যদি রাজনৈতিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান না হতে পারে, ওইসব তথাকথিত শিক্ষা মেয়েদের ক্ষতে আরও নুন ছিটোবে, আর কিছু নয়।
পুরুষেরা শিক্ষিত স্ত্রী চায় আজকাল। তাই মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে, বিয়ের বাজারে ভালো বিকোবার জন্য। শিক্ষিত স্ত্রী হলে দোকানপাট করা, বিল মেটানো, বাচ্চাদের পড়াশোনা, ইস্কুলসমস্যা নিজে মেটাতে পারে। এক লোকতো এভাবেই বললো, ‘আমার স্ত্রীর পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি আছে অংকে, ভালো যে সে বাচ্চাদের এখন হোমওয়ার্কে সাহায্য করতে পারে। টিউটর রাখার দরকার পড়ে না তাই। আর স্ত্রী কেন বাইরে চাকরি করবে? সংসারে আমাদের তো বাড়তি টাকার দরকার নেই। তার প্রচুর কাজ পড়ে আছে ঘরে।’
শিক্ষিত নারীদের হাল এই হয় অবশেষে। তাদের উপার্জিত টাকার নাম ‘বাড়তি টাকা’। বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় বড় ডিগ্রি নিজের বাচ্চাদের হোমওয়ার্কে সাহায্য করার কাজে আসে, আর কিছুতে নয়। মধ্যবিত্ত মেয়েরা বিয়ের পর চাকরি করবে না, এরকমই চল। মেয়েদের কাজ হল ঘর সংসার করা। শুধু সেই মেয়েরা বাইরে কাজ করার অনুমতি পায়, যাদের বেঁচে থাকার জন্য টাকার ভীষণ প্রয়োজন হয়। হায় শিক্ষা! শিক্ষিত মেয়েদেরই পণ বেশি দিতে হয়। বেশি শিক্ষিত মেয়েরা বেশি শিক্ষিত স্বামী দাবি করে। শিক্ষিত স্বামী পেতে হলে পণের পরিমাণও যায় বেড়ে। পণ বেশি দিলে অনেকে ভাবে যে বুঝি মেয়েদের মান বাড়লো। পণ দিলে মেয়েদের মর্যাদা কখনও শ্বশুরবাড়িতে বাড়ে না, বরং কমে। যত বেশি পণ দেবে, তত বেশি কমবে। বরের পণ দেওয়ার নিয়ম নেই, যতই শিক্ষিত হোক, যত বড় চাকরিই মেয়ে করুক না কেন। এদেশি পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনই বুঝিয়ে দেয় মেয়েরা এই সংসারে কী মূল্য নিয়ে আছে। ফর্সা, দেখতে সুন্দর, শিক্ষিত, ভদ্র পরিবারের ঘরোয়া মেয়ে চাই। ঘরোয়া মেয়ে মানে যে চব্বিশ ঘণ্টা ঘরসংসার করবে শুধু, বাইরে চাকরি বাকরি করতে যাবে না। ভদ্র পরিবারের মেয়ে মানে যে পরিবার ভালো পণ দেবে। বর সমৃদ্ধ পরিবারের হলে পণ কম দিলেও চলবে তা নয়, বরং আরও বেশি দিতে হয়। এই যদি হয় অবস্থা কেন তবে মানুষের বিশ্বাস হবে না যে মেয়ে জন্মালে খরচ বেশি? মেয়েরা নিচুজাত, এই বিশ্বাস ভারতের নারী পুরুষ সবার মস্তিষ্কে ঢুকে গেছে। নিচুজাত বলে দূর করতে বা পার করতে পণের প্রয়োজন হয়।
পুরুষও যখন কোনও মেয়েকে টাকা দিয়ে বিয়ে করে, তখন সংসারের জন্য একটি ক্রীতদাসী কেনে সে। আর, কোনও মেয়ে যদি টাকা দিয়ে পুরুষকে বিয়ে করে, মেয়ে নিজের মানমর্যাদাহীন একটি হীন অবস্থান কেনে। মেয়েদের মুক্তি নেই কিছুতে। পণ প্রথা আইন করে নির্মূল হয়নি। ততদিন পর্যন্ত এটি নির্মূল হবে না, যতদিন পর্যন্ত পরিবারের সবাই বিশ্বাস করবে যে একটি মেয়ে কখনও একটি ছেলের মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয় না।
সমাজের অনেক বদল দরকার। মেয়েরা যে পরিবারের খুব মূল্যবান সদস্য, কেবল পণের বোঝা নয়, পুত্র উৎপাদনের যন্ত্র নয়—তা সমাজকে বুঝতে হবে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে বেশি জরুরি। নারী পুরুষ উভয়ে মিলে সমাজ বদলের চেষ্টা না করলে মেয়ে ভ্রুণ হত্যা চলতেই থাকবে সমাজে।
‘সমাজটা মেয়েদের জন্য মন্দ, তাই মেয়েদের জন্ম দেওয়াই ঠিক নয়।’ এই যুক্তিটা অনেকটা, ‘খুব চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে, নয়েজ পলুশান হচ্ছে, তাই মাথা ধরছে, সুতরাং মাথাটা কেটে ফেলা’র মতো। অনেকে বলে মেয়েরা নিজেরা লিঙ্গ পছন্দ করে শিশুর জন্ম দিলে অনেকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভ থেকে বাঁচবে। মেয়েরা কিন্তু এতে শেষ পর্যন্ত বাঁচে না, বরং মরে। কতটুকু অসহায় হলে নিজের জরায়ুর ভেতর বাড়তে থাকা ভ্রুণটির ওপর নিজের কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না! সামাজিক এবং পারিবারিক চাপের কাছে মেয়েদের বাধ্য হতে হয় গর্ভপাত ঘটাতে। অনেকগুলো অনাকাঙ্খিত গর্ভ কী আর ভয়ংকর, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর মেয়েদের নিতান্তই এই নিঃস্ব, নিরীহ, নিরুপায়, এই মানমর্যাদাহীন অবস্থা।
