এই পুরুষেরা কিন্তু সমাজে ‘ভদ্রলোক’ বলে পরিচিত। ওরা মনে করে, ঘরদোর পরিষ্কারের আর গোছানোর কাজ মেয়েদের। আর ওদের কাজ আনন্দ করার, ফুর্তি করার, বসে থাকার, শুয়ে থাকার আর আদেশ করার, এটা চাই, ওটা চাই। মেয়েরা পুরুষতান্ত্রিক-সুবিধের কারণে অচ্ছুতের জাতে নিক্ষিপ্ত হয়। পুরুষের এঁেটা আবর্জনা পরিষ্কার করার দায়িত্ব পুরুষের দিদিমা, ঠাকুরমা, কাকি, মামী, মা, বোন, বউদি, বউ, প্রেমিকা, বান্ধবী, চাকর আর মেথরের। পুরুষের এই মানসিকতা না বদলালে কোনওদিন সমাজে কোনও পরিবর্তন আসবে না। পুরুষ নারীর সম্পর্ক প্রভু দাসীর সম্পর্ক হিসেবেই রয়ে যাবে। মনুষ্যসমাজে বৈষম্য থাকলে তা নারী পুরুষ উভয়কেই ঘোচাতে হবে, এ কারও একার দায়িত্ব নয়। মনুষ্যসমাজে সমতা এবং সুস্থতা আনতে চাইলে নারী পুরুষ উভয়কেই এ কাজে ব্রতী হতে হবে, তা না হলে পুরুষের মস্তিষ্কের অসুস্থতা, নিজেদের রাজা বাদশাহ ভাবার আর নারীদের চেয়ে নিজেদের উন্নত শ্রেণীর মনে করার অসুস্থতা কোনওদিনই দূর হবে না।
৩. দীপা মেহতার ওয়াটার ছবিটি দেখলাম। অসাধারণ ছবি। কী চমৎকার দেখিয়েছেন ধর্মের শাসন, মেয়েদের দুর্ভোগ, বৈধব্যের যন্ত্রণা। কী মর্মান্তিক সেইসব দৃশ্য, যখন আট বছর বয়সী মেয়েকে বিধবার সাদা থান পরিয়ে দেওয়া হল। ঠেলে দেওয়া হল বিধবা আশ্রমে। কী মর্মান্তিক সেই দৃশ্য যখন মেয়েটিকে ধর্ষণ করে নৌকোয় ফেলে রাখা হয়েছিল। নৌকো চলছে। জগত চলছে জগতের মতো নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে।
পাঁচশ বছর ধরে বিধবা-বৃদ্ধাদের, এমনকী বিধবা-বালিকাদেরও ছুড়ে ফেলে দেওয়া হচ্ছে ওই অঞ্চলে, যেন ওরা মরে শিগগির। ওয়াটার ছবির ঘটনা প্রায় সঙ্গের বছর আগের। কাশির আশ্রমে বিধবা মেয়েদের জীবনের করুণ কাহিণী বর্ণনা করা হয়েছে। মেয়েদের ওপর যে নির্যাতন চলছিল তখন, এখন না হয় ঠিক সেরকম নেই, কিন্তু কিছু কি একটুও নেই? এখানে, কলকাতার লেখাপড়া জানা ফ্যাশন করা মেয়েরা জানে যে ‘ভারতবর্ষের মেয়েরা ভীষণ রকম স্বাধীন। হিন্দু মেয়েদের মতো এত স্বাধীনতা জগতে কেউ কোনওদিন পায়নি।’ বিধবা বিবাহের পক্ষে আইন আছে, সুতরাং দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। তারা কি কাশি বৃন্দাবনে একবার উঁকি দিয়ে দেখেছে কত শত বিধবা ওখানে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে! তারা কি কলকাতারই ঘরে ঘরে বিধবাদের হবিষ্যির পাতের দিকে তাকিয়েছে কোনওদিন?
না, নারী-বিরোধী-কুসংস্কার সেই সমাজ থেকে কোনওদিনই যাবে না, যে সমাজে নারী পুরুষের মধ্যে সমতার কোনও সংস্কৃতি নেই, যে সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার জয়জয়কার।
৪. টেলিভিশনে কিছু ধারাবাহিক নাটকের দু একটি পর্ব আমার দেখা হয়েছে। আমি খুব অবাক হয়ে দেখি নাটকের মেয়েরা যখন ঘরে থাকেন, ঘরের কাজকর্ম করেন, ঘুম থেকে ওঠেন, বা ঘুমোতে যান, মুখে তাদের কড়া মেকআপ থাকে। শরীরে অসম্ভব সাজগোজ। টেলিভিশনের পরিচালক ক’জনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে বাস্তবের সঙ্গে মোটেও তো মিলছে না, এমন সেজে কি মেয়েরা ঘরে বসে থাকে? পরিচালক বললেন, ‘উপায় নেই, মেয়েরা ওরকম না সাজলে টিআরপি কমে যায়, দর্শকরা দেখতে পছন্দ করে না মেয়েদের রঙচঙহীন মুখ।’
‘তাই বলে ঘুমোবে ওই লিপস্টিক রুজ আইস্যাডো আইলাইনার, কপালে বড় বড় টিপ আর গা-ভরা গয়নাগাটি পরে?’
পরিচালকরা বললেন, হ্যাঁ।
ছেলেদের বেলায় নিশ্চয়ই এ নিয়ম নেই। ওঁরা মাথা নেড়ে সায় দিলেন, নেই। মেয়েরা যা, তা দিয়ে কেন চলে না? মেয়েদের কেন বাড়তি রঙের, বাড়তি ঢংএর দরকার হয়? মেয়েদের কেন শরীরের নানান জায়গা থেকে মেদ কমিয়ে ফ্যাশন ম্যাগাজিন, ফ্যাশন-শো বা বিত্তাপন জগত প্রস্তাবিত একটি ফিগারএর দরকার হয়? এই প্রশ্নগুলো কেউ কি করেছে কখনও? শরীরের সৌন্দর্য ছাড়া, যে সৌন্দর্যের সংত্তা তৈরি করেছে পুরুষ, মেয়েদের নিতান্তই মূল্যহীন এবং আকর্ষণহীন মনে করা হয়। তাই সৌন্দর্য রক্ষা করার নানারকম কায়দা কানুন শিখতে বাধ্য হচ্ছে মেয়েরা। এই পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষেরা তাদের ব্যক্তিত্ব, তাদের গুণ, জটিল এবং জটিলতর বিষয়ে তাদের জ্ঞান, তাদের দক্ষতা, পারদর্শিতা ইত্যাদি প্রদর্শন করতে পারে। আর ওদিকে শরীর ছাড়া নারীর প্রদর্শনের কিচ্ছু নেই। নারীর সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায় এক শরীরের কাছে। যে সব জিনিসকে নারীর গুণ বলে ধরা হয়, তা পুরুষের প্রয়োজনে লাগে বলেই, এবং নারীকে অবদমিত রাখে বলেই। যেমন রান্নাবান্না, ঘরকন্না, যেমন সেলাই সেবা সহমর্মিতা, ভীষণরকম পরনির্ভরশীলতা, যেমন নত নম্র স্বভাব, যেমন লজ্জা ভয়।
নারীর জন্য নারীর জীবনে কিচ্ছু নেই। নারী যদি কোনও কোম্পানীর বড় পদে কাজ করে, পরিচালক হয়, মালিক নয়, নারী যদি ব্যবসায় বিশাল সাফল্য লাভ করে, নারী যদি বড় ডাক্তার ইঙ্গিনিয়র হয়, বিত্তানী হয়, নভোচারী হয়, বড় লেখক হয়, শিল্পী হয়, বড় রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ হয়, তবে সমাজের সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে নারী সমর্থ হয়। শরীর না প্রদর্শন করে বা না ব্যবহার করে যে সাফল্য নারীর আসে, সেই সাফল্য সত্যিকার সাফল্য। কিন্তু সাফল্যকে কখনও নারীর গুণ বলে ধরা হয় না। পদগুলো পুরুষিক, মাসক্যুলিন। উঁচুপদগুলো উঁচুস্তরগুলো কখনও ফেমিনিন নয়, তাই মানুষের শ্রদ্ধা অফুরন্ত ওই পদগুলোর জন্য, মাসক্যুলিন পদের প্রতি শ্রদ্ধা, এই শ্রদ্ধার পদে যে কেউ বসুক, শ্রদ্ধা তার প্রতি থাকেই, নারী হলে নারীর প্রতিও। এ কিন্তু মানুষ হিসেবে নারীকে শ্রদ্ধা করা নয়। ওই উচ্চতাকে শ্রদ্ধা করা, ওই সাফল্যকে শ্রদ্ধা করা, যে উচ্চতা বা সাফল্যের সমার্থক শব্দ পৌরুষ।
৩১. নারী = শরীর
‘নিঃশব্দ’ দেখে এসে আমার মনে হচ্ছিল, ‘এর উল্টোটি কি হতে পারতো? ষাট বছরের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে আঠারো বছর বয়সী একটি ছেলে, এই গল্প নিয়ে সিনেমা?’ না, হতে পারতো না। পুরুষ সে যত বৃদ্ধই হোক, যত কুৎসিত হোক, সে পুরুষ। সে বিরাট সে মহান। তাই বিরাটের প্রেমে পড়া সহজ। ষাট বছরের নারী সে যা কিছুই হোক, যত ত্তানী হোক, যত গুণী হোক, যত আকর্ষণীয় ব্যক্ততি্বের অধিকারী সে হোক না কেন, তার একটিই পরিচয় সে বৃদ্ধা, লোলচর্মসর্বস্ব বৃদ্ধা। নারীকে বিচার করা হয় তার শরীর দিয়ে। শরীর গেল তো নারী গেল। পুরুষ যায় না। অমিতাভ তাঁর বলিরেখা নিয়েও কিশোরীর প্রেমিক হতে পারেন, মেগাস্টার হিসেবে ভূভারতে চুটিয়ে রাজত্ব করতে পারেন। মাধবী কিন্তু তাঁর বলিরেখা নিয়ে আর যাই হোন, তারকা হতে পারেন না। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর লোলচর্ম নিয়েও তারকা হয়ে শহর জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সুচিত্তা সেনকে বছরের পর বছর ঘরবন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে। রেখাকে টিকে থাকতে হয় বলিরেখা নির্মূল করে, অমিতাভর তার দরকার পড়ে না।
এ কেবল উদাহরণ মাত্র। সমস্যা সিনেমা জগতে নয়। সমস্যা সমাজে। মেয়েদের সৌন্দর্যই মেয়েদের সম্পদ, এই ধারণা বা বিশ্বাসটি সম্পূর্ণই রাজনৈতিক। রাজনৈতিক, কারণ এটি পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে। মেয়েদের সৌন্দর্যকে মেয়েদের সম্পদ বলে বিবেচনা করা না হলে মেয়েদের শিক্ষা সচেতনতা, বোধ বুদ্ধি, দক্ষতা বিচক্ষণতা ইত্যাদি গৌণ না হয়ে মুখ্য হয়ে উঠবে। উঠলেই বিপদ পুরুষতন্ত্রের। নারীকে আর খেলনা পুতুল বানিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
কোনও একটি ব্যবস্থাকে যদি দীর্ঘ-দীর্ঘকাল সমাজে টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে সেটির পেছনে তুখোড় রাজনীতি কাজ করে। শিশুকে জন্মের পর থেকে লিঙ্গ-ভিত্তিক বৈষম্যে লালন করা, এবং মস্তিষ্কে পুরুষ সামনে, নারী পেছনে, পুরুষ বুদ্ধিমান, নারী বোকা, পুরুষ প্রভু, নারী দাসী-র শিক্ষাটি ঢুকিয়ে দেওয়া সামাজিক নয়, রাজনৈতিক। পুরুষতন্ত্রের বা পুরুষবাদের রাজনীতিটি এত শক্তপোক্ত যে জগতে পুঁজিবাদে চিড় ধরে, সমাজতন্ত্র ভেঙে যায়, কিন্তু পুরুষতন্ত্র যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে থাকে, আগের চেয়ে আরও মজবুত হয়ে।
নারীর কিছুই নারীর নিজের নয়। নিজের যে জীবন, সে জীবনটিও নারীর নয়। নারী পুরুষের সম্পত্তি, শুধু পুরুষেরই নয়, পুরুষ শাসিত এই ‘সমাজের সম্পত্তি’। সমাজ কড়া নজর রাখে নারীর যৌনাঙ্গ অক্ষত আছে কি না, নারীর পোশাক আশাক চাল চলন ‘সঠিক’ কি না, বয়স থাকতেই বিয়ে হল কি না, স্বামীসেবা ঠিকঠাক সে করছে কি না, পুত্রসন্তান জন্ম দিচ্ছে কি না, সতীলক্ষ্মী হিসেবে জীবন পার করছে কি না। সমাজকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে সমাজ নারীর শাস্তির ব্যবস্থা করে। কঠিন শাস্তি।
নারীর সতীত্বের দিকে লোকের যে কড়া নজর ছিল, সেটি এখন, বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলোতে, সরে এসেছে নারীর শরীরের আকার আকৃতির দিকে। পুবের দেশে এখনও কড়া নজর সতীত্বের দিকে যেমন ছিল, তেমন আছেই, বরং নতুন একটি নজর তৈরি হয়েছে, সেটি মেয়েদের শরীরের দিকে। গলা, ঘাড়, বুক, পেট, তলপেট, উরু, পা ইত্যাদির আকৃতি কেমন হবে, তা বলে দেওয়া আছে, সেই মতো না হলে মেয়েদের ওপর হুমকি আসে, ধিত্তার আসে, ছিছি আর চুকচুক চলে। অল্প বয়সী মেয়েরা মেয়ে-পছন্দের বাজারে টিকে থাকার জন্য খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে বুলেমিয়া, অ্যানোরেঙ্গিয়া রোগে ভুগছে। শরীরের কোন আনাচে কোন কানাচে কী খাঁজ কী ভাঁজ থাকলে লোকের চোখ জুড়োবে, তার পেছনে মেয়েরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছে। জায়গা মতো ভাঁজ চাই, বেজায়গায় ভাঁজ পড়ে গেলে মাখতে হচ্ছে ভাঁজ দূর করার দামি ওষুধ, তাতেও কাজ না হলে দৌড়োতে হচ্ছে কসমেটিক সার্জারির জন্য।
