মাকে আমি উচ্চারণ করি, মাকে আমি উচ্চারণ করছি। আমি উচ্চারণ করছি তোমাকে আমার ভাষা, তোমাকে উচ্চারণ করতে চাই, যতদিন শ্বাস নেব। তোমাকে ভালোবাসব, যতদিন বাঁচব। তোমার কাছেই বারবার ফিরে আসবো। আমি তো চিরকালের নিরাশ্রয়, ভাষা তুমি আমাকে দেখে দেখে রেখো। মানুষের মার খেয়ে, ঘৃণা পেয়ে যখন নুয়ে পড়ব, ভাষা তুমি সাহস দিও ভাষা তুমি শক্তি দিও, মা যেমন শক্তি দিত।
প্রতিবাদ আমি লিখছি, পাথরগুলো সরাচ্ছি পথ থেকে, পথগুলো পথ হোক। আমাদের প্রাপ্য তো খল-পুরুষেরা লুটেপুটে খেল, আমরা নারীরা আজ বোবা, ভাষাহীন। যতবারই কথা বলতে চাই, ততবারই মুখ চেপে ধরে ওরা। গলায় গরল ঢেলে দেয়। যতবারই কথা বলতে চাই, ততবারই ঠোঁটে সেলাই, জিভে কাঁটা। আমরা নারীরা আজ কীকরে কাকে জানাবো যে আমরা ভালো নেই! হাজার বছর ধরে পিঠে কালসিটে, চোখ নির্ঘুম, হাজার বছর ধরে আমরা ভাষাহীন। নারীর কজ্ঞে এবার ভাষা উঠে আসুক, স্ফূলিঙ্গ হোক সে, আগুনের মতো ছড়িয়ে যাক সবখানে, নারীরা পুড়ে পুড়ে ইস্পাত হোক। নারী শক্তিময়ী হোক।
ভাষা তুমি মা,
ভাষা তুমি আমি,
ভাষা তুমি বোন।
নারী আজ উচ্চারণ করছে ভাষা, নারী আজ উচ্চারণ করছে প্রতিবাদ। নারী আজ কজ্ঞে নিচ্ছে তীক্ষ্ণ তীব্র ভাষা, নারী আজ উচ্চারণ করছে নারীর জন্য নারীর ভালোবাসা।
আমি এবং আমার ভাষা আজ খোলামেলা ঘুরে বেড়াচ্ছি, আমাদের স্বাধীনতার পায়ে কেউ শেকল পরাতে এসো না, আমাদের মুক্তকণ্ঠকে কেউ চেপে ধরতে এসো না, আমাদের ভালোবাসার বুকে কেউ ছুরি বসাতে এসো না।
ক্ষমতা তুমি দূরে সরে থাকো,
ক্ষমতা তুমি পাথর ছুড়ো না,
ক্ষমতা তুমি পথরোধ করো না,
ক্ষমতা তুমি ভালোবাসতে শেখো,
ক্ষমতা পারোতো মানুষ হও,
ক্ষমতা তুমি মানুষ হও, মানবিক হও।
আমাকে থাকতে দাও আমার মতো, নির্বিবাদে, ভাষায়ভালোবাসায়। আমাকে থাকতে দাও আমার মায়ের কাছে, আমার মায়ের চোখের জল ধুয়ে দেবে আমার গায়ের ধুলোকালি। আমার মায়ের কোলটি থাকবে আমার জন্য, ওই কোলে সুখে কিংবা দুঃখে আমি ফিরবো, মা তো চিরকালই ডাকতেন আমাকে, তাঁর কোলে।
২৮. সানেরার মতো মেয়ে চাই। আছে?
বীরভূমের আলুন্দা গ্রামের মেয়ে সানেরা যা ঘটালো, তা ক’জন মেয়ে ঘটাতে পারে? ক’জন মেয়ে বিয়ের মালা খুলে ফেলতে পারে বিয়ের আসরেই? আঠারো বছর বয়সের একটি মেয়ে দেখিয়ে দিল বুকের পাটা। কারও অনুরোধে সে ঢেঁকি গেলেনি। যা তার ইচ্ছে করেছে, করেছে। সে এই বিয়ে ভেঙে দেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভেঙে দিয়েছে। যে লোক বিয়ের আসরেই মেয়ের বাবাকে অপমান করতে দ্বিধা করেনি, সে যে মেয়েকে উঠতে বসতে জীবনভর অপমান করবে, তা সানেরা বুঝে গিয়েছে। সানেরা ওই দুর্বিষহ জীবন চায়নি, চায়নি বলেই বিবাহিত জীবন শুরু করার আগেই ওটি সে শেষ করেছে।
বয়স মাত্র আঠারো সানেরার। এই বয়সে সাধারণত পরিবারের চাপের কাছে নত হতে মেয়েরা বাধ্য হয়। প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হতে মেয়েদের সময় নেয় অনেক। অবশ্য যার তৈরি হয় না, তার সারা জীবনেও হয় না। কেউ কেউ কিশোরীবয়সে বেশ প্রতিবাদী, যেমন ইচ্ছে তেমন চলছে, নিজের অধিকারের ব্যাপারে ভীষণ সজাগ, কিন্তু যেই না বিয়ে নামক জিনিসটি ঘটার সময় হয়ে আসে, তখন একেবারে বাবা মার পছন্দ করা পাজ্ঞের গলায় চোখ কান বুজে ঝুলে পড়ে। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দিব্যি বাধ্য বধূ। শান্ত, সমাহিত। কোনওএক কালে কিশোরীবয়সে দুরন্ত ছিল সে, দস্যি ছিল, বিকেলের চায়ের সঙ্গে মুচমুচে স্মৃতি হয়ে থাকে ওসব।
ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের বাংলা অনুবাদ নারী নির্যাতন হওয়াই যুক্তিসঙ্গেত। কারণ ভায়োলেন্স সাধারণত নারীর ওপরই হয়, পুরুষ দ্বারা। আপাতত একে গৃহনিগ্রহ বলেই উল্লেখ করছি। রাষ্ট্রপুত্র বলছে, ‘ভারতর্ষের দুই তৃতীয়াংশ বিবাহিত নারী গৃহনিগ্রহের শিকার।’ নতুন একটি আইন হয়েছে গৃহনিগ্রহের বিরুদ্ধে। কিন্তু ক’জন মেয়ে এই আইনের আশ্রয় নেবে? সানেরার মতো মেয়ে ছাড়া কারও কি সাহস হবে এই আইনে ফাঁসিয়ে অত্যাচারী স্বামীকে জেলের ভাত খাওয়াতে? হবে না ভয় এবং লজ্জার কারণে। ‘ভয়’ এবং ‘লজ্জা’ এ জিনিসদুটো মেয়েদের সতীত্বের মতো পবিত্ত। যে মেয়ে সমাজকে ভয় পায় না, সমাজের সামনে লজ্জা বলতে কিছু যার নেই, সে তার ইজ্জত বা সতীত্ব খোয়ানোর মতো অপরাধ করে। গৃহনিগ্রহ আইনকে কাজে লাগাতে সানেরার মতো মেয়ে চাই। আছে?
সানেরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। তোয়াত্তা করেনি এরপর কী হবে না হবে তার। বিয়ে হবে না আর? না হোক, সে পরোয়া করছে না। বরং বলছে, ‘বিয়ে করতেই হবে তার কী মানে আছে?’ এ কথা এই নারীবিদ্বেষী সমাজে মেয়েদের মুখে মুখে থাকার কথা, কিন্তু শহুরে শিক্ষিত স্বনির্ভর মেয়ের মুখ থেকেও এত ঋদ্ধ বাণী উচ্চারিত হয় না, যা হয়েছে আলুন্দা গ্রামের এক দরিদ্র রিত্তাওয়ালার মেয়ে সানেরার মুখ থেকে। সানেরা মানে যে বিয়ে না করেও সে দিব্যি ভালো বেঁচে থাকতে পারে। বলছে, ‘আমি সেলাই জানি, কাপড়ে সেলাইয়ের আলপনা তুলবো। খেটে বাকি জীবনটা কাটাবো।’ এমন আত্মবিশ্বাস যদি আজ নারীদের থাকতো, পৃথিবী বদলে যেত। নারী যদি অত্যাচারী পুরুষের সঙ্গে জীবন আর যাপন করবে না বলে মনস্থির করে যেমন সানেরা করেছে, যদি বোঝে যে দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো, অথবা কোনও বদমাশের সঙ্গে থাকার চেয়ে একা থাকাই ঢের ভালো, এবং নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কোনও কাজ খুঁজে নেয়, এবং নিজের আত্মসম্মান নিয়ে চলার সংকল্প করে, তবে সত্যিই, পৃথিবী বদলে যেতে বাধ্য। কিন্তু, সানেরার মতো মেয়ে কি খুব বেশি আছে?
