কে আমাকে শিখিয়েছে প্রেমিকের মন ভরাতে? পুরোনো কোনও শিক্ষা কি এখনও ঘাপটি মেরে কোথাও লুকিয়ে আছে ভেতরে? কর্কট রোগের মতো এই শিক্ষা, জীবনবিনাসী শিক্ষা, ধ্বংস করে ছাড়ে। হামুখো মৃত্যুকে টেনে এনে আস্ত জীবনটাই মুখে পুরে দেয়। আর প্রচণ্ড প্রাণশক্তি নিয়ে বেঁচে থাকা, পৃথিবীর সব ধর্ম আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে, কুৎসিত পুরুষতন্ত্র, যুদ্ধ আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েও, মানবতার জন্য বিশ্বজুড়ে লড়াই করা অনমনীয় আপোসহীন আমিই কিনা নত হই অমানবিক পুরুষের কাছে। পুরুষতন্ত্রের সুবিধে ভোগ করা, যুগ যুগ ধরে নারীকে দলে পিষে আরাম করা পুরুষের কাছে।
কী যুক্তি দেব আমি এর! এই ভুলের, এই অধঃপাতের! একটিই সান্ত্বনা যে আমার ঘোর কেটে যায় যখনই চাবুক পড়ে পিঠে। পুরুষ মাথায় উঠলেই মাথা বনবন করে ঘোরে আমার। একটিই সান্ত্বনা যে তাকে না নামিয়ে আমার আর চলে না তখন। পুরুষকে মাথা থেকে নামানোর সময়, মাকড়শার মতো জীবন আঁকড়ে পড়ে থাকা পুরুষকে ঠেলে সরানোর সময় অসম্ভব শক্তি পেয়ে যাই মনে আর শরীরে। প্রেমের শেকল ছিঁড়ে, প্রেমিকের কালিধুলো ঝেড়ে উঠে আবার দাঁড়িয়ে পড়তে পারি। দাঁড়ানো আমিটি কোনও বৈষম্যের সঙ্গে আপোস করে না। দাঁড়ানো আমিটি পেছন ফিরে তাকায় না। দাঁড়ানো আমিটি পুরুষ পোছে না। দাঁড়ানো মানুষটি একজনের সঙ্গেই প্রেম করতে পারে, একজনের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব হতে পারে, সে হল মানুষ। এ সমাজের পুরুষ এখনও পুরুষ, এখনও মানুষ নয়। যতদিন ‘মানুষ’ না হয়, ততদিন প্রেম নৈব নৈব চ।
পুরুষ কি আদৌ কোনওদিন মানুষ হবে! ঘোর পিতৃতন্ত্রের মধ্যে ডুবে থেকে আর যা কিছুই হওয়া যায়, ‘মানুষ’ হওয়া যায় না। মানুষ বলতে আমি বুঝি যার মনুষ্যত্ব আছে, মানবিক গুণ আছে, যে মানববাদে বিশ্বাসী। মানুষ বলতে বুঝি মানুষের প্রতি অন্যায় যে করে না, মানুষে মানুষে অসাম্য যে মানে না, কেবল লিঙ্গগুণে নিজেকে উন্নততর জীব বলে বিচার করে না। তারাই মানুষ, যারা নারী ও পুরুষের মধ্যে ক্ষুদ্রতম কোনও বৈষম্যও মেনে নেয় না, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, যুদ্ধ করে, এবং নিজের জীবনে বৈষম্যের ছিঁটেফোঁটারও চর্চা করে না নারীকে অসম্মান করা, নারী বলে নারীকে অবত্তা করা পুরুষের চরিত্রের অন্তর্গত। পুরুষ কি চাইবে ‘চরিত্রহীন’ হতে? প্রেমিকের ভেতর থেকে যখন বেরিয়ে আসে পুরুষ, সে আর প্রেমিক থাকে না। এ আমার জীবনে আমি বারবারই দেখেছি। প্রেমিককে পুরুষ নয়, মানুষ বলে বারবারই আমি ভুল করেছি।
যে নারীরা আমার মতোই প্রেমে বিশ্বাসী, যারা ভোগে, যারা মরে, তারাও যদি আমার মতো উঠে দাঁড়াতে পারতো, পুরুষের ধুলোময়লা ঝেড়ে পুরুষহীন মানবিক জীবন কাটাতে পারতো, পৃথিবীটা সুন্দর হত খুব। পুরুষতন্ত্রের বাইরে না বেরোলে কোনও পুরুষই, আমি সত্য বলছি, যে, নারীর একবিন্দু প্রেম পাবারও যোগ্য নয়।
২৬. সমকামীদের গর্তে লুকিয়ে রেখে প্রগতিশীল হওয়া অসম্ভব
আমার পশ্চিমী বন্ধুদের প্রায় অর্ধেকই সমকামী। সে কারণে ইওরোপ আমেরিকার সমকামী বারে রেস্তোরাঁয় নৃত্যমজ্ঞে আমার প্রচুর যাওয়া আসা। নিউইয়র্কে সমকামীদের যে বিশাল গে প্রাইড প্যারেড হয় প্রতিবছর, সেটিতেও সমকামী-সমর্থক হিসেবে নেমে গেছি মহানন্দে। সমকামীরা তাদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করছে বহু বছর। অনেক অধিকারই অর্জন হয়েছে, অনেক বাকি রয়ে গেছে। উত্তর ইওরোপের দেশগুলোয় সমকামীরা সবচেয়ে বেশি অধিকার পায়। ওখানে বিয়ে তো বটেই, দণ্ডক সন্তানের উত্তরাধিকারের ব্যাপারে যে প্রশ্ন ছিল, সেটিরও ফয়সালা হয়ে গেছে। ওসব দেশে সমকামীরাও আজ রাষ্ট্রপ্রধান, আজ প্রধানমন্ত্রী।
সমকামীদের অধিকারকে সমর্থন যে করে না, সে মানবাধিকারকে সমর্থন করে না। প্রতিটি মানুষেরই অধিকার আছে নিজের যৌনইচ্ছের প্রকার এবং প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া, সেই মতো সঙ্গেী খুঁজে নেওয়া, এবং একত্রবাস করা। একত্রবাস করছে আমার অনেক সমকামী বন্ধু। দুএকজন শখ করে বিয়ে করেছে। দণ্ডক নিয়েছে কিছু সমকামী পুরুষ-বন্ধুজুটি। সেদিন প্যারিসে আমার দুই সমকামী মেয়ে-বন্ধুর সাজানো সংসারে গিয়ে দেখলাম একজন সবে মা হয়েছে। কী ব্যাপার, স্পার্ম পেলে কোজ্ঞেকে? কোন পুরুষের সঙ্গে শুয়েছো? না, শুয়ে নয়। স্পার্ম নেওয়া হয়েছে তাদেরই এক সমকামী পুরুষ বন্ধু থেকে। সমকামী মেয়ে-বন্ধু দুজনই নবজাতক শিশুটিকে একইরকম আদরে লালন পালন করছে। পুরুষ এবং নারী যখন শিশুর বাবা মা, তখন কিন্তু শিশুর লালন পালন একা নারীকেই করতে হয়, বাচ্চাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, বাচ্চার কাঁথা কাপড় পাল্টানো ইত্যাদি হাজার রকম কাজের ক’টি পুরুষ করে?
পেরেন্টস যদি দুজনই নারী হয়, তবে শিশুর যত্ন যেমন বেশি হয়, তেমনি শিশুও বড় হয় বৈষম্যহীন একটি পারিবারিক পরিবেশে। শিশুর লালন পালনের ভার একজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না। সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি হল, দুই নারীর সংসারে উঁচুলিঙ্গ উচুঁনাক আর মানকচু মাচোঘেঁচুর ঝামেলা নেই।
সেদিন এই কলকাতায়, যে কলকাতাকে বিরাট এক প্রগতিশীল শহর আর ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলে বেশিরভাগ লোক বিশ্বাস করে, সেখানে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে রাখা এক সমকামী মেয়ে আমার কাছে বললো এসে তার যন্ত্রণার কথা। কোনও পুরুষকে সে বিয়ে করেনি। বাবা মা ক্ষুব্ধ। মেয়েটির পছন্দ মেয়ে। মেয়ে নিয়ে সে ঘরে গেলে লোকে নিন্দে করে। পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেছে। এই মেয়ে নাকি ‘খারাপ’। একত্রবাস চায় সে তার প্রেমিকাটির সঙ্গে। সম্ভব নয় এই কলকাতা শহরে। বলতে বলতে মেয়ে কাঁদছিল। বললাম, ‘লোকে যা ইচ্ছে তাই বলুক, তোমার যেটা ভালো লাগে সেটা করবে।’ বললাম বটে, কিন্তু মেয়ে কী করে টিকে থাকবে শহরে! একে তো বাঁচতে দেবে না। সমকামী হওয়ার অপরাধে এখন চাকরি চলে যাচ্ছে মানুষের। মেয়েটি চাকরি যাবার ভয়ে, পাড়া থেকে তার অপসারণের ভয়ে নীল হয়ে থাকে। আমার খুব কষ্ট হয় মেয়েটির জন্য, তার দুর্ভোগের জন্য। কষ্ট হয় পচা পুরোনো পুরুষতান্ত্রিক প্রথায় পড়ে থাকা রক্ষণশীল হোমোফোবিকদের জন্য। তাদের নির্বুদ্ধিতার জন্য।
