উড়িয়ে দিলে যৌন হেনস্থার সুযোগ পাবে না বলে! যে-পরিবারের বড়াই করে আসছে ভারতীয় সমাজ, সেখানেই জঘন্য অপরাধ ঘটে চলেছে। মেয়েশিশুদের ওপর চলছে যৌন হেনস্থা। বাবা কাকা দাদা জ্যাঠামশাই ঠাকুরদা দাদুর পরিবারে একটি ছোট্ট মেয়ে-শিশু নিরাপদ নয়।
‘দেশের ৫৩ শতাংশ শিশু কোনও না কোনওভাবে যৌন হেনস্থার শিকার। এর মধ্যে ধর্ষণ, পায়ুসঙ্গেম, যৌন নিগ্রহ থেকে শুরু করে জোর করে চুম্বন পর্যন্ত রয়েছে। এক-পঞ্চমাংশ শিশু চূড়ান্ত যৌন নির্যাতনের শিকার। ৮৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ওই যৌন হেনস্থা করেছেন পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠরাই। ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে ওেই ব্যক্তিটি শিশুর পরিচিত কেউ। গোটা ব্যাপারটা পরিবারের মধ্যেই ধামাচাপা পড়ে যায়। কেউ মুখ খোলেন না। অসহায় শিশুরা অন্ধকারেই থেকে যায়। ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে তারা কিছু জানাতেই পারে না।’ গতকাল প্রকাশ হওয়া কেন্দ্রীয় সরকারি সমীক্ষা রিপোর্ট এটি।
পশ্চিমবঙ্গ অপরাধের শীর্ষে। এ রাজ্যের নারী পুরুষ উভয়ের কাছ থেকে সবসময় শুনে আসছি, ‘সবচেয়ে প্রগ্রেসিভ রাজ্য এটি। অন্যান্য রাজ্যে হয়তো নারী নির্যাতন হয়, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কখনও নয়।’ ‘প্রগ্রেসিভ’ শব্দটি খুব ব্যবহার হয় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে। জানি না আজ তারা কেন্দ্রের এই সমীক্ষার কথা শুনে কী বলবেন। হয়তো নাক সিঁটকে বলবেন, ‘শহরে তো নয়, হলে গ্রামের দিকে হয়।’ যদি শহরের উদাহরণ দেখাই, ‘বাগবাজারে তো হচ্ছে’, বলবে, ‘ও তো উত্তরে হচ্ছে, দক্ষিণে তো হচ্ছে না।’ যদি দক্ষিণের উদাহরণ দিই, যে, ‘টালিগজ্ঞে হচ্ছে’, বলবে, ‘টালিগজ্ঞে হয় হোক, বালিগজ্ঞে তো হচ্ছে না!’ এত চোখ কান বুজে থাকা মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। প্রতিবেশীর বাড়ি দাউ দাউ করে জ্বলছে, কিন্তু যতক্ষণ না নিজের লেজে আগুন লাগছে, ততক্ষণ সে ঘুমিয়ে থাকবে এবং স্বীকার করবে না যে আগুনের ছিটেফোঁটাও কোথাও আছে।
যৌন নির্যাতনের কারণে মেয়েশিশুরা এত বেশি বিপন্ন বোধ করছে যে, ৪৮·৪ শতাংশ মেয়ে বলছে ‘কেন ছেলে হয়ে জন্মালাম না!’ তারা ছেলে হয়ে যেতে চাইছে। আমিও যেমন ছেলে হয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
ছেলে হয়ে গেলে নিরন্তর পীড়ন নেই। একটি মেয়ের তো ভোগা কেবল শিশুবয়সেই নয়, সব বয়সেই তাকে ভুগতে হয়। কৈশোরে, যৌবনে, প্রৌঢ়ত্বে, বার্ধক্যে। ভুগতে কে চায়! মেয়েদের, এই সত্য, যে, না মরে মুক্তি নেই।
আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে পৃথিবীর সব মেয়েই একদিন ছেলে হয়ে গেছে। মেয়ে বলতে আর কিছু নেই কোথাও। তখন সম্ভবত পুরুষতন্ত্র বলে কিছুর আর অস্তিত্ব থাকবে না। পুরুষতন্ত্র তো মেয়েদের পেষণ করার জন্যই। মেয়ে না থাকলে পেষণ আর কাকে করবে! পুরুষেরা যুদ্ধ করবে, মরবে, কিছু পুরুষ আবার শান্তির কথা বলবে, শ্রেণী সংগ্রাম আর সাম্যের দাবিতে পথে নামবে। পুরুষেরা স্বাভাবিক কারণেই সমকামী হবে। তাদের ভগবানের কাছে তারা জরায়ু কামনা করবে, সেই জরায়ু যেন কোনও এক শুভক্ষণে কন্যা-সন্তান ধারণ করতে পারে। পুরুষেরা স্বপ্ন দেখবে সেই কন্যা জন্মানোর পর পৃথিবীর সব পুরুষ মিলে তাকে ধর্ষণ করছে। ধর্ষণ করছে কন্যা যতক্ষণ বেঁচে থাকে ততক্ষণ, প্রতিমুহূর্ত। সেই কন্যা যখন আরেক কন্যা জন্ম দেবে, তাকেও জন্মানোর পর থেকে ধর্ষণ করছে তারা।
কিন্তু পুরুষের এই স্বপ্ন সফল হবে না। পুরুষ স্বপ্ন দেখতে থাকবে যতদিন না তারা এক এক করে মরে গিয়ে মানবজাতির বিলুপ্তি ঘটায়।
মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য জীবনভর পুরুষের অন্যায়-অত্যাচার সয়ে মেয়েদের কেন মরতে মরতে বেঁচে থাকতে হবে! এই জাতিকে টিকিয়ে রাখার দায় কী কারণে কী স্বার্থে মেয়েরা নেবে! তার চেয়ে বিলুপ্তিই ভালো। যে প্রাণীরা সুখে থাকে, সমতায় থাকে, ভালোবাসায় ভরে থাকে, অন্যকে খাবলে খায় না, কামড়ে মারে না, অন্যের রক্তে হোলি খেলে না, তারা বেঁচে থাকুক এই পৃথিবী নামের গ্রহে। মানুষ ইতিহাস হোক। পুরুষের কলজ্ঞের ইতিহাস।
২২. ডিভোর্স হয় না বলেই ব্যভিচার বাড়ে
ডিভোর্স হয় না এদেশে। ডিভোর্স হওয়ার কোনও কারণ নেই। নারী পুরুষ যখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় তখন তাতে অলিখিত বা লিখিত যে শর্ত থাকে তা হল স্বামী উপার্জন করবে, বাড়ির সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে, আর স্ত্রী স্বামীর আদেশ নিষেধ পালন করবে, স্বামীর শয্যাসঙ্গেী হবে, স্বামীর ঘরসংসার সামলাবে, স্বামীর সন্তান জন্ম দেবে, সেই সন্তান লালন পালন করবে। এটি একটি চুক্তি। এই শর্ত বা চুক্তিটি নারী পুরুষের প্রণয়ঘটিত বা অপ্রণয়ঘটিত যে কোনও বিয়েতেই থাকে। আস্ত একটি মানুষকে পুরুষরা নিজেদের আরাম আয়েশ ভোগ বিলাসের জন্য হাতের মুঠোয় পেয়ে যায়। স্ত্রী মানুষ বটে, তবে এই স্ত্রীর নিজস্ব কোনও বোধবুদ্ধি থাকা বারণ, স্ত্রীর কোনও নিজস্ব জীবন থাকা বারণ, স্বামী-সেবায় এবং স্বামীর সুখ-ভোগে নিজেকে বিসর্জন দিতে হবে স্ত্রীকে, মানুষ হলেও মানুষের জন্মসূত্রে প্রাপ্য স্বাধীনতা ও অধিকার থেকে স্ত্রীর নিজেকে বঙ্গিত রাখতে হবে। বিনে পয়সায় এমন চমৎকার দাসী পেয়ে যাওয়ার আরাম পুরুষেরা ছাড়বে কেন! তাই বিয়ে করার পর পুরুষের কোনও কারণ নেই ডিভোর্স করার। স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গেী করতে যদি ইচ্ছে না হয় পুরুষের, তবেও কোনও অসুবিধে নেই, অন্য কোনও শয্যাসঙ্গেীর ব্যবস্থা করে নিতে পারে অনায়াসে, এতে তাদের কেউ বাধা দেয় না। স্ত্রীর বাইরে অন্য কোনও নারীর প্রতি আকর্ষণ পুরুষের জন্য আধুনিক হওয়ার শর্তের মতো। পুরুষের ডিভোর্স করবার দরকার হয় না। এক দাসীকে বাদ দিয়ে অন্য দাসী নেওয়ার খুব আকুলতা থাকার কোনও অর্থ হয় না। দাসী তো দাসীই। দাসীর মধ্যে প্রভুভক্তি বা পুরুষভক্তি থাকলেই যথেষ্ট। অত না পাল্টে বরং একজনকে — পুরোনোজনকে, যে এরমধ্যে ঘরসংসারের কাজ ভালো বুঝে নিয়েছে, তাকে রাখাই ভালো। পুরুষেরা তাই একের বদলে একইরকম আরেককে রাখার কোনও অর্থ দেখে না। তারা অর্থহীন কাজে তেমন আগ্রহী হয় না। স্ত্রী থেকে মন উঠলে শরীর উঠলে যদি ঘরসংসার ঠিকঠাক থাকে, স্ত্রীও যেমন ছিল তেমন থাকে, বাইরের ব্যভিচারও চমৎকার ভোগ করা যায় — তবে কি পুরুষেরা বুদ্ধু হয়েছে যে ডিভোর্স করার মতো বোকামো তারা করবে! স্ত্রীরা কেন মেনে নেয় স্বামীর ব্যভিচার—প্রশ্ন এটাই। উত্তর হল, না মেনে তাদের উপায় নেই। অন্য কোনও পুরুষের ঘরে গেলে সে পুরুষও যে ব্যভিচার করবে না তার গ্যারান্টি কে দেবে নারীকে? ব্যভিচার পুরুষের রক্তে, কেউ কেউ বলে। আমি বলি রক্তে নয়, ব্যভিচার পুরুষতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
