পুরুষেরা তাদের দুর্বলতার জন্য ক্ষমা চায়, নারীরা চায় তাদের সবলতার জন্য। পশ্চিমের নারীরা বলেছেন এ কথা। পুবের নারীরা কি জানে না তা!
পুরুষের জন্য সবল হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। নারীর জন্য ঠিক উল্টোটি। নারীকে দুর্বল হওয়া মানায়, নারী সবল হলে এটা তার গুণ নয়, দোষ। এই হল সমাজ, যেখানে আমরা বাস করি। নারীকে বলা হয় পিসফুল আর প্যাসিভ। এটা নাকি নারীর জন্মগত। না, ওসব নারীর জন্মগত নয়। নারী সম্পূর্ণ মানুষ, এটিই কেবল নারীই জন্মগত, অন্য কিছু নয়।
নিজে আমি মানসিকভাবে খুব সবল, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, এবং নৈতিকভাবে স্বাধীন মানুষ। এটি এই ঘটনাটি পুরুষের কিছুতেই পছন্দ নয়। পুরুষ চায় নারীকে দুর্বলরূপে দেখতে। পুরুষ নারীকে হাতের মুঠোয় চেপে, পায়ের তলায় পিষে যে আনন্দ পায়, সে আনন্দ অন্য কিছুতে পায় না।
ব্যক্তিগত জীবনে পুরুষের আধিপত্য আমি বরদাস্ত করতে রাজি নই বলে একা থাকি। নারী যদি নিজেকে কষ্ট দিতে না চায়, তবে সে নারীবাদী। আর নারীবাদী হলে নিজের জন্য ঘর খুব জরুরি। সেই কতকাল আগে ১৯২৮ সালে ভার্জিনিয়া উলফ লিখেছিলেন খুব জরুরি একটি বই, ‘এ রুম অফ ওয়ানস য়োন’, নিজের জন্য একটি ঘর। নিজের জন্য ঘরের প্রয়োজন সব নারীর। পশ্চিমের নারীরা নিজের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। সমাজ এখন তাদের আর জুজুর ভয় দেখায় না। কিন্তু সমাজের রক্তচোখ এই ভারতবর্ষের মেয়েদের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যে মেয়েরা সিঁটিয়ে আছে ভয়ে, এত ভয়ে যে নির্যাতনকারী পেষণকারী অসভ্য নির্লজ্জ নিষ্ঠুর পুরুষদের বিপক্ষে মুখ খুলতে পারে না। এদের সরিয়ে তো দিতেই পারে না নিজের চৌহঙ্গি থেকে, বরং আদরে আহ্লাদে মাথায় তুলে রাখে, জীবনভর পোষে।
যেদিন থেকে আমি একা বাস করছি, সেদিন থেকে আমার জীবনের মূল্য আমি টের পেয়েছি। পুরুষের সঙ্গে বাস করলে টের পেতাম না। পুরুষের জীবনই প্রধান হয়ে উঠতো। এ সমাজে নারীর জীবন পুরুষের জীবনের তুলনায় মূল্যহীন, অর্থহীন। অত্যাচারীর সঙ্গে বাস করলে নারী তার জীবনের মূল্য অনুধাবন করার সুযোগ সময় কোনওটাই পাবে না। নারীকে তো দিনভর ব্যস্ত থাকতে হয় পুরুষ-সেবায়, পুরুষ- দেহতৃপ্তিতে, পুরুষ-মনোরঞ্জনে।
আমি কেন একা থাকি? এর উত্তরে আমি বলবো, কারণ আমি ম্যাসোকিস্ট নই। আমি ভুগতে চাই না। পুরুষ পায়ের তলায় আমাকে সুযোগ পেলেই পিষুক, চাই না। বাইরে পিষছে, পিষতে চাইছে। যেন ঘরে তা না হয়। কোনও সম্পর্কের ছুতোয় যেন তা না হয়। একত্রবাসের মতো তথাকথিক রোমান্টিক জীবনের ছুতোয় যেন না হয়। লিজ উইনস্টেড, উত্তর আমেরিকার এক মেয়ে বলেছিল, ‘I think, therefore I’m single.’ এর পর কি আরও বুঝিয়ে বলার দরকার, কেন মেয়েদের একা থাকা প্রয়োজন? ঘটে বোধবুদ্ধি কিছু থাকলে নারী কি পুরুষের সঙ্গে বাস করে? ন্যাড়া কি বেলতলা যায়?
১৮. শেষ পর্যন্ত হেরে যেতে হল
ফরাসি প্যারাট্রুপার প্রশিক্ষককে আলিঙ্গন করার অপরাধে পাকিস্তানের পর্যটন মন্ত্রী নিলুফার বখতিয়ারের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছিল মৌলবাদী গোষ্ঠী। নিলুফার আশা করেছিলেন শাসক দল পিএমএল-কিউ তাঁর পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু কেউই পাশে দাঁড়ায়নি। দল এবং সরকারের কাছে যে সমর্থন আশা করেছিলেন তা পাননি নিলুফার।
নিলুফারের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হবার পরদিনই ভারতের এক টিভি চ্যানেল এ নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আলোচনায় অংশ নেওয়া মানুষগুলো এক এক দেশে, এক এক অঞ্চলে। কিন্তু টেকনোলজি সবাইকে এক জায়গায় এনে জড়ো করেছিল। পাকিস্তানের আসমা জাহাঙ্গীর, মানবাধিকারের জন্য দীর্ঘকাল আন্দোলন করছেন, ফতোয়ার শিকার নিলুফার বখতিয়ার, এবং এদিকে ভারত থেকে আমি। আসমা জাহাঙ্গীর বলেছেন, ‘প্রতিদিনই মেয়েদের বিরুদ্ধে এরকম ফতোয়া দেওয়া চলছে পাকিস্তানে, আজ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে হল বলেই মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করছে এবং সে কারণেই চারদিকে হৈ চৈ।’ নিলুফার বলেছিলেন, ‘এ কিছু না, ছোট্ট একটি গোষ্ঠী ফতোয়া দিয়েছে, এদের কেউ চেনে না, এদের কথার কোনও দাম নেই। ফতোয়ার তো নেইই। সাধারণ মানুষ এদের ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেবে। আমার সমর্থনে আমার দল আছে, সরকার আছে, জনগণ আছে। আমি যা করেছি তা আবারও করবো।’
সে আলোচনায় আমি কিন্তু বলেছিলাম, ‘ছোট দল ভেবে এদের কিন্তু তুচ্ছ করা উচিত নয়। কারণ, ফতোয়ার পেছনে যে ভয়ংকর শক্তিটি কাজ করে, তা হল ধর্ম। যত ছোটলোকই ফতোয়া জারি করুক না কেন কোনও মেয়ের বিরুদ্ধে, ধর্মের সায় আছে বলেই সেই ফতোয়াকে সব ব্যাটাই সমর্থন করবে, পুরুষতন্ত্রের রাঘব বোয়ালেরা মহানন্দে মাথা নাড়বে। ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার ব্যবস্থা না করলে, সমানাধিকারের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন না হলে, মৌলবাদী-উৎপাদনের নিমিত্র মাদ্রাসা-শিক্ষা বন্ধ না হলে, নারীর শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতার ব্যবস্থা না হলে, সর্বস্তরে নারীর ক্ষমতায়ন না হলে ফতোয়াবাজরা নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাবে। নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে, মানবাধিকার এবং মানবতার জয় চাইলে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতেই হবে। ধর্মকে মাথায় ওঠালে মৌলবাদও মাথায় উঠবে।’
আমি বলি, ফতোয়াবাজদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে। নিলুফার বলেন, ‘এদের গ্রাহ্য করার কোনও মানে হয় না।’ কজ্ঞে তাঁর ছিল প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। নিলুফার বিশ্বাস করেছিলেন, ক্ষুদ্র মৌলবাদী শক্তি হেরে যাবে, তিনিই এই যুদ্ধে জিতবেন। না জেতার কোনও তো কারণ নেই, কারণ তিনি তো কোনও অন্যায় করেননি। প্যারাসুট জাম্পিংএ সফল হয়ে প্রশিক্ষককে প্রথামতো আলিঙ্গন করেছেন। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। নিলুফার ভাবতেও তো পারেননি যে গ্রাহ্য আসলে মৌলবাদীদেরই করা হবে। গ্রাহ্য নিলুফারকেই করা হবে না। ক্তমাগত হুমকির মুখে পড়ে দলের, সরকারের, জনগণের কারও সমর্থন না পেয়ে নিলুফার বাধ্য হয়েছেন ইস্তফা দিতে। অথবা দলের বা সরকারি চাপেই তিনি ইস্তফা দিয়েছেন। হেরে কে গেল? মৌলবাদীরা নাকি নিলুফার? নিলুফার হেরেছেন। অন্যায় না করেও তাকে শাস্তি পেতে হলো। নিলুফার ভেবেছিলেন, তিনি দেশের মন্ত্রী, সুতরাং তাঁর ক্ষমতা প্রচুর, কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি নারী, ভুলে গিয়েছিলেন নারী ক্ষমতাহীন। ভুলে গিয়েছিলেন যে পুরুষবাদী পুরুষের ভিড়ে তিনি কিছুই না, কিছুই না, কিছুই না। ক্ষমতা তাঁর ততটুকু, যতটুকু ক্ষমতাবান পুরুষেরা তাঁকে দিয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে এক তুড়িতে সে ক্ষমতা উঠিয়ে নিতে পারে তারা। নিলুফার ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি নারী, ভুলে গিয়েছিলেন যে কোনও যুদ্ধেই তাঁকে হেরে যেতে বাধ্য করা হবে, ভুলে গিয়েছিলেন এই জগতটা পুরুষের।
