সেদিন রবীন্দ্রসদনে, নন্দন চত্বরে হাঁটছিলাম। রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণে দেখি নৃত্যানুষ্ঠান। কয়েক হাজার দর্শক। আর খানিক দূরেই পাঁচ ছজন বসে আছে মানবাধিকার সংস্থার আয়োজনে সিঙ্গুরে পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদ সভায়। দেখে মন খারাপ হল খুব। নাচে গানে এত লোক, প্রতিবাদে নেই! মানবাধিকারে নেই! মানুষের জন্য কি মানুষ আর তবে কাঁদে না? পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, তারপরও বলবো, অন্তত এই সিত্রুর প্রসঙ্গে একজোট হয়েছে, কথা বলছে। সকলে শান্তি চায়। সকলে না হলেও অন্তত অধিকাংশ মানুষই চায়। দরিদ্রর ওপর অত্যাচার কে চায় অতি নিষ্ঠুর ছাড়া! আমার ভাবতে ভালো লাগে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সকলে সহৃদয়।
দুরকম যুদ্ধ আছে জগতে। একটি শোষকের, শোষিতের বিরুদ্ধে। আরেকটি শোষিতের, শোষকের বিরুদ্ধে। আমি দ্বিতীয়টিকেই বরাবার সমর্থন করে এসেছি। তাই শত বিপদেও শোষিতের পক্ষে দাঁড়াই। শোষণ চাই না বলে দাঁড়াই। অধিকার চাই বলে, স্বাধীনতা চাই বলে দাঁড়াই। বৈষম্য চাই না, অনাচার চাই না। শান্তি চাই। যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি সহজ শান্তি সৃষ্টি করা। কিন্তু সহজ কাজটিই দেখা যায় করা হচ্ছে না। সহজ কাজেই জটিল কুটিল মানুষের আপত্রি। সহজ কাজেই অস্ত্রধারীদের আপত্র। িক্ষমতা যাদের হাতে, শকুনে খেয়ে ফেলে তাদের চোখ, অক্ষমদের দিকে ফিরে তাকানোর মানবিক চোখ।
ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন অস্ত্রের জোরে গোটা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে কব্জা করা সহজ, কিন্তু একটি ছোট্ট গ্রামের মনকে নয়। ‘ইট উড বি ইজিয়ার টু সাবজুগেট দ্য এন্টায়ার ইউনিভার্স থ্রো ফোর্স দেন দ্য মাই.স অব আ সিঙ্গেল ভিলেজ।’ ভলতেয়ারের এই কথাটি আমাকে সিঙ্গুরের মানুষের কথা আরও বেশি মনে করিয়ে দিচ্ছে। হয়তো সিঙ্গুরে টাটার কারখানা হবে। মানুষ ভুলেও যাবে সিঙ্গুরের মেয়েদের অনশনের কথা, ভুলে যাবে তাদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের কথা। কিন্তু ছোট্ট গ্রামের ছোট্ট মনটি হয়তো চিরকালই মনে রাখবে তার মন খারাপের কথা। ইতিহাস যারা রচনা করবে ভবিষ্যতে, তাদের মনে হয়তো মোটেও দাগ কাটবে না এই মন খারাপের ঘটনা। তারা বাদ দেবে অসম্ভব তেজ ও দৃঢ়তা নিয়ে মেয়েদের সামনে এগিয়ে আসার ঘটনা, অনশন করা, প্রতিবাদে মুখর হওয়া, নিজের অধিকারের পক্ষে ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। ইতিহাস তো রচনা করে পুরুষ। নারীবিদ্বেষী এই সমাজের পুরুষেরা যারা শেখেনি মেয়েদের সম্মান করতে, তারা কি আর কোথাও মেয়েদের স্মরণ করবে, সম্মান দেবে! ইতিহাসের পাতা থেকে বিচ্যুত হবে মেয়েরা, বিস্মৃত হবে মেয়েরাই।
দেশপ্রেম দেখায় বড় বড় রাজনীতিবিদরা। দেশপ্রেম দেখায় বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা। কিন্তু অসত্য মেনে নিতে এদের মতো পারদর্শীও বুঝি কেউ নয়। রুজভেল্ট নিজে প্রেসিডেন্ট হয়েও একদিন বলেছিলেন, ‘ইট ইজ আনপেট্রিওটিক নট টু টেল দ্য ট্রুথ, হোয়েদার অ্যাবাউট দ্য প্রেসিডেন্ট অর এনিওয়ান এলস। তোমার দেশপ্রেম বলতে কিছু নেই যদি তুমি সত্য লুকিয়ে রাখো, সে সত্য যে কোনও মানুষ সম্পর্কে বা দেশের প্রেসিডেন্ট সম্পর্কেই হোক না কেন।’ নাচ হচ্ছে। সরকারি কবিতা উৎসব হচ্ছে। যোগ দিচ্ছে উৎসবে অগুনতি কবি। কবিরা মহানন্দে মহাসুখে পড়ছে প্রেম বিরহের কবিতা। অথচ তার পাশ দিয়েই তখন যাচ্ছে সিত্রুর নিয়ে প্রতিবাদের মিছিল। বড় বড় কবিরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। কুলুপ খুললে আবার না কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। তারা ওই সিঙ্গুরের অনশন রত মেয়েদের চেয়েও কি বেশি কিছু হারাবে? ওদের চেয়ে বেশি ক্ষতি কি শহুরে সম্ভ্রান্ত কবিকুলের কোনওদিন হবে?
ভলতেয়ার সেই কত আগে বলেছিলেন, ‘ইট ইজ ডেনজারাস টু বি রাইট হোয়েন দ্য গভরমেন্ট ইজ রং।’ আজও আমরা দেখি, প্রতিনিয়তই দেখি এর সত্যতা। জীবনের ঝুঁকি চারদিকে মেয়েরাই নিচ্ছে। অনশনে মেয়েদেরই মৃত্যু হবে। পুরুষ হয়তো অনশন ভাঙবে। মেয়েরা ভাঙবে না। এমন নিটোল নির্ভীক সৎ সাহসী মেয়েরা যদি রাজ্য বা রাষ্ট্র বা বিশ্ব চালাতো, পৃথিবী সুন্দর হত আরও।
১৫. মেয়েদের রাগ হোক, ক্রোধ হোক
এমন একটি দিন আছে, যে দিন ধর্ষণহীন? না এমন দিন নেই। ২০০০ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ঘণ্টায় একটি অন্তত ধর্ষণ ঘটে ভারতবর্ষে।আসলে, ধর্ষণের এই সংখ্যাটি আরও ভয়াবহ হত, যদি ধর্ষিতারা মুখ খুলতো, বলতো যে তারা ধর্ষিতা হয়েছে। ধর্ষণ যে একটি অপরাধ তা বেশির ভাগ মানুষ জানে না। ধর্ষককে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে ধর্ষিতাকে করা হয়। এর চেয়ে বড় লজ্জা একটি সমাজের জন্য আর কিছু নেই। পৃথিবীতে ধর্ষণই একমাত্র অপরাধ যেখানে আক্তান্তকে বা ভিকটিমকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
আমেরিকার নারীবাদী লেখিকা মেরিলিন ফ্রেঞ্চ লিখেছিলেন, ‘প্রতিটি পুরুষই ধর্ষক, এবং তাদের এই একটিই চরিত্র। তারা আমাদের ধর্ষণ করে তাদের চোখ দিয়ে, তাদের তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে, তাদের আইন দিয়ে। অল ম্যান আর রেপিস্ট এণ্ড দ্যাটস অল দে আর। দে রেপ আস উইদ দেয়ার আইজ, দেয়ার লজ, অ্যান্ড দেয়ার কোডস।’
আর আমার প্রিয় আন্দ্রিয়া ডরকিনের কথা, ‘যতদিন ধর্ষণ নামক জিনিস পৃথিবীতে আছে, ততদিন শান্তি অথবা সুবিচার অথবা সমতা অথবা স্বাধীনতা কিছুই থাকবে না। তুমি আর হতে পারবে না তা, যা তুমি হতে চাও, তুমি আর বাস করতে পারবে না সেই জগতে, যে জগতে তুমি বাস করতে চাও।’
