তারপর যখন বলি যে, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী বাংলাদেশের তিন মিলিয়ন লোককে হত্যা করেছিলো এবং যাদের বিচার হচ্ছে তারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলো, কেউ কেউ নিজের হাতেই হত্যা করেছে এবং জামাতে ইসলামীর ইসলাম আসলে একটা লেবাস মাত্র, তখন তারা কিছুটা হলেও বুঝতে পারে।
কিন্তু কেউ যখন প্রশ্ন করে যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তোমাদের তিন মিলিয়ন লোক হত্যা করলো, তারপরও বাইরের দেশে পাকিস্তানীদের সাথে বাংলাদেশীদের ভাল সম্পর্ক কেন, তখন বেদনা হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না।
আমি: বাঙালিদের মেরেছে পাকিস্তানি সরকারের আদেশে পাকিস্তানি সেনা বাহিনী। এ কারণে সাধারণ পাকিস্তানিদের দোষ দিচ্ছেন কেন? বাংলাদেশের সরকার বা সেনা বাহিনী কোনো অন্যায় করলে তার দায় কি আপনার? নরওয়ের বিশাল পপুলেশন পাকিস্তানি অরিজিন। ওরা ষাটের দশকে শ্রমিক হিসেবে নরওয়েতে এসেছিল, পরে ফেরত যায়নি দেশে। ওদের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ আছে। মিলে মিশে থাকবেন।
যুবক: আপনার কথা ঠিক দিদি। কিন্তু যখন শুনি যে পাকিস্তানীরা এখনো বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অংশ মনে করে তখন আর ঠিক মনে হয় না। পাকিস্তান বা পাকিস্তানীদের একাত্তরে বাংলাদেশের হত্যা সম্পর্কে কোন সিমপ্যাথি বা অনুশোচনা না থাকলে আমি একপাক্ষিক প্রেম দেখানোকে ভাল চোখে দেখতে পারি না। আর ভাল মানুষ সবখানেই আছে, খুঁজলে জামাতে ইসলামীতেও পাওয়া যাবে।
আমি: আপনি জেনারাইলাইজ করছেন। পাকিস্তানীরা যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অংশ মনে করে, তাদের সংখ্যাটা কত? সব পাকিস্তানিই নিশ্চয়ই তা মনে করে না। এটা মনে রাখতে হবে, আমাদের মতো তারাও ইসলামি রাজনীতির ভিকটিম। অনেক পাকিস্তানী মানুষ একাত্তরের গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। নিজেদের সরকারকে দোষ দিয়েছেন। পাকিস্তানের সবাই ইসলামি-মৌলবাদী নয়, তাঁদের অনেকে শিক্ষিত, সচেতন, অনেকে মুক্তচিন্তায় গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ইসলামিজমের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়াই করে বেঁচে আছেন। জামাতি ইসলামিতে খুঁজলে। কিছু খুনী এবং ধর্ষক নাও পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু ভালো আদর্শবান মানুষ পাওয়া কঠিন। কারণ জামাতির আদর্শ নারীবিরোধী, প্রগতিবিরোধী, সমানাধিকার বিরোধী, বিজ্ঞানবিরোধী। এই আদর্শকে জেনেশুনে যারা সমর্থন করছে, তাদেরকে আমরা আমাদের লোক বলে গণনা করতে পারি না।
যুবক; জেনারেলাইজেশন যে হয়েছে তা আমি মানছি। সেজন্য এই পোস্টে আপনার মন্তব্য পেয়েছি। এটাও কিন্তু একটা পাওয়া আমার। জেনারেলাইজ না করলে তো পেতাম না। তবে পাকিদের সাথে যারা বেশি অন্তরঙ্গ হয়, ভাই মনে করে, তারা আসলে নিজেরাও নষ্ট।
আমি: তবে পাকিদের সাথে যারা বেশি অন্তরঙ্গ হয়, ভাই মনে করে, তারা আসলে নিজেরাও নষ্ট।–এটাও জেনারাইজেশন। পাকিস্তানি একজন মানববাদীর সঙ্গে বাংলাদেশি একজন মানববাদীর বন্ধুত্ব হতেই পারে। তারা সে কারণে নষ্ট হবে কেন?
কথোপকথন যারা পড়েছে, আমার মানবতার আহবান তাদের উত্তেজিত করেনি। ঘৃণা আর হিংসের ভাষাটা এখনও খুব শক্তিশালী কিনা। এখনও এই ভাষা মানুষকে আকৃষ্ট করে।
বর্ণবাদ
আস্তালাভিস্তা বেবি, আমেরিকার বর্ণবাদ ইজ ব্যাক।
ব্যাক? ও তো ছিলই। ঘুমিয়ে হলেও ছিল। যখন জাগার জাগবে। ঘুমিয়ে থাকে বর্ণবাদ সব মানুষের অন্তরে। সব না হলেও অধিকাংশ মানুষের অন্তরে। কালোদের সেই কতকাল আগে সাদাদের ক্রীতদাস বানানো হলো। সেই কতকাল আগে ক্রীতদাস প্রথাও বিলুপ্ত হলো। বিলুপ্ত হওয়ার কতকাল পরও কালোদের ঘৃণা করা বন্ধ হয়নি। খারাপ লোকে যেমন গিজগিজ করছে পৃথিবী, কিছু কিছু ভালো মানুষও তেমন একই সঙ্গে আছে। সাদাদের মধ্য থেকেই কালোর পক্ষে আন্দোলন হয়েছে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সাদারা লড়েছে।
শুধু যে কালোরাই মরে, কালোরাই ভোগে তা নয়, সাদারাও মরে, সাদারাও ভোগে। অনেক কালো দিব্যি আছে। যেহেতু তাদের নামটা বা যশটা ভালো আছে। গরিবের কোনও সাদা কালো বাদামী হলুদ নেই। গরিবরা এই সমাজের চোখে সবাই কালো। ধনী নারীরাও কালো, যেহেতু তারা নারী, যেহেতু তারা এই সমাজে নিম্নলিঙ্গ। যে কোনও সংখ্যালঘুই কালো।
এই পৃথিবী বৈষম্যের পৃথিবী। এই পৃথিবী থেকে বৈষম্য দূর করার একটা অসম্ভব কাজে আমরা নেমেছি। অসম্ভব কখনও কি আর সম্ভব হয়!
বাংলা সংস্কৃতি চলবে কী চলবে না
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান বৌদ্ধ মুসলমান এবং ধর্মমুক্ত মানুষ সবাই আমরা পালন করতাম পয়লা বৈশাখ। বাংলা গান গাইতাম, বাঙালি খাবার খেতাম। বৈশাখি মেলায় গিয়ে দা বটি, শিল নোড়া, বেলান পিঁড়ি, হাঁড়িকুড়ি, মুড়ি মুড়কি, খই-খেলনা, মাটির পুতুল টুতুল আর বাঁশি বেলুন কিনে আনতাম। বিকেলে বাবার হাত ধরে জুয়েলারির দোকানে দোকানে গিয়ে হালখাতার মণ্ডা মিঠাই খাওয়া ছিল আমাদের পয়লা বৈশাখ।
ঢাকার রমনায় ছায়ানটের গান, ইলিশ পান্তা খাওয়া বা রাস্তায় মঙ্গল শোভাযাত্রা নিতান্তই নতুন ট্রাডিশান, বাঙালি এলিট শ্রেণী ওভাবেই কয়েক দশক আগে পয়লা বৈশাখের আধুনিকীকরণ করেছে। আমি দুটো উৎসবই দেখেছি, গ্রামের এবং শহরের উৎসব, পুরোনো এবং নতুন উৎসব। দুটোই জরুরি।
