বাংলাদেশের বইমেলায় আমি নিষিদ্ধ আজ কুড়ি বছরেরও বেশি। পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ আট বছর। একজন বাঙালি লেখক, যে লেখক বহুবার পুরস্কৃত হয়েছে, বাংলা ভাষায় চল্লিশটিরও বেশি বই লিখেছে, যে বইগুলোর অধিকাংশই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে বাংলা ভাষার মূলভূমিতে বাংলা বইয়ের মেলায় তার প্রবেশের কোনও অধিকার নেই। আমি মানুষ খুন করিনি, কারও কোনও অনিষ্ট করিনি, নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি আমার লেখা পড়ে অনেক স্ত্রীপুরুষই সচেতন হয়েছে, ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার দূর করেছে, বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছে, উদার আর সহিষ্ণ হয়েছে।
অথচ আমার মত প্রকাশের অধিকারের বিরুদ্ধে দুই বাংলাই আজ সমান সরব। তবে কি আমার এ ই দোষ যে আমি সত্য কথা বলেছি? এমন কিছু সত্য আছে, যে সত্য বলতে হয় না, লোকে বলে না, বলেনা কিন্তু আমি বলেছি?
স্রোতের বিরুদ্ধে গেলে বাক স্বাধীনতা হরণ করা হয়, বই নিষিদ্ধ করা হয়, বইমেলায় প্রবেশ বারণ করা হয়, লেখালেখি বন্ধ করে দেওয়া হয়, গৃহবন্দি করা হয়, নির্বাসন দেওয়া হয়। বাংলা থেকে আমার নির্বাসন হয়ে গেছে। যতদিন বাঁচি, এইটুকু বুঝেছি, বাংলার বাইরে আমাকে বাস করতে হবে। বাংলায় পা দেওয়ার কোনও অধিকারই আমার নেই। ছোটবেলায় বইমেলা দেখার যে স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নটা আজও ফিরে ফিরে আসে। বইমেলায় না যেতে পারার কষ্ট পৃথিবীর সর্বসুখ দিয়েও আমি সামান্য কমাতে পারি না। একটু না হয় অন্যরকম আমি। না হয় একটু অন্যরকমই। অন্যরকমের কি অধিকার নেই এই সমাজে বাস করার! সবাই কি আর আপোস করে, সবাই কি আর হিসেব করে কথা বলে! কেউ কেউ তো থাকে সংসারে, যারা মিথ্যেকে মানে না, অন্যায়ের সঙ্গে, যা হয় হোক, আপোস করে না!
বজরঙ্গি ভাইজান
বজরঙ্গি ভাইজান
কাল কবির খান পরিচালিত সালমান খান অভিনীত বজরঙ্গি ভাইজান দেখলাম। আশির দশকের পর থেকে আমি হিন্দি ছবি দেখি না। কিন্তু এক বন্ধুর অনুরোধ আমাকে ছবিটা দেখতে হলো।বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাণ পদ্ধতি আশির দশকের নির্মাণ পদ্ধতির চেয়ে এখন অনেক উন্নত। তবে চলচ্চিত্র এখনও মেলোড্রামা মুক্ত হতে পারেনি। এখনও ছবিগুলো অযথা নাচে গানে ভরপুর। হাফ মিউজিক্যাল যাকে বলে। বজরঙ্গি ভাইজান সব কিছুর মিশেল। ছবিটায় নাওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী বরাবরের মতো ভালো অভিনয় করেছেন। ভালো একটা মেসেজ দেওয়ার জন্য ছবিটার গল্প লেখা হয়েছে। গল্পে গোঁজামিল আছে, অসম্ভব অসম্ভব ঘটনা আছে, ওগুলো না হলে হয়তো মূল মেসেজটার দিকে এত দ্রুত যাওয়া যেত না। রাজনীতিকরা বিভেদ সৃষ্টি করছে মানুষের মধ্যে, হিন্দু আর মুসলমানকে আলাদা করছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনও হৃদয়বান, এখনও তাদের কাছে মানুষের পরিচয় মানুষই। এক কট্টর হিন্দুত্ববাদীর কাছে ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানবতার সেবা। পাকিস্তানের মুসলমানের কাছে বজরঙ্গীও তার মানবতার জন্য হয়ে ওঠে ভাইজান।
আমরা জানি, আমরা দেখেছিও, সরকার ধর্মকে ব্যবহার করে, মানুষের মধ্যে ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছড়াতে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এখনও মানবতাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। এটা যে শত ভাগ সত্য নয়, তা আমরা জানি। মানুষের বর্বর, নৃশংস, কুৎসিত চরিত্র বারবারই তো প্রকাশিত হয়। আমরা এও দেখি, এক নেতা আরেক নেতার সঙ্গে ঠিক ঠিক ভাব করে নেয়, কিন্তু তারা যাদের মগজধোলাই করেছে, মারামারিটা, হিংসাহিংসিটা, খুনোখুনিটা সাধারণত তারাই করে।
সেদিন ভারতের ওয়াঘা-আত্তারি আন্তর্জাতিক সীমান্তে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে মিষ্টি পাঠিয়েছে। কিন্তু পাক সেনারা সেই মিষ্টি গ্রহণ করেনি। সেনারাও ঘৃণার রাজনীতি শিখেছে। এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ আম পাঠালে মোদি কিন্তু সেই আম ফিরিয়ে দেননি।
ভারত-পাকিস্তানের শত্রুতা ভারত ভাগের শুরু থেকেই। শত্রুতা শুরু করেছিল রাজনৈতিক নেতারা, জনগণ প্রভাবিত হয়েছিল। হয়েছিল বলেই ভারতভাগের সময়। হিন্দু মুসলমানকে কুপিয়ে, মুসলমান হিন্দুকে কুপিয়ে, দশ লক্ষ মানুষের লাশ ফেলেছে। আমি আজও মনে করি, ইচ্ছে করলেই সাতচল্লিশে ভারত ভাগ ঠেকাতে পারতো রাজনীতিকরা। ইচ্ছে করলেই অগুনতি মৃত্যু ঠেকাতে পারতো। ধর্মটাকে মানবতা হিসেবে প্রচার করলেই ঘৃণা হিংসে বর্বরতাগুলো দূর হয় না। বরং মানবতাকে ধর্ম হিসেবে প্রচার করলে শান্তির দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
একাত্তরের যুদ্ধে ভারত যদি বাংলাদেশকে সাহায্য না করতো, তা হলে বাংলাদেশের যুদ্ধে জেতা হতো না। তিরিশ লক্ষ শুধু নয়, আরও অনেক লক্ষ মানুষকে মরতে হতো। দুলক্ষ নারীকে ধর্ষণ করে পাক সেনারা থামতো না, আরও অনেক লক্ষকে ধর্ষণ করতো ওরা। এই মিত্রশক্তি ভারতকেও রাজনীতির প্রভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শত্রু বলে মনে করে। আর যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। বিশ্বাস করে, তাদের অনেকের কাছেও মানবতার ভাষাটা ঠিক বোধগম্য নয়।
দুদিন আগে এমন এক প্রগতির পক্ষের যুবকের সঙ্গে কথা হলো। যুবকটি এখন নরওয়েতে। কথোপকথন পুরোটাই তুলে দিচ্ছি।
যুবক: বাইরে কারো সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কথা বলতে গেলে ঐ একই কথা শোনা যায়, বাংলাদেশে নাকি ইসলামিস্ট নেতাদের ফাঁসি দেয়া হচ্ছে। বিচার করা হচ্ছে?
