ইসলামের জন্য যারা একাত্তরে মানুষ খুন করেছিল, তাদের ফাঁসি হচ্ছে আজ। ইসলামের জন্য যারা ২০১৪/২০১৫ সালে মানুষ খুন করেছে, তাদের বিচার পর্যন্ত হচ্ছে না। এই ইনজাস্টিসটাও কি রাষ্ট্র শেখাচ্ছে না? মানুষকে সভ্য শিক্ষিত সচেতন সংবেদনশীল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রের কি কোনও ভূমিকা আছে? মানবাধিকার সম্পর্কে কিছু শিক্ষা কি রাষ্ট্র কখনও দিয়েছে কাউকে?
মানুষকে খুনী বানাবার সব রকম রসদ মন্ত্র পুঁথি পত্র ওয়াজ খুৎবা দেশে বৈধ। কিন্তু খুন বৈধ নয়। নিতান্তই অক্সিমরন। তারচেয়ে এটা ভালো নয়, খুনী বানিয়ো না কাউকে, খুনও কোরো না কাউকে? অবশ্য আজকাল জঙ্গীবাদ যেভাবে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে, একে রোধ করা কী করে সম্ভব, তা হয়তো অনেকেই আমরা জানি না। তবে এটা ভালো বুঝি, ফাঁসি দিয়ে, মেরে, কোনও সমস্যার সত্যিকার সমাধান হয় না। সুশিক্ষাটা ছড়িয়ে পড়া দরকার। বিশ্বময়। ফাঁসি হলো সহজ সমাধান, সুশিক্ষা ছড়ানোটা কঠিন। কঠিনকেই ভালোবাসতে হবে।
ফেসবুক
গত পরশু আমার ফেসবুক আইডি ভ্যানিশ করে দিয়েছে ফেসবুক কর্তারা। এই জঘন্য ব্যবহার নতুন নয়, এর আগেও একই কাণ্ড করেছে ফেসবুক। আইডি আর ফেরত দেয়নি। আইডি ভ্যানিশ করা মানে পেজ টেজ সহ পারসোনাল একাউন্ট গায়েব করে দেওয়া। আর একাউন্টের সঙ্গে যে সব ইমেইল বা মোবাইল ফোন জড়িত থাকে, সেগুলোকেও কালো তালিকাভুক্ত করে দেওয়া। ওই ইমেইল বা মোবাইল নতুন করে ফেসবুক একাউন্ট খুলতে আর ব্যবহার করা যায় না। যত ইমেইল আছে। আমার, যত মোবাইল আছে, সবই ফেসবুক দ্বারা কালো তালিকাভুক্ত।
আমাকে আমার নামে একাউন্ট খুলতে দেয়না ফেসবুক। তাই গতবার নামটা উল্টে, তসলিমা নাসরিনের জায়গায় নাসরিন তসলিমা লিখে আমাকে একাউন্ট খুলতে হয়েছিল। আমার নামটি কিন্তু অন্যদের ব্যবহার করতে দিচ্ছে ফেসবুক। এই নামে অন্যদের একাউন্ট খুলতে সুবিধে করে দিচ্ছে। একবার গুনে দেখেছিলাম তসলিমা নাসরিন নামে অন্তত একহাজার ফেক একাউন্ট আছে ফেসবুকে।
যতবারই আমি ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছি বা পেইজ শুরু করেছি, জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসবের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধ নারীবিরোধী সন্ত্রাসী জল্লাদরা ফেসবুকে রিপোর্ট করেছে। ফেসবুক পলিসি অত্যন্ত খারাপ একটা পলিসি। আমার শত্রুরা অনেকে মিলে রিপোর্ট করলেই আমি বাতিল হয়ে যাবো, ফেসবুক কর্তারা বিচার করবে না কে ভালো কে মন্দ। ফেসবুক কর্তারা আমার বাংলা স্ট্যাটাসগুলো অনুবাদ করে দেখবে না কী লিখি আমি? যারা আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে, তারা ফেসবুক কী কারণে ব্যবহার করে? ফেবুককে তারা ধর্মীয় সন্ত্রাস ছড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, ফেসবুককে তারা নারীবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করছে। ফেসবুক কোন পক্ষ নেবে, সমাজকে ধ্বংস করার কাজে যারা ফেসবুক ব্যবহার করে? নাকি সমাজকে নির্মাণ করার কাজে যারা ফেসবুক ব্যবহার করে?
পুঁতিগন্ধময় বৈষম্যের সমাজকে যারা বদলাতে চায়, মানুষকে যারা সমতা, সমানাধিকার, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলে, যারা মানুষকে ভালো কাজের জন্য প্রেরণা দেয়, পুরুষতান্ত্রিক রক্ষণশীল গণ্ডমূর্খরা যাদের বিপক্ষে লাফায়, তাদের কোনও অধিকার নেই ফেসবুকে থাকার?
ফেসবুক তবে কি শুধু অজাতশত্রুকেই চায়! যার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার কেউ নেই, যার লেখা সবারই সক্কলেরই পছন্দ হবে? ছিঃ ফেসবুক ছিঃ। আজ সারা পৃথিবীর মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে। এটি কোনও ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান নয়। আজ এই প্রতিষ্ঠানের আচার ব্যবহার সস্তা রোবোটের মতো।
ফেসবুকে যত একাউন্ট আছে তসলিমা নাসরিন নামে, সব ফেক, সব নকল। এইসব ফেক একাউন্ট যারা বানিয়েছে, তারা মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যই বানিয়েছে। মানুষ মনে করছে ওই একাউন্টগুলো বোধহয় আমার। আর তারা আমার কথা বলে তাদের নিজের কথা গেলাচ্ছে নিরীহ পাঠকদের। ফেসবুক কর্তাদের আমি অনেক বলেছি ওই ফেক একাউন্টগুলো বন্ধ করার জন্য। ফেসবুক বন্ধ করেনি। আমার রিপোর্টের কোনও মূল্য নেই। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের রিপোর্টে কোনও ফল পাওয়া যায় না। আরগানাইজড মৌলবাদী শক্তিই জিতে যায় ফেসবুকের এই অদ্ভুত পলিসিতে। ফেসবুক আমার নামে তৈরা করা ফেক একাউন্ট বন্ধ করতে নয়, বরং আমার আসল একাউন্ট বন্ধ করার জন্য উদগ্রীব। এর কারণ একটিই, আমার বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার কমপ্লেইন যায়।
দুই বাংলায় সরকার আমার উপস্থিতি নিষিদ্ধ করেছে, আমার বই নিষিদ্ধ করেছে, পত্র পত্রিকা আমার লেখা নিষিদ্ধ করেছে, প্রকাশকরা আমার বই প্রকাশ বন্ধ করেছে, সেকারণে ফেসবুকই ছিল ভরসা। ফেসবুকেই নিষেধাজ্ঞা আর সেন্সরশীপের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছি। ফেসবুকেই আমার সমস্ত মত আমি প্রকাশ করছিলাম। আমার ফেসবুকের বন্ধু এবং অনুসারীদের প্রায় সবাই ছিল বাঙালি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি। তারা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পড়ছিল আমার লেখা। দ্রুত অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছিল। দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল আমার ফেসবুকের লেখাগুলো। যারা আমার লেখা পড়ার সুযোগ পায় না, ফেসবুকের মাধ্যমে তারা সেই সুযোগটা পেয়েছিল। পৃথিবীতে আর কোনও লেখক এত ব্যানিং আর এত সেন্সরশিপের শিকার নয়। এক আমিই। আমারই প্রবেশ নিষেধ সবখানে। এখন, শেষ আশ্রয়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকেও কি আমার প্রবেশ নিষেধ? চিরকালের জন্য? মৌলবাদী অপশক্তি সমাজটাকে দখল করে নিচ্ছে, কে দেশের ভেতর থাকবে, কে বেরিয়ে যাবে, কে বেঁচে থাকবে, কাকে মরতে হবে এই সিদ্ধান্ত তো এরা নিচ্ছেই। এই মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা ফেসবুকেও খুব অ্যাকটিভ। অরগানাইজড। মনে হচ্ছে এরা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে ফেসবুক। এরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে ফেসবুকে থাকবে, কে থাকবে না। ফেসবুক কর্তাদের বুদ্ধিসুদ্ধি বলে কিছু নেই। এটুকু বোঝার ক্ষমতা নেই যে তারা সন্ত্রাসীদের অঙ্গুলি হেলনে চলছে।
ফ্রিডম ফ্রম রিলিজন
গতকাল ফ্রিডম ফ্রম রিলিজন ফাউন্ডেশনের কনভেনসন হলো যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন রাজ্যের ম্যাডিসন শহরে। ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট অ্যানি লরি গেইলোর আর ডান বেকার অসাধারণ সব কাজ করছেন। গোটা আমেরিকাকে ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার পণ করেছেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় অ্যানি নিকল গেইলোর শুরু করেছিলেন এই ফাউন্ডেশন। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা এটি আজও চালিয়ে যাচ্ছেন। আজ এটির সদস্যসংখ্যা তেইশ হাজার। বিরাট এক বাড়ি হয়েছে। বাড়ির নাম ফ্রিথট হল। কনভেনশনে আমাকে এমপারার হ্যাজ নো ক্লথস পুরস্কার দেওয়া হলো। অস্কার পুরস্কারের মূর্তি যেখান থেকে বানানো হয়, সেখান থেকেই এই ন্যাংটো রাজার মুর্তিটা বানানো হয়েছে। ম্যাডিসনের মনোনা লেকের পাড়ে, হিলটন হোটেলে মনোনা রোসে হলো আমাদের কনভেনশন। ছায়ার মতো একটা সিকিউরিটি ছিল। আমার। ম্যাট নাম। আমি আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ছেলে রন রিগ্যান বক্তৃতা করলাম। রন রিগ্যান বলেছেন আমি বলার পর। আমার কথা উনি বারবারই উল্লেখ করলেন। তসলিমাদের দরকার পৃথিবীটা বদলাবার জন্য। আরও হাজারও তসলিমা চাই–এসব। আমার বক্তৃতাটা অতি সাধারণ ছিল। দুনিয়াতে কী ঘটছে- বাংলাদেশে, ভারতে, সৌদি আরবে, আমেরিকায়–এসবই একটু একটু বললাম। ও মা, তাতেই দেখি বিশাল কাণ্ড। সকলে স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিল। লাইন দিয়ে বই কিনলো। কত শত মানুষ যে এসে জানালো তারা আমার পিচ শুনে মুগ্ধ, আমি খুব সাহসী, আমি একা নই, তারা আমার সঙ্গে আছে। এসব অবশ্য শুনে আসছি আজ প্রায় পঁচিশ বছর। কিছুই আমাকে আর চমকিত করে না। লেকচার ফি ওরা দিয়েছে পাঁচ হাজার ডলার, সেটা সংসারের কাজে লাগবে।
বইমেলায় প্রবেশ নিষেধ
ইস্কুলের লাইব্রেরিতে খুব কম গল্পের বইই বাকি ছিল যেগুলো পড়া হয়নি আমার। পাবলিক লাইব্রেরি থেকেও বই নিয়ে আসতাম। ইস্কুলে যাওয়ার রিক্সাভাড়া বাঁচিয়ে ঝালমুড়ি নয়, আইসক্রিম নয়, চুড়ি ফিতে নয়, বই কিনতাম। গাঙ্গিনারপাড়ে ছিল দুটো নির্জন বইয়ের দোকান। টাকা জমিয়ে ওই দুটো দোকানেই ছুটে যেতাম। বইপোকা বলে খুব দুর্নাম ছিল। রাত জেগে বই পড়া তো ছিলই। পাঠ্য বই দিয়ে গল্পের বই আড়াল করে বছরের পর বছর পড়েছি। ধরা পড়ে বাবা মার হাতে প্রচুর চড় থাপ্পড়, কিল ঘুসি খেয়েছি। কে রুখবে আমাকে! বিকেলে ছাদে চলে যেতাম বই নিয়ে। সন্ধ্যে নামতো, বই থেকে চোখ সরতো না, খুব ঘোরের মধ্যে থাকলে হয়তো বোঝা যায় না যে অন্ধকার থেকেও সময় সময় আলো ঠিকরে বেরোয়। মাঝে মাঝে ভাবি, আমার অমন বই পড়ার অভ্যেসটা কোত্থেকে হয়েছিল। বাড়িতে তো গল্পের বই পড়ার খুব বেশি চল ছিল না। বাবা ডাক্তারি বই পড়তেন। মা কোরান হাদিস পড়তেন। দাদারা বই পড়তেন, তবে বইয়ের চেয়ে ম্যাগাজিন ট্যাগাজিন বেশি পড়তেন। অভ্যেসটা সম্ভবত নানির বাড়ি থেকে এসেছে। ও বাড়িতে সাত আট বছর বয়স অবধি ছিলাম। তখনই দেখেছি, নানির ঘরে বিকেল হলেই বই পড়ার আসর বসে। মেজ খালা বা ছোট খালা পড়েন, বড় মামা, মেজ মামা, মা, নানি, নানির পড়শিরা শোনেন। কোনও ধর্মের বই নয়। গল্প উপন্যাস। কোনওদিন প্রেমের গল্প, কোনওদিন রহস্য উপন্যাস।
