মেয়েদের জীবন জন্মের পর থেকেই দুঃসহ। কোন মা চাইবে জেনেশুনে কষ্ট যন্ত্রণা পোহাতে মেয়েদের এই বিশ্বে আমন্ত্রণ জানাতে? অনেক মা-ই কন্যাভ্রণের গর্ভপাত করায়। গর্ভপাতের অধিকার প্রত্যেক মেয়েরই আছে। মেয়েরা যদি মনে করে এই পৃথিবী, এই দেশ, এই সমাজ মেয়েদের বাসযোগ্য নয়– তবে তারা গর্ভপাত করাতেই পারে। গর্ভপাত করানোর অধিকার থেকে মেয়েদের বঞ্চিত করা মানবাধিকার লঙ্খন করা। শুধু অনাগত কন্যার জন্য দুশ্চিন্তাই গর্ভবতীদের গর্ভপাতে বাধ্য করছে তা নয়, নিজের জীবনও কন্যা শিশু জন্ম দেওয়ার অপরাধে দুঃসহ হয়ে ওঠে।
সমাজে যে লিঙ্গ অনাকাঙ্ক্ষিত, সেই লিঙ্গকে জন্ম দিয়ে সেই লিঙ্গের ভোগান্তি বাড়াতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা তাদের নির্যাতিত, অত্যাচারিত, অবহেলিত, লাঞ্ছিত হতে অনেকে চাইছে না তাদের না-চাওয়া অযৌক্তিক কোনও না-চাওয়া নয়। রাষ্ট্র চাইছে তাদের ওপর নারী-পুরুষের রেশিও ঠিক করানোর দায়িত্ব চাপানো ঠিক নয়। আজ যদি পুরুষরা এই সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত হতো, আজ যদি পুরুষরা নির্যাতিত হতো পুরুষ হওয়ার কারণে, সমাজ যদি পুরুষবিদ্বেষী হতো, তাহলে কিন্তু মায়েরা ছেলে-শিশু জন্ম দিতে আপত্তি করতো।
শিক্ষিত মেয়েরা যে সমাজে নারীবিরোধী আচার পালন করে সে সমাজে মেয়েরা খুব শীঘ্র সমানাধিকার পাবে এ আমার বিশ্বাস হয় না। আজ করভা চৌত, ভাই ফোঁটা, সিঁদুর খেলা ইত্যাদি নানা পুরুষতান্ত্রিক উৎসবে মেয়েরা অংশ নিচ্ছে। স্বামীর দীর্ঘায়ুর জন্য স্ত্রীরা উপোস করছে। স্বামীর মঙ্গলের জন্য মঙ্গলসূত্র পরছে, শাঁখা-সিঁদুর পরছে। পুরুষদের কিন্তু কোনও ব্রত পালন করতে হচ্ছে না স্ত্রীর মঙ্গলের জন্য। স্ত্রী মরে গেলে পুরুষরা নতুন স্ত্রী পাবে। নতুন স্ত্রী পাওয়া মানে নতুন করে টাকা পাওয়া। প্রবাদ আছে; অভাগার গরু মরে, ভাগ্যবানের বউ মরে। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। বটে, কিন্তু ভিন্ন নামে সতীদাহ আজও টিকে আছে, সতীদাহের মানসিকতা তো সমাজে ভীষণভাবেই টিকে আছে। বিধবাদের কী করে ভুগতে হয়, বিশেষ করে বাংলায়, তা কারও অজানা নয়।
প্রায় প্রতিটি দেশেই নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। নারীর নিরাপত্তা কোথাও নেই। নারীরা নির্যাতিত, যেহেতু তারা নারী। পুরুষও নির্যাতিত হয়, কিন্তু তারা পুরুষ বলে নির্যাতিত হয় না। এই যখন সমাজের বাস্তবতা, তখন নারীরা নারী-জন্ম দেখতে চায় না। তারা নিজেরা ভুগেছে নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার কারণে–তাই তারা কন্যা-জন্ম দিতে চায় না। আমি যদি কোনও শিশু জন্ম দিতাম– আমি হয়তো কন্যা শিশু জন্ম দিতে গেলে দুবার ভাবতাম। হ্যাঁ, এই আমিও ভাবতাম, যে আমি একজন নারীবাদী– সেই আমিও চাইতাম না আমার কন্যাকে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, বধূ নির্যাতনের শিকার হতে হবে এমন পরিবেশে চলতে।
কন্যাশিশু জন্ম দেওয়ার চাপ নারীর ওপর না দিয়ে বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজটাকে মানবতান্ত্রিক সমাজ বা ইকুয়াল সোসাইটি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা হোক। প্রতিটি ইস্কুলে মেয়েদের সমানাধিকারের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। প্রতিটি শিশু যেন শেখে নারী ও পুরুষের অধিকার সমান। পরিবারে যেন শিশুরা দেখে বাবা ও মা কোনও প্রভু ও দাসীর রোল প্লে করছে না, বরং দুজনে দুজনকে শ্রদ্ধা করছে–মানুষ হিসেবে, সঙ্গী হিসেবে, সহযাত্রী হিসেবে।
আমি তো মনে করি, নারী-বিরোধী সমাজে মেয়েদের শিশু জন্ম দেওয়াই বন্ধ করে দেওয়া উচিত। ছেলে-শিশু জন্ম দেওয়ার মানে ভবিষ্যতের নির্যাতক জন্ম দেওয়া–আর মেয়েশিশু জন্ম দেওয়ার মানে ভবিষ্যতের ভিকটিম জন্ম দেওয়া। নারী বিরোধী সমাজের সঙ্গে আপোস না করে বরং রেভলিউশান করা উচিত নারীদের। রেভুলিউশানের নাম হোক– নাজন্ম।
নারী
নারী
জন্মভূমি তোমাকে জন্ম দেয়নি। তুমি আমেরিকাতেও জন্ম নিতে পারতে। তুমি এস্কিমোদের দেশেও জন্ম নিতে পারতে। জন্মভূমি নিয়ে এত আবেগ আর উত্তেজনার কোনও কারণ নেই। দেশের সীমানা তৈরি করেছে হিংসুক মানুষেরা। অথবা ভয়ার্ত মানুষেরা। নারীকে শুইয়ে নারীর যোনী দেখিয়ে সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে জ্ঞান দিতে চেষ্টা করাটা নেহাতই হাস্যকর। আদিম যুগে যখন মানুষ কী করে মানুষের জন্ম হয় জানতো না, তখন যদি বলতো, ঠিক ছিল। এখন এই যুগে এটা বেমানান। এখন আমরা অনেক কিছু জানি। নারীকে সম্মান করার পদ্ধতি এটা নয়। নারী জন্ম দেয় বলে নারীর যোনী পূজা করা নারীকে রেসপেক্ট করা নয়। নারীর যোনী পুরুষের যৌনাঙ্গের চেয়ে পৃথক কিছু নয়। ওসব জাস্ট যৌনাঙ্গ। জন্ম দেওয়া কোন ক্রেডিট নয়। কোটি কোটি প্রজাতির স্ত্রী লিঙ্গ যেমন, নারীর লিঙ্গও তেমন, ওরাও প্রসব করে। নারী একা সন্তানের জন্ম দেয় না। পুরুষের স্পার্ম এর দরকার হয়। স্পার্ম এক সময় স্টেম সেল থেকে,স্কিন থেকে তৈরি হবে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু জন্ম দেওয়া কি বিশাল কিছু! আহামরি কিছু নয়। নারীকে সম্মান করতে চাও করো একজন ইন্ডিভিসুয়্যাল হিসেবে, তার গুণ যদি থাকে সম্মান কর। শুধু নারী বলে যদি তাকে সম্মান কর তবে সেটা সম্মান নয় অসম্মান। একজন নারী চোর হলে, বদমায়েশ হলে, খুনি হলে তাকে সম্মান করার প্রশ্ন আসে না। নারী পুরুষ উভয়েই বদমায়েশ হতে পারে। নারীর শরীরে ভাল মানুষের সেপারেট জীন নাই যারা নারীকে আলাদা করে দেখে– নারী জন্ম দেয় সূতরাং মহান, নারী ধর্ষিত হয় সুতরাং নারী অবলা, নারী লজ্জাবতী সুতরাং এরা ভাল,নারী খুন কম করে সুতরাং সে শান্তিপ্রিয় — সব ভুল কথা। নারী সুযোগ পেলে পুরুষের মতই ভয়ংকর হতে পারে।
নারী দিবস
নারী দিবসটা একটা বোরিং জিনিস। এ অনেকটা ইস্কুলের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে রবোটের মতো দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মতো। গাইতে হয় তাই গাওয়া। গাওয়ার সময় দেশের প্রতি কারও ভালোবাসা বাড়ে না। এই সঙ্গীত গেয়ে দেশের কোনও উন্নতিও হয় না। নারী দিবস পালন করে নারীর অবস্থারও কোনও পরিবর্তন হয়নি। পালন করতে হয় বলেই পালন করা। তবে হ্যাঁ, নারী দিবসটা আছে বলে। নারীর উন্নতির জন্য নানা কর্মসূচি নেওয়া যায়। আমার প্রশ্ন, নারীর উন্নতির জন্য কিছু করতে কি নারী দিবসের দরকার হয় নাকি? বছরের তিনশ-পয়ষট্টি দিনই তো তা করা যায়!
নারী দিবস
নারী বিরোধী সমাজে বসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নারীর সমানাধিকারের কথা লিখছি আজ তিরিশ বছর। আমি আর কতটুকু কী করেছি। হাজারো নারীবাদী হাজার বছর আগে থেকেই আমার চেয়েও বেশি ঝুঁকি নিয়ে নারীর অধিকারের জন্য লড়ছে। তারপরও কি নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার পেয়েছে? এ সহজ নয় পাওয়া।
