বোনের সঙ্গে ইচ্ছে হয় প্রতিদিন কথা বলি। কিন্তু বোন বলে, তার সময় নেই কথা বলার। মন খারাপ হয়ে যায়। আত্মীয় স্বজনহীন জীবন আমি যাপন করছি আজ কুড়ি বছরেরও বেশি। বোনটা তো আমার মায়ের মতো উদার। ও কেন আমার সঙ্গে কথা বলার সময় পায় না! অভিমান হয়। আবার ভাবি, সময় পাবেই বা কী করে! দুদণ্ড সময় ওর নিজের জন্যই নেই। একটি পুরুষতান্ত্রিক পরিবার তো বাংলাদেশ থেকে মানুষ বহন করে নিয়ে যায় বিদেশে, যে পরিবারে গাধার খাটুনি খাটতে হয় মেয়েদের। দেশে থাকলে অন্তত সাহায্য করার কাউকে জুটতো। ওখানে কেউ নেই। স্বামী কাজ করবে, ঘরে ফিরে টিভি দেখবে। স্ত্রী বাইরে কাজ করবে, ঘরে ফিরে ঘরদোর পয়-পরিষ্কার করবে, কাটাবাছা করবে, রান্না করবে, লঞ্জী করবে, বাজার করবে, বাচ্চা লালন পালন করবে, বাচ্চা কুকুরবেড়াল রাখতে চায়, সুতরাং কুকুর বেড়ালের লালন পালনের ভারও স্ত্রীর ওপর। আমার বোনটা স্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছে। আরও একটি দায়িত্ব পালন করছে, সেটি হলো স্বামীর চিৎকার চেঁচামেচি দুর্ব্যবহার সওয়া। হাজারো মেয়ের তো একই গল্প। মাঝে মাঝে ভালো লাগে ভাবতে যে, আমার গল্প ওরকম নয়। আমার গল্পে দুঃখ আছে, কিন্তু দুঃখটা অন্যরকম। পুরুষতন্ত্রের অত্যাচার আমাকে বাইরে সইতে হয়, ঘরে নয়। ঘরটা পুরুষতন্ত্র থেকে মুক্ত। ঘরে কোনও পুরুষ নেই। আছি আমি আর আমার বেড়াল। আমার বেড়ালটা কিন্তু মেয়ে বেড়াল।
দ্বিখণ্ডিত
মত প্রকাশের পক্ষে যুদ্ধ করছি অনেককাল। দ্বিখন্ডিতকে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেছি। কলকাতার উচ্চ আদালত বলেছে এই বই নিষিদ্ধ করার কোনো কারণ নেই, যে অংশটুকুকে আপত্তিকর বলা হচ্ছে, সে অংশটুকুতে আছে শুধু ইসলামের ইতিহাস আর কোরান হাদিসের উদ্ধৃতি। বই মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু তারপরও ইসলামের ইতিহাস এবং মহানবীর জীবন চরিত বই থেকে বাদ দিতে হয়েছে। দুটো পাতা খালি এখনো। আজকের মানবাধিকারের যুগে ইসলামের সাদা সিধে অথেন্টিক কাহিনিগুলোকেই অমানবিক, অনৈতিক, অবিবেচক, অন্যায় বলে মানুষ মনে করে। যারা ইসলামের ইতিহাস জানে না, তারা যদি ইসলামের পন্ডিতদের লেখা সেইসব ইতিহাস আজ পড়ে, তারা ভাববে বইগুলো নিশ্চই ইসলামবিরোধীদের লেখা। বহুবিবাহ, শিশুবিবাহ, ক্রীতদাসপ্রথা, নারীনিগ্রহ ইত্যাদিকে সপ্তম শতাব্দীর মানুষ এবং ইসলামের পন্ডিতরা স্বাভাবিক ভাবলেও একবিংশ শতাব্দীর মানুষ স্বাভাবিক ভাবে না।
ধর্ম আর রাজনীতি
বাংলাদেশে শুনেছি হিন্দুদের পুজোর প্রতিমা নাকি মুসলমানরা ভেঙে ফেলছে। আমি এই বর্বরতার প্রতিবাদ করছি। প্রশ্ন করতে পারেন, আমি নাস্তিক হয়ে হিন্দুদের পুজো আচ্চাকে সমর্থন করছি কেন। না, আমি হিন্দুদের পুজো আচ্চাকে, বা তাদের ধর্মকে সমর্থন করছি না। আমি হিন্দুদের ধর্ম পালন করার অধিকারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি। আমি অন্য সব ধর্মের মানুষের ধর্ম পালনের অধিকারের পক্ষেই দাঁড়াই এবং আমি সবারই ধর্ম পালন না করার অধিকারের পক্ষেও দাঁড়াই। পাকিস্তানে যখন খ্রিস্টানদের গির্জায়। হামলা করে মুসলমানরা, আমি প্রতিবাদ করি। যখন ইহুদিদের সিনেগগ আক্রমণ করে খ্রিস্টানরা বা মুসলমানরা, তার প্রতিবাদ করি। যখন মুসলমানদের মসজিদ উড়িয়ে দেয় ইজরাইল, অথবা মুসলমানরা নিজেরাই, প্রতিবাদ করি আমি। আমি বিশ্বাস করি, নাস্তিকদের যেমন ধর্ম পালন না করার অধিকার আছে, আস্তিকদের তেমন ধর্ম পালন করার অধিকার আছে। যারা ইতিমধ্যে ধর্মের আফিম খেয়ে ফেলেছে, তারা ঘুমোতে চাইলে ঘুমিয়ে থাকুক। ওদের ঘুমে আমি বাধা দেবো না। কিন্তু ধর্মের আফিম যেন নতুন করে আর কেউ খেতে না পারে, তার জন্য চেষ্টা করবো। এই চেষ্টাটা আমি ছুরি বা বন্দুক চালিয়ে করবো না। এই চেষ্টাটা আমি দেশের, সমাজের নিয়ম কানুন পাল্টে করবো, মানুষের মধ্যে শিক্ষা আর সচেতনতা বাড়িয়ে করবো।
ধর্ম এমনই এক জিনিস, এটিকে নামানো ক্ষতি নেই, কিন্তু এটিকে দূর করতে গেলেই গোল বাঁধে। অশিক্ষা আর অজ্ঞানতার কারণে মানুষের ভিতরে একটি অন্ধবিশ্বাসের জন্ম হয়েছে। এই বিশ্বাস কোনও যুক্তি মানে না। মুক্তবুদ্ধিকে পরোয়া করে না। রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে যদি বিদেয় না করা হয়, তবে দেশটি হয়ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হতে সময় নেবে না। ধর্ম হল কর্কট রোগের মত, একবার পেয়ে বসলে একের পর এক ধ্বংস করতে থাকে হাতের কাছে যা পায়। তা-ই। এর কোনও নিরাময় নেই। সুস্থতার দিকে কিছুতে মুখ ফেরাতে দেয় না এই রোগ। রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের কারণে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ধর্ম বিশ্বাসী মানুষকে অথবা ধর্মে বিশ্বাস না করলেও যারা ওই ধর্মাবলম্বীদের সন্তান, তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।
| প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবেন কথা দিয়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্রকে ধর্মের কবল থেকে মুক্ত করার তাঁর কোনও ইচ্ছে আছে বলে মনে হয় না। জামাতি ইসলামির সন্ত্রাসীরা মুক্তচিন্তক তরুণ তরুণীদের জবাই করছে, আর ওই কূপমণ্ডুকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টে দেশের সরকার মুক্তচিন্তকদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন শাস্তি দেবেন বলে।
