বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরাও নাকি গোমাংস খেত। জানিনা কী করে কী করে কী হলো যে গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে গোমাংস স্পর্শ করা নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতবর্ষ হিন্দু, মুসলমান শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি এরকম নানা ধর্মের লোক বাস করে। গোমাংস হিন্দু খায় না বলে আর কারও খাওয়া চলবে না, এমন নিয়ম মানবাধিকার বিরোধী। ভারতের কিছু বিজেপি শাসিত রাজ্যে গোমাংস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কী! তোমরা কি লোকের খাদ্যাভ্যাস আইন করে বদলাবে? গোটা বিশ্বই এখন ভারতের এই হিন্দু মুসলমানের সংঘর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। গরুর মাংস খেয়েছে বলে অথবা খেয়েছে সন্দেহে কিছু মুসলমানকে মেরে ফেলছে হিন্দুরা। ছি ছি করছে সারা বিশ্ব। মুসলিমরাই, বর্তমান বিশ্বে অসহিষ্ণুতা, হিংস্রতা, বর্বরতার ধারক এবং বাহক। এদের সঙ্গে তবে কি যোগ হলো হিন্দুরাও?
হিন্দু কট্টরপন্থীদের কথা হলো, মুসলিম দেশগুলোয় তো সংখ্যালঘু হিন্দুদের স্বাধীনতা বলতেই নেই, তবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশ ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানের অত স্বাধীনতা থাকাই বা জরুরি কেন। পছন্দ না হলে এ দেশ ছেড়ে তারা চলে যেতে পারে মুসলমানের দেশে। মুসলমানদের তো মুসলমানদের দেশেই চলে যাওয়ার কথা ছিল সাতচল্লিশে! আর, এ দেশে থাকতে হলে গোমাংস খাওয়া চলবে না।
যে যাই বলুক, হিন্দু কট্টরপন্থীরাকিন্তু চাইলেই মুসলিম কট্টরপন্থীদের মতো ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে। মুসলিম দেশগুলোয় ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ মেরে ফেলাটা সহজ। ভারতে কাজটা এখনও খুব সহজ নয়। কিন্তু যতটা ক্রুদ্ধ হলে মুসলিম সন্ত্রাসীদের মতো বীভৎস আর বর্বর হওয়া যায়, ততটাই ক্রুদ্ধ এখন বেশ কিছু হিন্দু কট্টরপন্থী। তারা যে করেই হোক তাদের ধর্ম বাঁচাবে, দেশ বাঁচাবে। তাদের ধর্ম আর দেশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আপাতত কোনও আশংকা নেই। তারপরও বিশ্ব জুড়ে মুসলিম মৌলবাদীর উত্থান অনেক হিন্দুদের মনে ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। ভয়, বুঝি হিন্দু ধর্ম বা হিন্দুস্থান বলে কিছু আর থাকবে না।
পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি গোমাংস রফতানি করছে ভারত। ইউরোপ আমেরিকা ইজরাইলে প্রতিদিন গরু হত্যা চলছে, মানুষ উৎসব করে গোমাংস খাচ্ছে, এতে কিন্তু সেই হিন্দুদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না যারা গরুকে ভগবান বলে বিশ্বাস করছে। ভগবানকে ভারতবর্ষে হত্যা করা চলবে না, ভারতের বাইরে হত্যা করলে আপত্তি নেই।
বিবর্তন কাকে কোথায় নিয়ে যায়, কোন বিশ্বাসকে কোন পাঁকে ফেলে কেউ জানে না। ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা করে বর্তমানকে দুঃসহ করার কোনও মানে হয় না। যার গরু খাওয়ার খাবে, যারা না খাওয়ার তারা খাবে না। একজনের মানবাধিকার ছিনিয়ে আরেকজনের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
চুম্বন
সুশান্ত সিনহা আমার সাক্ষাৎকার চাইছেন। আজ নয় কাল, কাল নয় পরশু করে করে মাস ছয় পার করেছি। আবার যখন ফোন করলেন সাক্ষাৎকার চেয়ে, আমি খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, আপনার ঠিকানাটা বলুন তো।
–ঠিকানা কেন?
–ঠিকানা চাইছি কারণ আপনার সঙ্গে আমি দেখা করতে যাবো।
–তাহলে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন? আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ জানাবো।
সুশান্তর ঠিকানায় সেদিনই আমি পৌঁছে যাই। মাণ্ডি হাউজে দূরদর্শন বিল্ডিং। তারই চারতলায় সুশান্তর অফিক্স। টেবিল উপচে পড়ছে ফাইলে। এর মধ্যে ঘাড় গুঁজে বছর পঞ্চাশের এক ভদ্রলোক চিঠি লিখছেন। হাতে ঝর্ণা কলম। চারদিকটা দেখে একটি চেয়ার টেনে বসে বললাম, তাহলে আপনিই সুশান্ত সিনহা।
–আজ্ঞে। আমিই। আমিই সুশান্ত সিনহা।
–আমি ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় একজিস্ট করেন না। তাই দেখতে এলাম, যে মানুষটা এতগুলো মাস নিরলস ফোন করে যাচ্ছেন, উনি কি আসলেই কেউ?
সুশান্ত জোরে হেসে উঠলেন।
–কী ভেবেছিলেন? ভূত টুত কিছু?
–ভূতে বিশ্বাস করলে তাই করতাম।
–এখন দেখছেন আমি আসলেই কেউ। আমি একজিস্ট করি। সাক্ষাৎকার আজ দেবেন তো?
–না, আমি সাক্ষাৎকার দিতে আসিনি।
সুশান্ত সিনহা বিস্মিত হন। তাঁর চোখের মণি স্থির হয়ে থাকে।
আমি হেসে বলি, চা টা পাওয়া যাবে আপনার অফিসে?
নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই বলে টেবিলের ওপর রাখা একটা বেল টিপলেন। পাশের ঘর থেকে এক যুবক এসে দাঁড়ালো। চা নিয়ে এসো। কালো চা। চিনি ছাড়া।
কী করে জানলেন আমি দুধ-চিনি ছাড়া চা খাই। আমি জিজ্ঞেস করি।
সুশান্ত সিনহা হাতের সামনের কাগজটা সরিয়ে রেখে হাতের কলমটা গুটিয়ে সার্টের পকেটে রেখে বললেন, আপনি বিখ্যাত মানুষ, আপনি কী খান, কী পরেন, সব খবর আমরা, মানে পাবলিকরা জানি।
–আচ্ছা বলুন তো। আমার সাক্ষাৎকার চাইছেন কেন। আমি কী এমন হাতি না ঘোড়া?
সুশান্ত সিনহা মধুর হাসি হেসে বললেন, আপনি হাতিও নন, ঘোড়াও নন। আপনি প্রিয়াংকা ঘোষাল। যাকে এক নামে সবাই চেনে।
–রাখুন আপনার এক নামে সবাই চেনে স্তুতি। পটাচ্ছেন বুঝি? আমি কিন্তু সাক্ষাৎকার দেবো না। চা খেয়ে উঠবো।
–এলেন কেন তবে?
–ইচ্ছে হলো, তাই।
চা এলো। ঠাণ্ডা চা। প্রথম চুমুকেই বুঝে যাই চায়ের পাতাটা ভালো নয়। কাপটা ঠেলে সরিয়ে দিই। সুশান্তর চোখের দিকে তাকিয়ে বলি, উঠছি আমি। চায়ের জন্য ধন্যবাদ।
–কিন্তু চাটা না খেয়েই উঠবেন?
