এখানে মৌমাছির পিছনের পায়ের একটা ছবি দিলাম। ছবি দেখিলেই বুঝিবে, ফুলের রেণু রাখিবার জন্য পায়ে কেমন সুন্দর কৌটা রহিয়াছে! মৌমাছির সম্মুখের বা মাঝের পায়ে এই রকম কৌটা থাকে না।
বোল্তার মধ্যে যেমন স্ত্রী, পুরুষ এবং কর্ম্মী এই তিন রকমের পতঙ্গ দেখা যায়, মৌমাছির মধ্যেও ঐ রকম তিনটি পৃথক্ জাতি আছে। এই তিন জাতি প্রাণী একই চাকে বাস করিলেও তাহাদের চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের।
আমরা এখানে কর্ম্মী মাছির ছবি দিলাম। স্ত্রী ও পুরুষ মৌমাছির মুখে লম্বা জিভ্ থাকে না। ইহাদের কেহই মধু সংগ্রহ করিতে বাহির হয় না, এজন্য লম্বা জিভের দরকারও থাকে না। স্ত্রী-মাছিরা একটু লম্বা এবং তাহাদের গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল, কিন্তু ডানা লম্বা নয়। পুরুষদের শরীর বেশ মোটা ও তাহাদের গায়ে লোমের পরিমাণ যেন বেশি। স্ত্রী ও পুরুষের লেজে হুল থাকে না। স্ত্রীদের লেজে হুলের মত যে একটা অংশ থাকে, তাহা দিয়া উহারা ডিম পাড়ে। মাথায় কিরকমে চোখ লাগানো আছে তাহা দেখিয়াও পুরুষ-স্ত্রী ও কর্ম্মী মৌ-মাছিদের চিনিয়া লওয়া যায়। পুরুষের বড় চোখ দুটি প্রায় গায়ে-গায়ে মাথার খুব উপর দিকে থাকে। কর্ম্মী ও স্ত্রী মাছির চোখ মাথার এত উপর দিকে থাকে না।
মৌমাছির চাক
তোমরা নিশ্চয়ই মৌমাছির চাক দেখিয়াছ। যেখানে বেশ আলো বাতাস লাগে, অথচ রৌদ্র বা বৃষ্টির উৎপাত নাই, এমন জায়গায় ইহারা চাক বাঁধে। বাগানের গাছের ডালে বা বাড়ীর বারান্দা বা কড়ি বরগার গায়ে মৌচাক প্রায়ই দেখা যায়। হিমালয় পর্ব্বতের জঙ্গলে বুনো-মৌমাছিরা খুব বড় চাক প্রস্তুত করে। লোকে তাহা ভাঙিয়া মধু সংগ্রহ করে এবং তাহা বিক্রয় করে। তোমরা মৌচাকের সন্ধান পাইলে দূরে দাঁড়াইয়া চাকখানিকে ভালো করিয়া দেখিয়ো। দেখিবে, হাজার হাজার মাছি জটলা পাকাইয়া চাকের উপরে বিজ্-বিজ্ করিতেছে। হয় ত দেখিবে, তাহাদের মধ্যে কতকগুলি একের পায়ে অপরের পা বাধাইয়া শিকলের মত ঝুলিতেছে। খানিক দাঁড়াইয়া থাকিলে দেখিতে পাইবে, হঠাৎ কতকগুলি ভোঁ করিয়া চাক হইতে কোথায় উড়িয়া গেল এবং আবার কতকগুলি হয় ত কোথা হইতে তাড়াতাড়ি উড়িয়া আসিয়া চাকের উপরে বসিল। কিন্তু এত আনাগোনা, এত যাওয়া-আসা এবং এত জটলার মধ্যে মাছিরা পরস্পর বাগড়া-ঝাঁটি বা মারামারি করে না। ইহা খুব আশ্চর্য্যের কথা নয় কি? আমাদের এক একটা সহরে বিশ হাজার বা ত্রিশ হাজার লোক বাস করে, ইহারা পরস্পর কত হানাহানি মারামারি করে, তাহা তোমরা দেখা নাই কি? একজন কিছু টাকা উপার্জ্জন করিলে, আর একজন তাহা চুরি করিবার ফন্দি করে। এই রকমে আমাদের গ্রামে নগরে নানা উৎপাতের সৃষ্টি হয়। ইহা নিবারণ করিবার জন্য কত চৌকিদার ও পুলিশের লোক দিবারাত্রি গলিতে গলিতে ঘুরিয়া বেড়ায় এবং কত আইন করিয়া অপরাধীদিগকে দণ্ড দিতে হয়। এক একটা চাকে কুড়ি বা ত্রিশ হাজার মাছি বাস করে, কিন্তু ইহারা কখনই পরস্পরের উপরে অত্যাচার করে না। ইহা বড়ই আশ্চর্য্য!
তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, মৌমাছিরা খুব কড়া আইন মানিয়া চলে এবং ইহাদের যে রাজা আছে সে-ও বুঝি খুব কড়া; তাই চাকের মধ্যে ঝগ্ড়া বা মারামারি হয় না। এই কথাটা খুবই সত্য। চাকের প্রত্যেক মাছিকে খুব কড়া নিয়ম মানিয়াই চলিতে হয়, কিন্তু নিয়মগুলি কেহ ভাঙিতেছে কি না দেখিবার জন্য পাহারা-ওয়ালা নাই। শরীরে যত দিন বল থাকে, তত দিন প্রত্যেকেই আপনার কাজ করিয়া যায়। কাজে লাগাইবার জন্য বা কাজ আদায় করিবার জন্য ইহাদের মধ্যে তাগিদ দিবার কেহ নাই। ইহাদের রাজা বা শাসনকর্ত্তাও নাই। প্রত্যেক চাকে একটিমাত্র স্ত্রী-মাছি থাকে, তাহাকেই মাছিরা রাণী বলিয়া মানে। সকলে মিলিয়া রাণীকে যত্ন করে। কিন্তু সে কখনো কাহাকেও শাসন করে না; শান্ত প্রজাদিগকে শাসন করিবার দরকারও হয় না।
আমরা এখন মৌচাকের পত্তনের সময় হইতে তাহার শেষ অবস্থা পর্য্যন্ত সকল কথা তোমাদিগকে বলিব।
কি রকমে নূতন চাকের পত্তন হয়, তাহা বোধ হয় তোমরা দেখ নাই। আমরা অনেক দেখিয়াছি। এক দিন হঠাৎ কোথা হইতে শত শত মাছি ভয়ানক বন্-বন্ শব্দে ঘুরিতে ঘুরিতে, হয় ত বারান্দায়, কড়ি-কাঠে বা বাগানের কোনো গাছের ডালে আাসিয়া বসে। তখন সেখানে চাক থাকে না। কিন্তু তাহারা এমন জটলা করিয়া থাকে যে দেখিলে মনে হয় যেন সকলেই চাকের উপরে বসিয়া আছে। তোমরা যদি এই সময়ে মৌমাছিদিগকে পরীক্ষা কর, তবে হাজার হাজার মাছির মধ্যে কেবল একটিমাত্র স্ত্রী-মাছি দেখিতে পাইবে। পুরুষ-মাছি হয় ত খুঁজিয়াই পাইবে না। সুতরাং বলিতে হয়, আমরা সর্ব্বদা চাকে যে-সকল মাছি দেখিতে পাই, সেগুলির প্রায় সকলেই কর্ম্মী মাছি।
কর্ম্মী মৌমাছি
চাকের জায়গা ঠিক হইলেই কর্ম্মী মাছির দল চাক গড়িতে লাগিয়া যায়। বোল্তারা কি-রকমে দাঁতে কাঠ গুঁড়া করিয়া কাগজের মত জিনিসে চাক তৈয়ারি করে, তাহা তোমরা শুনিয়াছ। মৌমাছিরা সে-রকম জিনিস চাকে ব্যবহার করে না। ইহাদের চাক মোম দিয়া প্রস্তুত। কিন্তু এই মোম তাহারা অন্য জায়গা হইতে সংগ্রহ করিয়া আনে না; কর্ম্মী মাছিরা নিজেদের দেহেই উহা প্রস্তুত করে। ইহাদের পেটের তলায় যে আংটির মত কঠিন আবরণ থাকে, তাহারি পাশে পাশে মোম জড় হয়। আমাদের গা হইতে যেমন ঘাম বাহির হয়, কৰ্ম্মী মাছিদের শরীর হইতে সেই রকমে মোম বাহির হয়। মধু খাইয়া হজম করিলেই পাত্লা আঁইসের মত উহা পেটের তলায় জমে। মাছিরা তাহাই সম্মুখের পা দিয়া খুঁটিয়া খুঁটিয়া মুখে পূরিয়া দেয় এবং দাঁতে চিবাইয়া ও লালার সঙ্গে মিশাইয়া জিনিসটাকে কাদার মত করিয়া ফেলে। ইহা দিয়াই চাকের ভিত পত্তন হয়। যে কর্ম্মীরা ভিত পত্তন করে, তাহারা ঠিক জায়গায় মুখের মোম রাখিয়া উড়িয়া অন্য কাজে চলিয়া যায়। মোম জমা হইয়াছে দেখিলেই আর এক দল কর্ম্মী মাছি দাঁত, মুখ ও পা দিয়া তাহা ছড়াইয়া চাক গড়িতে সুরু করে।
